যুক্তরাজ্যে সত্তরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধের মরদেহ ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে তার দেহে একটি নয়, তিনটি পুরুষাঙ্গ দেখতে পাওয়ার দাবি করেছেন গবেষকরা। কিন্তু এর পেছনের কারণ কী?
বিজ্ঞান সাইট আইএফএলসায়েন্স শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) এ নিয়ে বিস্তারিত এক প্রতিবেদনে লিখেছে, জন্মগতভাবে অতিরিক্ত লিঙ্গ থাকার বিষয়টি খুবই বিরল ঘটনা, যা প্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ মানুষের মধ্যে কেবল একজনের ক্ষেত্রে দেখা যায়।
উল্লেখিত ব্যবচ্ছেদ দুই বছর আগে যখন ঘটেছিল, সে সময় এ নিয়ে সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনও ছেপেছে বিজ্ঞান সাময়িকী পপুলার সায়েন্স।
বার্মিংহামের এজবাস্টনে অবস্থিত ‘বার্মিংহাম মেডিকেল স্কুল’-এর সদস্যরা ৭৯ বছর বয়সী ওই ব্যক্তির মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদের সময় তার পুরুষাঙ্গে একটির বদলে তিনটি লিঙ্গ খুঁজে পান, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিরল এক ঘটনা।
মেডিকেল দলটি বলেছে, ১৬০৬ সাল থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত এত দীর্ঘদিনে কেবল একটি গবেষণায় ‘ট্রাইফ্যালিয়া’ বা তিনটি লিঙ্গের কথা উল্লেখ আছে।
গবেষক দলটি বলেছে, ‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দেহের বাইরের অতিরিক্ত লিঙ্গটি, বিশেষ করে যেটি আকারে ছোট বা অকেজো তা অপসারণের সিদ্ধান্ত নেন। তবে দেহের ভেতরে বাড়তি কোনো লিঙ্গের ক্ষেত্রে সাধারণত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। কারণ, সেগুলো দেহে কোনো বিশেষ উপসর্গ বা সমস্যা তৈরি করে না।’
যুক্তরাজ্যের স্থানীয় গোপনীয়তার নীতি মেনে চলার কারণে ওই ব্যক্তির দেহ হস্তান্তরের আগে তার আগের কোনো চিকিৎসা ইতিহাস বা ব্যক্তিগত তথ্য সম্পর্কে তেমন কিছু জানায়নি ‘বার্মিংহাম মেডিকেল স্কুল’। কেবল লাশটি পরীক্ষার সময় যা কিছু দেখেছেন তার ওপর ভিত্তি করেই গবেষণার এসব তথ্য সংগ্রহ করেছেন গবেষকরা।
গবেষক দলটি তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘শ্বেতাঙ্গ ওই বৃদ্ধের বয়স ছিল সত্তরের বেশি, উচ্চতা প্রায় ৬ ফুট ও তার শারীরিক গঠন ছিল মাঝারি থেকে কিছুটা স্থূলকায়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হচ্ছে, তার দেহের ভেতরে তিনটি লিঙ্গ সদৃশ কাঠামোর উপস্থিতি। তিনি সম্ভবত নিজের এ শারীরিক অস্বাভাবিকতা সম্পর্কে জানতেন না। কারণ, বাড়তি এসব লিঙ্গ দেহের চামড়ার নিচে বা ‘ভেতরে’ লুকায়িত ছিল।
‘দেহের বাইরের দিকে অতিরিক্ত লিঙ্গ থাকলে তার সঙ্গে জন্মগত অন্য ত্রুটি, যেমন মেরুদণ্ড, মলদ্বার, হৃদযন্ত্র, কিডনি বা হাত-পায়ের গঠনে সমস্যা থাকে। তবে ভেতরের লিঙ্গ গঠনের ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ লক্ষণ প্রকাশ পায় না বলে জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে হঠাৎ করেই এগুলো নজরে আসে।
‘তবে এ অস্বাভাবিক শারীরিক গঠনের কারণে তিনি হয়ত কিছু সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছেন। যার মধ্যে মূত্রনালীর সংক্রমণ, লিঙ্গোত্থানজনিত সমস্যা বা প্রজনন জটিলতাও থাকতে পারে।’
গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত দুটি লিঙ্গ অণ্ডকোষের থলির ভেতরে লুকানো ছিল। ফলে সম্ভবত মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেগুলো কারো নজরে আসেনি। তবে, গবেষকরা ওই ব্যক্তির দেহে ‘ইঙ্গুইনাল হার্নিয়া’ অপারেশনের চিহ্ন খুঁজে পেয়েছেন। সেই সময় তার দেহে ক্যাথেটার ব্যবহারের প্রয়োজন হয়ে থাকতে পারে, যা তার বিশেষ ধরনের মূত্রনালীর মধ্য দিয়ে প্রবেশ করানোর কাজটিকে বেশ কঠিন করেছে।
ওই সময়ে চিকিৎসকরা এসব অতিরিক্ত লিঙ্গের অস্তিত্ব টের পেলেও সেগুলোতে সম্ভবত কোনো হস্তক্ষেপ না করে আগের মতোই রেখে দেন।
গবেষক দলটি বলেছে, যেহেতু একাধিক লিঙ্গ থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে অনেক সময় কোনো বিশেষ উপসর্গ দেখা যায় না এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর পর মরদেহ পরীক্ষার সময় এসব বাড়তি অঙ্গ নজরে আসে, ফলে অবস্থাটি তাদের ধারণার চেয়েও বেশি মানুষের মধ্যে থাকতে পারে।
দলটি আরও বলেছে, ‘পুরুষাঙ্গ মূলত জেনিটাল টিউবারকল থেকে বিকশিত হয়ে ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন বা ডিএইচটি নামের হরমোনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। দেহের বিভিন্ন অ্যান্ড্রোজেন রিসেপ্টরের কার্যকারিতায় কোনো জেনেটিক বা বংশগত অস্বাভাবিকতা দেখা গেলে পুরুষাঙ্গের এ ধরনের শারীরিক গঠনগত বৈচিত্র্য বা বিকৃতি ঘটতে পারে।’
‘ওই ব্যক্তির ক্ষেত্রে সম্ভবত ভ্রূণ অবস্থায় জেনিটাল টিউবারকল বা যেখান থেকে পুরুষাঙ্গ তৈরি হয় তা তিন ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। শুরুতে মূত্রনালীটি দ্বিতীয় লিঙ্গটিতে গঠিত হয়েছিল। তবে সেই লিঙ্গটির পূর্ণ বিকাশ থমকে গেলে মূত্রনালী তার গতিপথ পরিবর্তন করে প্রধান লিঙ্গটির ভেতর দিয়ে বিকাশ পায়। আর তৃতীয় লিঙ্গটি ছিল সেই বিভক্ত হয়ে যাওয়া জেনিটাল টিউবারকলের এক অবশিষ্টাংশ মাত্র।’
তবে ওই ব্যক্তির ক্ষেত্রে সম্ভবত মূত্রনালীর কোনো ইনফেকশন বা সংক্রমণ হয়নি। কারণ, তার মূত্রনালীটি কোনো ‘ব্লাইন্ড-এন্ডিং’ বা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনো থলি ছিল না। তবে যৌন মিলনের সময় হয়ত ব্যথা পেতেন তিনি। কারণ তার ‘দেহের ভেতরে থাকা দ্বিতীয় ও তৃতীয় লিঙ্গ দুটিও হয়ত সেই সময়ে উত্তেজিত হত’।
গবেষকরা বলেছেন, অতিরিক্ত লিঙ্গ বা এ ধরনের শারীরিক বৈচিত্র্যকে সঠিকভাবে চিহ্নিতের জন্য উন্নত শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতি প্রয়োজন। যাতে তাদের ক্লিনিকাল পার্থক্য ও চিকিৎসার বিভিন্ন প্রয়োজনীয়তা সঠিকভাবে বোঝা যায়।
গবেষণাটি ২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রকাশ পেয়েছে মেডিকেল জার্নাল ‘জার্নাল অব মেডিকেল কেইস রিপোর্টস’-এ।