বাংলাদেশে মাদককারবারির ধরন ও কৌশলে আমূল পরিবর্তন এসেছে, যা বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিশেষজ্ঞদের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিষিদ্ধ সিসা এবং অন্যান্য মাদকের বেচাকেনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রেক্ষাপটে গতকাল শুক্রবার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি) রাজধানীর গুলশান ও ভাটারা এলাকায় অভিযান চালিয়ে দেশের ইতিহাসের বৃহত্তম সিসার চালান জব্দ করেছে। এই অভিযানে দুই যমজ ভাইসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, শরীফি ভাইদের বাবা-মা ইরানি নাগরিক হলেও তারা বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। তারা দীর্ঘদিন ইরানে বসবাসকালে সিসা কারবারির সরবরাহ পদ্ধতি ও বাজারজাতকরণ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে এবং বাংলাদেশে ফিরে এই অবৈধ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। এক বিশেষ অভিযানে ৬৫ দশমিক ৯ কেজি সিসা, ৪১টি হুঁকা এবং সিসা সেবনের প্রচুর সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা হলো- আহমেদ শরীফি (৩৪), মেহদাদ শরীফি (৩৪) এবং মো: মাকসুদ আলম (৪০)।

তদন্তে উঠে এসেছে যে, এই চক্রটি দীর্ঘ সময় ধরে একটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সারা দেশে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল। এই পেজের মাধ্যমেই পণ্যের ছবি প্রদর্শন, মূল্য নির্ধারণ এবং অর্ডার গ্রহণ করা হতো। অর্ডার নিশ্চিত হওয়ার পর স্থানীয় কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে সিসার পার্সেলগুলো গ্রাহকের ঠিকানায় পৌঁছে দেয়া হতো। অর্থ লেনদেনের জন্য তারা বিভিন্ন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করত, যাতে মূল হোতাদের পরিচয় গোপন রাখা যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের কাছ থেকে একটি বিশাল গ্রাহক ডাটাবেজ উদ্ধার করেছে, যা বিশ্লেষণ করে এই নেটওয়ার্কের সাথে জড়িত অন্যান্য ক্রেতা ও সহযোগীদের শনাক্ত করার কাজ চলছে।

এ দিকে গতকাল শাহবাগ এলাকায় কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট দুইজন মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করেছে, যাদের পেটের ভেতর (বডি প্যাকিং) থেকে এক হাজার ৩২০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা কক্সবাজার থেকে ইয়াবা ক্রয় করত। ক্রয়কৃত ইয়াবা বিশেষ কায়দায় পেটের ভেতরে পাকস্থলীতে বহন করে ঢাকায় নিয়ে এসে মলত্যাগের মাধ্যমে অপসারণ করে ঢাকায় বিভিন্ন জায়গায় বিক্রয় করত। এ ছাড়াও একই দিনে উত্তরা চার নম্বর সেক্টর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ইয়াবা ও ফেনসিডিলসহ এক মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করা হয়।

মাদক পাচারের নতুন নতুন পদ্ধতি যেমন পেটের ভেতরে ইয়াবা বহন (বডি প্যাকিং) বা চুম্বক ব্যবহার করে ট্রাকের নিচে মাদক পাচারের ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে। তবে প্রযুক্তির সাহায্যে অনলাইন মাদক বাণিজ্য যে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, তা মোকাবেলায় কেবল পুলিশের অভিযানই যথেষ্ট নয়। সচেতন নাগরিক সমাজ, অভিভাবক এবং উন্নত আইনের সমন্বয়ে এই মরণ নেশা থেকে সমাজকে রক্ষা করা জরুরি।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটির (ইগট) জাতীয় জরিপ বলছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ এক বা একাধিক অবৈধ মাদক ব্যবহার করে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। যুবকরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে এবং উল্লেখযোগ্য অংশের মাদক ব্যবহারের শুরু ২৫ বছর বয়সের আগেই।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) তথ্য বলছে, শুধু পুরনো মাদক নয়, নতুন প্রজন্মের সিনথেটিক ড্রাগও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৭০ লাখ মাদকাসক্ত ব্যক্তির মধ্যে ৫০ লাখই ইয়াবা ও মেথামফেটামাইন জাতীয় মাদকে আসক্ত। পাশাপাশি সিন্থেটিক ড্রাগ যেমন এলএসডি ও ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের অনুপ্রবেশ ২০২৬ সালে এক আশঙ্কাজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।

সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ১২ ধরনের নতুন মাদক শনাক্ত হয়েছে। বছরের পর বছর অভিযান ও বিপুল জব্দের পরও প্রতিদিন আনুমানিক ৬৮ লাখ ৭৬ হাজার থেকে এক কোটি ১৪ লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট দেশে ব্যবহারকারীদের হাতে পৌঁছায়। সিসা সেবন এবং অপ্রচলিত ড্রাগ যেমন এলএসডি, আইস বা ম্যাজিক মাশরুম তরুণ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ধ্বংস করে দিচ্ছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক (গায়েন্দা) মোহাম্মদ বদরুদ্দীন জানান, তারা সাইবার নজরদারি এবং আর্থিক গোয়েন্দা বিশ্লেষণের মাধ্যমে মাদকের এই ডিজিটাল বাজার নির্মূলে বদ্ধপরিকর। সরকার ইতোমধ্যেই ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ (সংশোধন ২০২৬)’ এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে, যেখানে প্রথমবারের মতো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচাকে সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এই আইনের অধীনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কম্পিউটার, মোবাইল ডিভাইস এবং ডিজিটাল ওয়ালেট ফরেনসিক পরীক্ষার বিশেষ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রধানত সীমান্ত এলাকায় তদারকি বাড়ানো দরকার। তা ছাড়া বিদেশ থেকে বিমানবন্দর হয়ে লাগেজ পার্টির মাধ্যমে আসছে। অভিযোগ আছে, যারা এসব নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকেন তাদের কেউ কেউ এতে জড়িত থাকেন। এতে কারবারিরা আরো সুযোগ পায়। অধিকাংশ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাদকসহ আটক করে খুচরা বিক্রেতা ও বাহকদের মামলা দেয়; অথচ এদের পেছনের যারা পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews