ছবির উৎস, AFP via Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
২০২৪ সালের ৩০শে মে তারিখের পর থেকে মালয়েশিয়ায় বন্ধ আছে বাংলাদেশের শ্রমবাজার, প্রতীকী ছবি
Author,
রাকিব হাসনাত
Role,
বিবিসি নিউজ বাংলা
Published
৬ মিনিট আগেপড়ার সময়: ৫ মিনিট
বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের জন্য পঁচিশটি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির নাম প্রকাশ করেছে মালয়েশিয়ার সরকার।
মালয়েশিয়া সরকারের অনলাইনভিত্তিক কেন্দ্রীয় অভিবাসী কর্মী ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম (ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা এফডব্লিউএমএস) এই তালিকা প্রকাশ করেছে।
এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী নিয়োগ আবারো শুরুর আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
তবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একমাত্র জনশক্তি প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠান ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড বা বোয়েসেলের মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের আগের ঘোষণা অকার্যকর হয়ে গেল কি-না সেই প্রশ্ন উঠছে।
জনশক্তি রফতানির সাথে সংশ্লিষ্টদের অনেকেই রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকাকে 'নতুন সিন্ডিকেট' হিসেবে আখ্যায়িত করলেও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, বাংলাদেশের দিক থেকে বোয়েসেলই কাজটা করবে এবং তাতে দেশের সব রিক্রুটিং এজেন্সিই কর্মী পাঠানো সুযোগ পাবে।
এদিকে, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সংগঠন বায়রা'র সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলছেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালু নিয়ে আসলে কী করা হচ্ছে সে সম্পর্কে এখনো কোনো তথ্য তাদের কাছে পোৗঁছায়নি এবং বিষয়টি জানতে সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা করছেন তারা।
প্রসঙ্গত, গত ৩০শে জুলাই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশন আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে 'মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে গেছে' বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
তিনি তখন বলেছিলেন, অগাস্ট মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের যাওয়া শুরু হবে।
এর আগে ২০২৪ সালের মে মাসের শেষে বাংলাদেশের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ করে দিয়েছিল মালয়েশিয়া সরকার। এমনকি ওই সময় ছুটিতে দেশে আসা অনেকেই আর মালয়েশিয়ায় কাজে ফেরত যেতে পারেননি।

ছবির উৎস, TENGKU BAHAR
ছবির ক্যাপশান,
মালয়েশিয়ার বহু অবকাঠমো প্রকল্পে কাজ করেছেন লাখো বাংলাদেশি শ্রমিক
বাংলাদেশে গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল শ্রমবাজার প্রসঙ্গ।
এরপর কয়েক দফায় উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক শেষে মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষ তাদের তালিকায় বাংলাদেশের ২৫টি এজেন্সিকে অন্তর্ভুক্ত করে তা প্রকাশ করে।
যদিও কুয়ালালামপুরের ওই সংবাদ সম্মেলনে প্রথম ধাপের কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি মালিকানাধীন জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন মাহদী আমিন।
প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর উপস্থিতিতেই তিনি তখন বলেছিলেন, "আমরা মালয়েশিয়া সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছি যেন প্রথম ধাপের নিয়োগপ্রক্রিয়াটি বোয়েসেলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়"।
আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "মালয়েশিয়ার সরকারের তালিকা তাদের নিজস্ব। আমরা এখান থেকে পাঠাবো বোয়েসেলের মাধ্যমেই। আমাদের তালিকায় থাকা সব রিক্রুটি এজেন্সিই এতে কাজ করার সুযোগ পাবেন। এখানে হাইড অ্যান্ড সিকের কিছু নেই"।
যদিও রিক্রুটি এজেন্সিগুলোর মধ্যে এ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা না আসা পর্যন্ত তারা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলছেন, "আমরা কিছু তালিকা সংবাদ মাধ্যমে দেখেছি। আমরা শুধু চাই সবাই কাজ করার সুযোগ পাক, শ্রমিকরা সুরক্ষিত থাকুক এবং ন্যূনতম খরচে শ্রমিকরা যাওয়ার সুযোগ পাক"।
কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনের লেবার উইংয়ের সাথে যোগাযোগ করা হলে মিনিস্টার (লেবার) ছিদ্দিকুর রহমান জানিয়েছেন, তাদের এখনো মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কিছু অবহিত করেনি।

ছবির উৎস, ANADOLU AGENCY
ছবির ক্যাপশান,
একটি পাম অয়েল প্ল্যানটেশনে কাজ করছেন একজন শ্রমিক (ফাইল ছবি)
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বিবিসিকে জানিয়েছেন যে, তারা আশা করছেন এই সপ্তাহের মধ্যেই এ বিষয়ে (শ্রমবাজার আবার চালু) আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যাবে।
"আমি আশা করি মালয়েশিয়া সরকারিভাবেই এ বিষয়ে ঘোষণা দেবে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে বড় অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। আমার মনে হয় কয়েকদিনের মধ্যেই তারা ঘোষণা দিয়ে দেবেন," বলছিলেন তিনি।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার বিষয়ে অগ্রগতি দাবি করা হলেও খুব একটা সফলতা আসেনি। তখন মালয়েশিয়া সরকারের কাছে ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকাও দেওয়া হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে। বর্তমান সরকারে সেটিকে যাচাই বাছাই করে ৩৪০টি চূড়ান্ত করেছে।
গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের সময়ে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য শ্রমবাজার আবার উন্মুক্তকরণের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল।
জুলাইয়ে আরিফুল হক চৌধুরী ও মাহদী আমিনসহ বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সফরেই শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার বিষয়ে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষের সাথে একমত হওয়ার কথা জানান মাহদী আমিন।
তিনি তখন জানিয়েছিলেন, মালয়েশিয়া সরকার খুব শিগগির তাদের কাজের পদ্ধতির বিষয়ে আপডেট জানাবে এবং আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াগুলো জানানো হবে। একই সাথে মালয়েশিয়া নিজস্ব যাচাই-বাছাই ও কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে এজেন্সির চূড়ান্ত সংখ্যা নির্ধারণ করবে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
"অভিবাসন ব্যয় কমিয়ে আনা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দক্ষ জনশক্তিকে মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়াই বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার," বলেছিলেন মি. আমিন।

ছবির উৎস, FARJANA K. GODHULY
ছবির ক্যাপশান,
মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য অন্যতম বড় শ্রমবাজার
মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তখন তাদের সঙ্গে মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষের যে আলোচনা হয়েছিল সেভাবেই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হবে ও বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার সুযোগ পাবেন বলে আশা করছেন তারা।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানির তালিকায় চতুর্থ দেশ হিসেবে রয়েছে মালয়েশিয়া। কিন্তু এরপরও এ দেশের শ্রমবাজার নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে বাংলাদেশ।
বিভিন্ন সময় দফায় দফায় বন্ধ ছিল সেখানকার বাংলাদেশের শ্রমবাজার। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুন থেকে সেদেশে আবারো বন্ধ হয়ে যায় বাংলাদেশসহ সব দেশের শ্রমবাজার।
বাংলাদেশের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ওয়েবসাইটে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ সাল থেকে বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হলেও মালয়েশিয়ার বাজারে আরো দুই বছর পর শুরু হয় এ যাত্রা।
১৯৭৮ সালে প্রথম মাত্র ২৩ জন শ্রমিকের যাওয়ার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের।
বিভিন্ন হিসেবে দেখা যায়, মালয়েশিয়ায় এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক গিয়েছে সাড়ে ১৪ লাখেরও বেশি, যা বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের নয় শতাংশেরও বেশি।
তবে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে এই শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যাওয়া কারণে জনশক্তি খাতের ব্যক্তিদের কাছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের 'আনস্টেবল মার্কেট' হিসেবেও একটি পরিচিত গড়ে উঠেছে।