স্টাফ রিপোর্টার

আজ ২৩ জুন মঙ্গলবার। ১৭৫৭ সালের এই দিন ঐতিহাসিক পলাশী ট্রাজেডি দিবস এবং বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে বিষাদময় ও কলঙ্কজনক দিন। দু’শো ৬৯ বছর আগে এই দিনে পলাশীর ময়দানে ইংরেজদের সাথে এক যুদ্ধে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে অস্তমিত হয় বাংলার স্বাধীনতার শেষ সূর্য। মীরজাফর ও ইংরেজদের যৌথ ষড়যন্ত্রের ফলে বাংলার স্বাধীনতা অস্তমিত হয়। নবাবের পরাজয় স্বাভাবিক পরাজয় ছিল ছিলনা। বরং বিশ্বাসঘাতকদের সম্মেলিত ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পড়ে নবাবকে পরাজয় বরণ করতে হয়। এই পরাজয়ের ধারাবাহিকতায় ভারতবর্ষ প্রায় ২০০ বছর ব্রিটিশ শাসনের অধীনে চলে যায়। পলাশীর এই ট্র্যাজেডি এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের বাস্তবতার মধ্যে এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী সম্পর্ক রয়েছে।

এমন এক সময় বাংলাদেশে পলাশি দিবস এসেছে যখন এই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব নিয়ে নানা ষড়যন্ত্রের আভাস পাওয়া যায়। বিশেষ করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ পলাতক জীবনে থেকে আবার ষড়যন্ত্র করে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি করতে চাচ্ছে। সেইসাথে রাজনীতিতে আবার সক্রিয় হওয়ার চিন্তা করছে।

এদিকে পলাশি ট্রাজেডি দিবস উপলক্ষ্যে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ১১ দলীয় জোট। সেইসাথে বিভিন্ন সংগঠন আলোচনা সভা করবে। ১১ দলীয় জোট মঙ্গলবার বিকেল ৫টায় রাজধানীর বিজয় নগরে ১১ দলীয় জোটের উদ্যোগে সমাবেশ করবে। এ প্রসঙ্গে ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ২৩ জুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি বেদনাবিধুর দিন। ১৭৫৭ সালের পলাশীর প্রান্তরে সংঘটিত পরাজয় শুধু একটি যুদ্ধের পরাজয় ছিল না; এটি ছিল স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থতার এক করুণ অধ্যায়। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, জাতীয় স্বার্থবিরোধী ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা এবং জনগণের অসচেতনতা একটি জাতির জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

তিনি আরও বলেন, আজকের বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে আমরা উদ্বেগজনক কিছু মিল দেখতে পাই। গত ১৭ বছরে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকারকে বার বার ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই অধ্যায়ের অবসান ঘটলেও আমরা লক্ষ্য করছি, নতুন করে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ পুনর্বাসনের অপচেষ্টা চলছে।

ইতিহাস বলছে, বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব আলিবর্দী খাঁ মৃত্যুর আগে দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলাকে নবাবের সিংহাসনের উত্তরাধিকারি করে যান। নবাব আলিবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর ১৭৫৬ সালের এপ্রিল মাসে সিরাজউদ্দৌলা সিংহাসনে বসেন। এদিকে নবাব আলিবর্দী খাঁর কন্যা ও সিরাজউদ্দৌলার খালা ঘষেটি বেগম ইংরেজদের সাথে হাত মেলান। সেনাপতি মীর জাফর আলি খান, ধনকুবের জগৎ শেঠ, রাজা রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ, ইয়ার লতিফ প্রমুখ ইংরেজদের সাথে ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠেন।

ইতিহাসবিদ ও গবেষক তপন মোহন চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘পলাশীর যুদ্ধ’ বইয়ে লিখেছেন, একদিকে মুসলিম নবাব সিরাজউদ্দৌলা প্রাণপণে চেষ্টা করলেন বাংলা বাঁচাতে। অপরদিকে হিন্দু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা ক্রমাগত সাহায্য করে গেল ইংরেজদের। ফলাফল প্রথমে ইংরেজবাহিনীর কলকাতা দখল এবং পরে বাংলা দখল। ২ জানুয়ারি ১৭৫৭, কলকাতা পুনর্দখল করে ইংরেজরা। এরপর পলাশির যুদ্ধে কলকাতা এবং বাংলাকে পরিপূর্ণভাবে দখলে এনেছিল ব্রিটিশরা। বিশ্বাসঘাতকতার সৌজন্যে প্রভাবশালী রায়দুর্লভ মানিকচাঁদ, জগৎ শেঠ এবং উমিচাঁদ।

১৬০০ খ্রিষ্টাব্দ, টমাস রো কোম্পানিকে চিঠি লিখেছিলেন, আর যাই হয়ে যাক তাদের এই কম সৈন্য নিয়ে স্থলভাগে লড়াই করা যাবে না। তিনি স্পষ্ট বলে দেন, “যদি লাভজনক বাণিজ্য করতে চান তবে তা শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালনা করুন আর সমুদ্রে আপনাদের কার্যক্রম সীমিত রাখুন। বিতর্ক পরিত্যাগ করে এটা নিয়ম হিসেবে গ্রহণ করাই ভালো যে ভারতে স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পরিণতি মারাত্মক হতে পারে।

১৬৮১ সালে স্যার জোসিয়া চাইল্ড কোম্পানি পুরনো নীতি ভুলিয়ে স্থলপথে ভারত দখলের পরিকল্পনা করে। দিল্লির সম্রাটদের সঙ্গে কিছু যোগাযোগ থাকলেও তাদের আসল লক্ষ্য বাংলা তথা কলকাতার দিকে ছিল। কারণ ঐতিহাসিকরা মনে করছেন, এখানে ছিল গঙ্গা নদী যা বাণিজ্যের জন্য অসাধারণ জায়গা। নবাব আলীবর্দী খাঁ পূর্ব ভারতে কোম্পানির ক্ষমতাকে দমিয়ে রেখেছিলেন। সিরাজ নবাব হওয়ার পর সেই চেষ্টাই করেছিলেন। কিন্তু তাঁর দুর্ভাগ্য তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্বাসঘাতকতা এবং বেঈমানি।

১৭৫৬ সালের ৯ এপ্রিল সিরাজ বাংলার নবাব হন। আর এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকেই ‘জঙ্গ’ শুরু হয়ে যায় ইংরেজদের সঙ্গে। প্রতিপদে অবনিবনা হতে শুরু করে। ইউরোপে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের অজুহাতে বাংলায় ইংরেজ ও ফরাসিদের দুর্গ নির্মাণ শুরু হয় বাংলায়। নবাব এতে বাধা দিলে মেনে নেয় ফরাসিরা। ইংরেজ তা মানেনি। ২০ মে ১৭৫৬ সালে নবাবকে পাঠানো গভর্নর ড্রেকের চিঠিতে দুর্গ তৈরি বন্ধ করার কোনও উল্লেখ ছিল না। নবাবের পূর্ণিয়া যাওয়ার কথা ছিল। বাধ্য হয়ে সিরাজ পুর্নিয়া না গিয়ে মুর্শিদাবাদে ফিরে আসেন। কলকাতায় ইংরেজদের দমনের উদ্দেশে সসৈন্যে যাত্রা করেন। ১৭৫৬-র ২০ জুন কলকাতার দুর্গ নবাব সিরাজউদ্দৌলার দখলে আসে। গভর্নর ড্রেক ও অন্যান্য ইংরেজ কলকাতা ছেড়ে পালায়। তবে তাদেরকে টিকিয়ে রাখে প্রভাবশালী হিন্দু উমিচাঁদ, জগৎ শেঠ, রায়দুর্লভ মানিক চাঁদ এবং শোভাবাজার রাজ বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা রাজা নবকৃষ্ণ দেব। ২৭ ডিসেম্বর, ১৭৫৬ সাল , ফের ইংরেজ সৈন্য ও নৌবহরের কলকাতা দখলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। এবং ২ জানুয়ারি, ১৭৫৭ সাল , মানিকচাঁদদের বেইমানিতে ইংরেজেরা কলকাতা আবারও দখল করে নেয়। সিরাজ আবারও কলকাতার পথে আসেন। জানুয়ারির শেষের দিকে তিনি হুগলী পৌঁছতেই কলকাতা ছেরে পালায় ক্লাইভের বাহিনী। তবে এবার আগের মতো পুরো সরে যায়নি তারা।

৫ ফেব্রুয়ারি, কলকাতায় সিরাজের শিবির আমির চাঁদের বাগানে আক্রমণ করে ক্লাইভ ও ওয়াটসন। সিরাজের পাল্টা হামলা করেন। ক্লাইভরা নবাব শিবির দখল করতে পারেনি। তবে ওই চার জনের সহায়তায় তারা ভিতরে ভিতরে বেশ শক্তিশালী। সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক অবশ্য সিরাজের রাজ বাড়িতেই ছিল। এরপর সিরাজের সঙ্গে সরাসরি ইংরেজদের লড়াই পলাশির যুদ্ধে। সিরাজের ৫০ হাজার সৈন্য হেরে গেল ইংরেজদের ৩০০০ সৈন্যের কাছে যাদের অধিকাংশই আবার স্থানীয় ভাড়া করা সৈন্য। এখানেই বড় চাল চেলেছিলেন মির জাফর। ৫০ হাজার সৈন্যের বেশীরভাগই থেকেও লড়লেন না। পরাজয়ের পর নবাবের বেদনাদায়ক মৃত্যু হলেও উপমহাদেশের মানুষ নবাবকে আজও শ্রদ্ধা জানায়। তার সাথে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তাদের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। ইতিহাসবিদ মোবাশ্বের আলী তার ‘বাংলাদেশের সন্ধানে’ গ্রন্থে লিখেছেন, নবাব সিরাজউদ্দৌলা প্রায় লাখ সেনা নিয়ে ক্লাইভের স্বল্পসংখ্যক সেনার কাছে পরাজিত হন মীর জাফরের মোনাফেকীতে। অতি ঘৃণ্য মীর জাফরের কুষ্ঠরোগে মৃত্যু হয়।

পলাশী যুদ্ধ সম্পর্কে রবার্ট ক্লাইভ তার আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, সে দিন স্থানীয় অধিবাসীরা ইংরেজদের প্রতিরোধ করতে চাইলেই লাঠিসোটা আর হাতের ইটপাটকেল মেরেই তাদের খতম করে দিতে পারতো। কিন্তু এ দেশবাসীরা তা উপলব্ধি করতে পারেনি। যেকোনো কারণেই হোক সেদিন বাংলার মানুষ এগিয়ে যায়নি। তাদের রাজনৈতিক সচেতনতার তখন খুবই অভাব ছিল।

পলাশীর ট্র্যাজেডির পরেও বাংলার সাধারণ মানুষ, কৃষক সমাজ দৈনন্দিন জীবন, নিত্যদিনের মতোই মাঠে কৃষি কাজ করেছে, ফসল বুনেছে। অথচ পলাশীর যুদ্ধে গোটা জাতীয় জীবনে কি নিদারুণ ভাগ্য বিপর্যয় ঘটলো, এক ঘণ্টার প্রহসন যুদ্ধে গোটা জাতির স্বাধীনতা হরণ করে নিয়ে গেল গোটা কয়েক বেনিয়া ইংরেজ অথচ তাদের টনক নড়লো না।

টনক যখন নড়লো, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাদের আর তখন কিছুই করার ছিল না। সিরাজউদ্দৌলা কখনো তার দেশের প্রজাদের সাথে কোনো অবস্থাতেই বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। কখনো স্বেচ্ছায় স্বদেশকে বিকিয়ে দেননি। পলাশীর প্রান্তরে মর্মান্তিক নাট্যমঞ্চে এক মাত্র তিনি ছিলেন মূলনায়ক। সিরাজউদ্দৌলা ছিলেন দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, বাংলার স্বাধীনতার শেষ প্রতীক।

বাংলার ইতিহাসে এই পলাশী অধ্যায় যেমন ন্যাক্কারজনক হৃদয়বিদারক ঘটনা, তেমনি আমাদের জাতীয় জীবনে এর মাশুল দিতে হয়েছে দীর্ঘ ২০০ বছরের গোলামির জিঞ্জির। ২৩ জুনের পলাশীর ইতিহাস, কিছু বিশ্বাসঘাতক চক্রান্তকারীর যোগসাজশে দেশের স্বাধীনতা বিদেশী বেনিয়াদের হাতে তুলে দেয়ার ইতিহাস। ২৩ জুনের ইতিহাস প্রকৃত সোনার বাংলাকে শ্মশানে পরিণত করার ইতিহাস।

শেষ কথা হলো- স্বাধীনতা দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ, একটা জাতির বড় অর্জন। আর দেশপ্রেম দেশের সবচেয়ে বড় আমানত। এই সত্যটা জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিককে আমাদের সর্বদাই মনে রাখতে হবে। প্রত্যেকে প্রত্যেকের অবস্থান থেকে দেশকে ভালোবাসতে হবে। প্রতি বছর ২৩ জুন আমাদের এই সতর্কবাণী শুনিয়ে যায়, দেশের ভেতরের শত্রুরা বাইরের শত্রুর চেয়ে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। সে বিষয়ে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। আমরা ২৩ জুনের কলঙ্কময় অধ্যায় থেকে আদৌ কোনো শিক্ষা নিতে পেরেছি কী? ইতিহাসের সবচেয়ে বড়শিক্ষা হলো এই যে, 'ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।'



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews