পবিত্র কোরবানির আধ্যাত্মিক আবহ শেষ হতে না হতেই আজ জাতীয় সংসদে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পেশ করতে যাচ্ছেন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত ৯.৩০ লাখ কোটি টাকার জাতীয় বাজেট। দৃশ্যত বিচ্ছিন্ন মনে হলেও, রাজনৈতিক অর্থনীতির গভীর বিশ্লেষণে এই দুটি ঘটনা একই জাতীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দুটি পরিপূরক ও সমান্তরাল চালিকাশক্তি। একদিকে রয়েছে কোনো আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো ছাড়াই প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার স্বতঃস্ফূর্ত ‘বটম-আপ’ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি। অন্যদিকে রয়েছে রাষ্ট্রের পরিকল্পিত সম্পদ বণ্টন ও রাজস্ব আদায়ের ৯.৩০ লাখ কোটি টাকার নিয়ন্ত্রিত ও আমলাতান্ত্রিক ‘টপ-ডাউন’ নীলনকশা। জাতির সামগ্রিক সমৃদ্ধি বা দারিদ্র্যের পেছনে এই দুই ধারার আন্তঃসম্পর্ক বোঝা এবং এই ক্রান্তিকালে এদের মধ্যকার অদৃশ্য বিশ্বাসের প্রাচীরটি ভেঙে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমন্বয় সাধন করাই এই নিবন্ধের মূল লক্ষ্য।
দুই অর্থনীতির স্বরূপ ও বিপরীতমুখী অভিঘাত
কোরবানির অর্থনীতিকে গতিশীল করে তিনটি অদৃশ্য শক্তি। ঈদের প্রাক্কালে দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়, যা মে ২০২৬-এর প্রথম ১৯ দিনেই ২.৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে; সরকারি ও বেসরকারি খাতের বিপুল অংকের উৎসব বোনাস এবং বাজার কাঠামোর বাইরে সরাসরি মাংস ও চামড়া বিতরণের মাধ্যমে ঘটিত এক অভূতপূর্ব অনানুষ্ঠানিক সম্পদ পুনর্বণ্টন ব্যবস্থা। গবাদিপশুর বাজারটি আজ প্রায় সম্পূর্ণ দেশীয় উৎপাদনে স্বয়ংসস্পূর্ণ, যা এককালের চরম ভারতীয় পশুর নির্ভরতা কাটিয়ে আজ ১০.১০ মিলিয়ন পশুর চাহিদার বিপরীতে ১২.৩৩ মিলিয়ন পশুর দেশীয় জোগান নিশ্চিত করছে। এটি প্রমাণ করে যে, দেশের প্রান্তিক মানুষ কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় প্রত্যক্ষ পরিকল্পনা ছাড়াই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে স্বনির্ভরতা অর্জনে সক্ষম।
তবে এই অর্জিত স্বনির্ভরতার বিপরীতে চামড়া ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের দিকে তাকালে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়। দেশের অন্যতম বৃহৎ এই কাঁচামাল খাতের বার্ষিক ৮০-৯০ লাখ পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও এবং সরকারের চামড়ার মূল্য বর্গফুট প্রতি ৬২-৬৭ টাকা নির্ধারণ সত্ত্বেও তৃণমূলের মৌসুমী ব্যবসায়ীরা প্রতিটি চামড়া মাত্র ৫০০ থেকে ৯০০ টাকায় লোকসানে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। এ বছর বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন ৮ থেকে ৮.৫ মিলিয়ন পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর অপ্রতুল ও অকার্যকর বর্জ্য শোধন ব্যবস্থার কারণে এই বিপুল জাতীয় সম্পদ চরম ধ্বংসের মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে, সরকারের প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯.৩০ লাখ কোটি টাকার জাতীয় বাজেট সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকটের মহাসমুদ্রে এক অনিশ্চিত যাত্রা। ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা এবং মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের নিচে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রণীত এই বাজেটের পরিচালন ব্যয়ই সিংহভাগ গ্রাস করছে, যেখানে ৩ লাখ কোটি টাকা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপির জন্য রাখা হয়েছে। তবে এই বিশাল বাজেটের প্রধান দুর্বলতা হলো ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা, যা অর্জনের জন্য পূর্ববর্তী বছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার ওপর প্রায় ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা প্রয়োজন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যেখানে অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে মাত্র ৩.২৭ লাখ কোটি টাকা আদায় করতে পেরেছে, সেখানে শেষ দুই মাসে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ১.৭৬ লাখ কোটি টাকা সংগ্রহের দাবি করা অবাস্তব কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে ১.২০ লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে মাত্র ৪.৭২ শতাংশের নিচে নামিয়ে দিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতিতে তীব্র ‘ক্রাউডিং আউট’ বা বেসরকারি খাতের সংকোচনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
‘সপ্তভূজ লৌহ কাঠামো’ ও ক্ষমতার বাজার ব্যর্থতা
এই দুই সমান্তরাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংঘাত ও সমন্বয়ের অভাবকে বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে এসেমগলু ও রবিনসনের যুগান্তকারী প্রাতিষ্ঠানিক তত্ত্বে, যেখানে তাঁরা দেখিয়েছেন যে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান মানুষের পরিশ্রমকে জাতীয় সম্পদে রূপান্তর করে, আর নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠান সেই সম্পদ মুষ্টিমেয়র হাতে কুক্ষিগত করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই নিষ্কাশনমূলক ব্যবস্থাটি একটি জটিল রূপ ধারণ করেছে, যাকে আমি ‘সপ্তভূজ লৌহ কাঠামো’ হিসেবে চিহ্নিত করেছি।
এই অলিগার্কিক ব্যবস্থাটি রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, লুটেরা ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, নিষ্কাশনমূলক ব্যাংক ও রাজস্ব প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া ও সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবী, বিদেশী মিত্র এবং অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে গঠিত। এই কাঠামোটি ডগলাস নর্থের ‘লিমিটেড এক্সেস অর্ডার’ বা সীমিত সুযোগের সমাজের একটি অতি জটিল সংস্করণ, যা পুরো অর্থনীতিকে এক অলিগার্কিক পক্ষাঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই প্যারালাইসিসের কারণেই প্রতি বছর চামড়ার বাজারে সিন্ডিকেট তৈরি হয়, পশুখাদ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয় এবং প্রান্তিক খামারি তাঁর প্রাপ্য মুনাফা থেকে বঞ্চিত হন।
জোসেফ স্টিগলিটজের ‘ক্ষমতার বাজার ব্যর্থতা’ তত্ত্বের আলোকে এই বাজার সিন্ডিকেটগুলো ‘তথ্যের অসামঞ্জস্যতা’ এবং প্রান্তিক মানুষের ‘নিখুঁত জ্ঞানের অভাব’-কে নিজেদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে কোটি খামারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দিনরাত পরিশ্রম করেও তাদের উৎপাদন সম্ভাবনা সীমানার গভীরে বন্দি থাকেন, ক্ষমতার অসমতার কারণে তারা প্রকৃত বাজারে প্রবেশ করতে পারেন না। ভারতীয় গরুর আমদানি বন্ধের পজিটিভ এক্সটারনাল শক বা ইতিবাচক ধাক্কাটি সাময়িকভাবে এই নিষ্কাশন প্রক্রিয়াকে এড়িয়ে প্রান্তিক মানুষের অদম্য ইচ্ছায় গবাদিপশু খাতে স্বনির্ভরতা এনে দিয়েছিল, যা অমর্ত্য সেনের ‘সক্ষমতা তত্ত্ব’ এবং গ্যারি বেকারের ‘মানব পুঁজি’ তত্ত্বের সার্থকতা প্রমাণ করে।
কিন্তু যে সকল খাতে এই অলিগার্ক বা লুটেরাদের আমদানি-বাণিজ্য ও মধ্যস্বত্বভোগী কমিশন ভোগের সরাসরি স্বার্থ জড়িত, সেখানে কোনো ধরনের দেশীয় উৎপাদনশীল সক্ষমতাকে বিকশিত হতে দেওয়া হয় না। রোনাল্ড কোস ও অলিভার উইলিয়ামসনের ‘লেনদেন ব্যয়’ তত্ত্ব অনুসারে, আমাদের পশুর হাট এবং কাঁচা চামড়ার বাজারে তথ্যের মারাত্মক অভাব, প্রশাসনিক হয়রানি ও চাঁদাবাজির কারণে অদৃশ্য ব্যয় অনেক বেশি, যা বাজারকে মারাত্মকভাবে অদক্ষ করে রেখেছে।
চামড়া শিল্পনগরীর ট্র্যাজেডি
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ব্যর্থতা। পরিবেশগত চরম সংকটের কারণে বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানোর নামে ১৬২টি ট্যানারি সাভারে স্থানান্তরিত করা হলেও তা কেবল দূষণকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত করেছে মাত্র। সাভারের সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা সিইটিপির দৈনিক বর্জ্য শোধন ক্ষমতা কাগজে-কলমে ২৫,০০০ ঘনমিটার দাবি করা হলেও বাস্তবে তা মাত্র ১৪,০০০ থেকে ১৮,০০০ ঘনমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
কোরবানির ঈদের তিন দিনে যেখানে দৈনিক প্রায় ৪৫,০০০ ঘনমিটার বর্জ্য সৃষ্টি হয়, সেখানে এই অপ্রতুল সিইটিপির কারণে বিষাক্ত ক্রোমিয়াম ও রাসায়নিক সরাসরি ধলেশ্বরী নদীতে খালাস হচ্ছে। পরিবেশগত পরীক্ষায় দেখা গেছে, ধলেশ্বরীর পানির বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড বা বিওডি মাত্রা ৩০৮ মিলিগ্রাম/লিটারে ঠেকেছে, যা নিরাপদ সীমা ৩০-এর চেয়ে ১০ গুণেরও বেশি। একই সাথে ক্লোরাইডের ঘনত্ব পৌঁছেছে ৪,১০০ মিলিগ্রামে (অনুমোদিত সীমা ২,০০০), যা কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে লবণের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফল।
এই পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে সাভারের ১৪৭টি সচল ট্যানারির মধ্যে মাত্র ১টি বৈশ্বিক লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ বা এলডব্লিউজি সনদ অর্জন করতে পেরেছে। ফলে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে উন্নত মানের ফিনিশড চামড়া রফতানির উচ্চমূল্যের বাজার হারিয়ে অত্যন্ত সস্তা দরে কাঁচা চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। যেখানে ভারত প্রতি ইউনিট চামড়ায় ৩০ থেকে ৩৫ ডলার আয় করে, সেখানে বাংলাদেশ পায় মাত্র ১০ থেকে ১৫ ডলার।
কোরবানি ও বাজেটের সেতুবন্ধন নির্মাণে প্রস্তাবনা
জাতীয় বাজেটের নিয়ন্ত্রিত পরিকল্পনা এবং কোরবানির স্বতঃস্ফূর্ত অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির মধ্যকার এই গভীর সংকট দূর করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক এবং পরিবেশবান্ধব সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার জন্য নি¤েœাক্ত পাঁচটি সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত নীতি সংস্কার অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা আবশ্যক।
প্রথমত, চামড়া খাতের প্রধান প্রতিবন্ধকতা সাভারের সিইটিপির সক্ষমতা অবিলম্বে আধুনিকায়নের মাধ্যমে দৈনিক ৪৫,০০০ ঘনমিটারে উন্নীত করতে হবে। ইতালীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ইটাল প্রজেট্টি’-এর আসন্ন কারিগরি প্রতিবেদনের সুপারিশের আলোকে পুরো প্ল্যান্টকে ইকো-কমপ্লায়েন্ট বা পরিবেশবান্ধব করতে হবে। সক্ষম ট্যানারিগুলোকে নিজস্ব বা একক এন্টারপ্রাইজ-ভিত্তিক আধুনিক বর্জ্য শোধন প্ল্যান্ট স্থাপনের অনুমতি দিতে হবে এবং ছোট ট্যানারিগুলোর জন্য প্রাথমিক পলিমার থিতানো বা সেডিমেন্টেশন প্রযুক্তির বাধ্যবাধকতা আরোপ করা উচিত, যাতে মূল সিইটিপির ওপর চাপ কমে। একই সাথে চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হওয়া রোধ করতে লবণ সংরক্ষণের সুবিধার্থে মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোতে বিনামূল্যে সরকারি লবণ বিতরণ এবং মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আধুনিক চামড়া ছাড়ানোর জন্য কসাই ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, রোনাল্ড কোসের তত্ত্বের ভিত্তিতে পশুর হাটে মধ্যস্বত্বভোগীদের কৃত্রিম লেনদেন ব্যয় ও চাঁদাবাজি বন্ধ করতে একটি ‘জাতীয় ডিজিটাল লাইভস্টক মার্কেটপ্লেস’ এবং কেন্দ্রীয় চামড়া ডাটাবেজ গড়ে তুলতে হবে। যেখানে খামারি ও সাধারণ ক্রেতারা সরাসরি যুক্ত হয়ে ন্যায্যমূল্যে পশু ও চামড়া কেনাবেচা করতে পারবেন। এই ধরনের ডিজিটাল নিলাম ও লেনদেন ব্যবস্থার মাধ্যমে পশুর হাটের ইজারা ও খাজনার নামে প্রভাবশালী মহলের সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি চিরতরে বন্ধ করা সম্ভব হবে।
তৃতীয়ত, আইএমএফ-এর ব্যয় সংকোচনের শর্ত ও ক্রমবর্ধমান রাজস্ব ঘাটতি সামলাতে বৈষম্যহীন কর সংস্কার জরুরি। বাজেটের অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি (যা দেশের জিডিপির প্রায় ৬.৯% এবং এনবিআরের মোট আদায়ের প্রায় সমপরিমাণ লোকসান ঘটায়) অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। কর্পোরেট ও উচ্চবিত্তের ওপর করের জাল বিস্তার করতে এবং গুলশান, বনানী, বারিধারা, ধানমন্ডি বা চট্টগ্রামের খুলশীর মতো অভিজাত এলাকাগুলোতে বিলাসবহুল লাইফস্টাইল ও সম্পদের সাথে মেলাতে বিশেষ কর সমীক্ষা চালাতে হবে। অপ্রয়োজনীয় বিলাসবহুল প্রকল্পের পরিবর্তে প্রান্তিক খামারিদের স্বার্থে পশুখাদ্যের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা উচিত এবং কাঁচা চামড়ার ন্যূনতম বাজার নিশ্চিত করতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের করছাড় ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা প্রদান করা প্রয়োজন।
চতুর্থত, মূল্যস্ফীতির ভয়াবহ কষাঘাতে জর্জরিত দরিদ্র ও নি¤œ-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে বাঁচাতে বাজেটের বরাদ্দ সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীতে সরাসরি যুক্ত করতে হবে। অকার্যকর ও দুর্নীতিগ্রস্ত টিসিবির পণ্য বিতরণের চেয়ে সুবিধাভোগীদের সরাসরি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নগদ সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাবিত ফ্যামিলি কার্ড স্কিম (৫০ লাখ সুবিধাভোগীর জন্য প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা হারে ১৪,৫০০ কোটি টাকা) এবং কৃষক কার্ড কর্মসূচি (৪২.৫ লাখ সুবিধাভোগীর জন্য বার্ষিক ২,৫০০ টাকা হারে ১,০৬২ কোটি টাকা) অত্যন্ত কঠোর ও স্বচ্ছ তদারকির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে।
পঞ্চমত, এলিনর অস্ট্রমের ‘পাবলিক কমন্স’ মডেলের ওপর ভিত্তি করে কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একচেটিয়া দায়িত্ব কেবল ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর না রেখে তা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। ঢাকার বাইরে সারা দেশের শহর ও গ্রামীণ পর্যায়ে স্থানীয় যুব ক্লাব, মসজিদ কমিটি এবং সামাজিক নেতৃত্বকে সরাসরি যুক্ত করে স্থানীয়ভাবে বর্জ্য অপসারণ ও পরিবেশ সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ‘কোরবানি বর্জ্য ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা’ খাতে স্থানীয় সরকারগুলোর জন্য বিশেষ বরাদ্দ রেখে এই ধরনের বিকেন্দ্রীভূত ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ শাসনকে উৎসাহিত করা সম্ভব।
পবিত্র কোরবানির ঈদ ও প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের মধ্যে যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ফাটলটি বিদ্যমান, তা মূলত নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত অবহেলা ও সপ্তভুজ লৌহ কাঠামোর নিষ্কাশনমূলক চরিত্রের প্রতিফলন। দেশের রফতানি খাতের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।
৯.৩০ লাখ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বিশাল রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনাকে কেবল অলিগার্কদের পকেট ভরার বা বড় বড় ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের হাতিয়ার না বানিয়ে, তাকে কোরবানির অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির মতো কোটি সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উৎপাদনশীল শক্তির সাথে একীভূত করতে হবে। অর্থনীতিবিদদের তাত্ত্বিক প্রজ্ঞা আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, একটি দেশের প্রকৃত মুক্তি ভৌত সিমেন্টের দালানে নয়, বরং মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। এখন প্রয়োজন কেবল বলিষ্ঠ ও জনবান্ধব রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, শহীদ বুদ্ধিজীবী সরকারি কলেজ, রাজশাহী
Email: [email protected]