যুদ্ধটা হাজার মাইল দূরে হলেও তার জন্য খেসারত দিচ্ছেন মিরপুরের পাম্পে লাইনে দাঁড়ানো রাইডার থেকে শুরু করে টাঙ্গাইলের প্রবাসী পরিবার পর্যন্ত সবাই। আতঙ্কে নয়, বরং হিসাব করে চলাই এখন সবচেয়ে কাজের প্রস্তুতি হবে।
যাদের পরিবারের কেউ মধ্যপ্রাচ্যে আছেন, পাঠানো টাকার পুরোটা খরচ না করে কিছু অংশ জমিয়ে রাখুন। চাকরি গেলে বা বেতন আটকে গেলে এই জমাই প্রথম ভরসা। প্রবাসে থাকা ভাইবোনেরা পাসপোর্ট, ভিসা ও কাজের চুক্তির কপি ফোনে আর কাগজে দুই জায়গাতেই রাখুন, দূতাবাসের জরুরি নম্বর সেভ করে রাখুন। জমি বিক্রি করে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এই মুহূর্তে কাউকে বিদেশে পাঠানোর আগে ভাল করে চিন্তা করুন।
সংসারের খরচে এখনই একটু লাগাম টানতে পারেন। আয়ের ছোট একটা অংশ হলেও আলাদা করে রাখুন, যাতে হঠাৎ দাম বাড়লে বা আয় কমলে দু-তিন মাস সামলানো যায়। মূল্যস্ফীতি যখন ৯ শতাংশের ওপরে, তখন কিস্তিতে বড় কেনাকাটা বা নতুন ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত একটু পিছিয়ে দেওয়াই নিরাপদ। অকারণে বাতি, পাখা, এসি চালিয়ে রাখা আর চুলা জ্বালিয়ে রাখা বন্ধ করলে বিলও কমে, দেশের আমদানির চাপও কিছুটা কমে। সামর্থ্য থাকলে ব্যক্তি পর্যায়ে বা শিল্পপর্যায়ে সৌরবিদ্যুতের ব্যাকআপ সিস্টেমে গেলে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে।
দাম বাড়বে, এই গুজবে একসঙ্গে বেশি চাল, সয়াবিন তেল বা গ্যাস সিলিন্ডার কিনে না রাখাই ভালো। মার্চে ঢাকার পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনের কথা অনেকের মনে আছে। সবাই একসঙ্গে মজুত করতে গেলে বাজারে টান পড়ে, আর দাম বাড়ে সবার জন্যই।
ট্রাম্প নিজেই যুদ্ধ থামার সময় বেঁধে দিয়েছেন নভেম্বরের নির্বাচনের পরে। সেই কথা সত্যি হলেও অন্তত শীতের শুরু পর্যন্ত বাংলাদেশকে চড়া দামের তেল আর এলএনজি কিনেই চলতে হবে। কথা না মিললে সংকট আরও লম্বা হবে। তাই সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকার পাশাপাশি নিজের ঘরেও কিছু প্রস্তুতি রাখা ভালো।
ঋণ নিয়ে চলা সরকার খরচ কমাতে চাইলে সাধারণত আগে হাত দেয় নির্মাণ প্রকল্পে। সৌদিতে বাংলাদেশিদের বড় অংশ কাজ করেন নির্মাণ, পরিবহন আর পেট্রল পাম্পে। প্রকল্প থামলে প্রথম ধাক্কা লাগতে পারে নতুন ভিসায়, পরে বেতন আর চাকরিতে। যারা এখন সৌদি যাওয়ার জন্য টাকা জোগাড় করছেন, দালালের হাতে টাকা দেওয়ার আগে বিএমইটি বা দূতাবাসের মাধ্যমে নিয়োগকর্তা ও ভিসা যাচাই করে নিলে ঝুঁকি কমে।
রেমিট্যান্স এখনো ভালো। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে এসেছে ৩২.৭৬ বিলিয়ন ডলার, আগের বছর একই সময়ে ২৭.৫১ বিলিয়ন। কিন্তু নতুন কর্মী যাওয়া কমছে। জুন পর্যন্ত চার মাসে বিদেশে কর্মী পাঠানো করোনার আগের পর্যায়ে নেমে গেছে। যুদ্ধ শুরুর পর এপ্রিল পর্যন্ত আমিরাত, সৌদি, বাহরাইন ও লেবাননে অন্তত ৭ জন বাংলাদেশি শ্রমিক মারা গেছেন।
তেলের দাম আবার ১০০ ডলার ছাড়ানোয় পাম্পে দাম বাড়ার চাপ ফিরছে। বাংলাদেশ সৌদি আরামকোর কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনে, আর ইয়ানবু থেকে এশিয়ায় আসা জাহাজকে বাব আল মান্দেব পার হতে হয়। হুতিরা এই প্রণালীতে জাহাজ আটকালে সরবরাহ পিছিয়ে যেতে পারে। বাসভাড়া থেকে চাল-ডাল, সবখানে তার ধাক্কা লাগবে।
এপ্রিলে সরকার ডিজেলের দাম লিটারে ১০০ থেকে ১১৫ টাকা, পেট্রল ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা আর অকটেন ১২০ থেকে ১৪০ টাকা করে। এর পরের তিন মাসে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৯.২১ শতাংশে, বেড়েছে পরিবহন আর সবজির খরচ।
গত বছর বাংলাদেশ যত এলএনজি এনেছিল, তার ৬০ শতাংশের বেশি এসেছিল কাতার থেকে। কাতারের গ্যাসবাহী জাহাজ বের হয় হরমুজ দিয়ে। সেপ্টেম্বরের দুটি কার্গো কেনা হচ্ছে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ ডলারের বেশি দামে, যুদ্ধের আগে এই দাম ছিল ১০ থেকে ১২ ডলার। একেকটি কার্গোর দাম পড়ছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।
এই সপ্তাহে ডালাসে দলীয় সভায় তিনি হরমুজের নাম ‘ট্রাম্প প্রণালী’ রাখার কথা তোলেন, বলেন কিছু একটা তো তাঁর পাওয়া উচিত। যুদ্ধ কবে থামবে, এই প্রশ্নে বলছেন নির্বাচনের ঠিক পরে। জর্ডানের ঘাঁটিতে মার্কিন বিমানের কোনো ক্ষতি হয়নি বলেও দাবি করেছেন। সিবিএস ও রয়টার্সের সূত্র অবশ্য বলছে, একটি এ-১০ বিমানের ডানা ভেঙেছে, আটটির মতো এফ-১৫ হালকা ক্ষতির পর আবার কাজে ফিরেছে।
এরপর ট্রাম্পের কথায় আলোচনার চেয়ে জেদই বেশি শোনা গেছে। আগস্টে তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে ‘আধা-আলোচনা’ চলছে, তিনি শুধু দেখছেন ইরানে মূল্যস্ফীতি কত আর তাদের হাতে টাকা নেই। প্রতিনিধিদের বলেছেন ইরানের কাছে ক্ষতিপূরণ চাইতে।
১৭ জুন পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেন। কথা ছিল ৬০ দিন আলোচনা চলবে, যুক্তরাষ্ট্র নৌ-অবরোধ তুলবে, ইরান হরমুজ থেকে মাইন সরিয়ে জাহাজ চলতে দেবে। কিন্তু প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, এ নিয়ে দুই পক্ষ দুই রকম ব্যাখ্যা দাঁড় করায়। ৮ জুলাই ট্রাম্প ঘোষণা দেন, সমঝোতা শেষ। আগস্টের মাঝামাঝি ৬০ দিনের মেয়াদও ফুরিয়ে যায়।
সৌদি আরব দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে, বিষয়টি এমন নয়। দেশটির মোট ঋণ জিডিপির ৩৪ শতাংশের মতো, এসঅ্যান্ডপি ও মুডিস রেটিং কমায়নি। ভয়টা অন্য জায়গায়। তেল বেচে যে দেশ এই দামে সবচেয়ে বেশি লাভ করার কথা, সে-ই যদি ঋণ খোঁজে, তাহলে তেল কিনে চলা দেশগুলোর ওপর চাপ কতটা, তা সহজেই আন্দাজ করা যায়।
সবচেয়ে বড় খবর, ইয়েমেনের হুতিরা দখল করে নিয়েছে বন্দরশহর মোখা। লোহিত সাগরে ঢোকার মুখ বাব আল মান্দেব প্রণালী এই শহরের কাছেই। এক হরমুজ নিয়েই সারা বিশ্ব অস্থির, তার ওপর এখন মান্দেব। তেলের দাম জুলাইয়ের পর আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে।
প্রতিবেদক
আব্দুল্লাহ আল সাফি একজন সাংবাদিক, বর্তমানে চ্যানেল আই অনলাইনে আউটপুট এডিটর হিসেবে কর্মরত। দৈনিক আজকালের খবর থেকে সাংবাদিকতা শুরু করে বিডিনিউজ২৪.কম, নিউজনেট ও প্রিয় ডটকমে কাজ করেছেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ সরকারের দুটি মন্ত্রণালয়ে বিশ্বব্যাংক ও নরওয়ে এইডের উন্নয়ন প্রকল্পে এবং একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিউ মিডিয়া কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। আব্দুল্লাহ আল সাফি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউএসএইড–এর অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্প থেকে প্রশিক্ষিত একজন ফ্যাক্ট-চেকার ও আর্টিফিশিয়াল ইনটিলিজেন্স (এআই) বিষয়ে দক্ষ। এছাড়া তিনি অ্যাকশন এইড, রিলিফ ইন্টারন্যাশনাল ও হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড–এর সঙ্গে গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কাজে যুক্ত ছিলেন। তিনি একজন প্রাক্তন জেলা পর্যায়ের ক্রিকেট খেলোয়াড় এবং মঞ্চ নাটকের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। অবসর সময় তিনি ভ্রমণ, সিনেমা দেখা ও পরিবারকে সময় দিতে পছন্দ করেন। Abdullah al shafi's যোগাযোগ তথ্য: https://www.facebook.com/shafi.abdullah shafidocs@gmail.com
আরও →