প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগস্টের শেষদিকে বা সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে ভারত সফর করতে পারেন। অর্থাৎ ব্রিকস সম্মেলনের আগেই এ সফর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ বিষয়ে কাজ চলমান আছে। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র যুগান্তরকে এ তথ্য জানিয়েছে।
এদিকে আমাদের কলকাতা প্রতিনিধি জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি নিয়ে আপাতত আটকে না থেকে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে নয়াদিল্লি। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ব্রিকসের বৈঠক হওয়ার আগেই পাঁচ মাস আগে পাঠানো ভারতের আমন্ত্রণে ঢাকা ইতিবাচক সাড়া দিক, এমনটাই চাইছে ভারত।
এক্ষেত্রে ঢাকার জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক উপহারের ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে। তবে আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান কিংবা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেষ পর্যন্ত সফরে না গেলে দুদেশের সম্পর্ক নতুন করে অস্বস্তির মধ্যে পড়তে পারে। ফলে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখন বল ঢাকার কোর্টে। ঢাকা কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই নজর রাখছে নয়াদিল্লি।
এদিকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক খবরে বলা হয়েছে, বিমসটেক সম্মেলনের আগে আগামী সপ্তাহেই দিল্লি যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ লক্ষ্যে দুই দেশেই প্রস্তুতি চলছে। ঢাকা ও দিল্লির সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে এনডিটিভি এ খবর প্রকাশ করেছে।
কূটনৈতিক সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে কলকাতা প্রতিনিধি বলেন, ভারত চাইছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে তৈরি অস্বস্তিকে দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের পথে প্রধান বাধা হিসাবে না রাখতে। বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতায় এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে চায় নয়াদিল্লি। সে কারণেই তারেক রহমানের ভারত সফরকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ভারতের পক্ষ থেকে পাঁচ মাস আগে বাংলাদেশের কাছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু এখনো সেই আমন্ত্রণে আনুষ্ঠানিকভাবে সাড়া দেয়নি ঢাকা। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ব্রিকস বৈঠকের সময় ঘনিয়ে আসছে। ফলে ওই সময়ের আগে তারেক রহমান নয়াদিল্লিতে এলে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সরাসরি বৈঠকের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কূটনৈতিক মহলের মতে, তারেক রহমানের ভারত সফর হলে শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, দুই দেশের সম্পর্কের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ, নদীর পানি, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো বিষয় আলোচনায় আসতে পারে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজেদের উদ্বেগ ও প্রত্যাশার বিষয়গুলো তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে। নয়াদিল্লি অবশ্য এই মুহূর্তে প্রকাশ্যে কোনো কঠোর বার্তা দিতে চাইছে না। বরং ইতিবাচক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে। তারই ইঙ্গিত মিলেছে ভারতের রাজ্যসভায় দেওয়া বিদেশ প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিংহের বক্তব্যে। বৃহস্পতিবার রাজ্যসভায় এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ভারত। ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ আরও উন্নত হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে রেল ও সড়ক যোগাযোগ, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং সামগ্রিক সংযোগ আরও বাড়বে। ভারতের এই বক্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল। কারণ দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কে নানা টানাপোড়েন থাকলেও যোগাযোগ ও বাণিজ্যের মতো ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিয়েছে নয়াদিল্লি।
এর আগে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ঢাকা একাধিকবার সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যর্পণের বিষয়টি সামনে এনেছে। কিন্তু নয়াদিল্লি সেই দাবির বিষয়ে এখনো এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, যাতে দ্রুত প্রত্যর্পণের সম্ভাবনা তৈরি হয়। ফলে বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কে একটি বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত চাইছে, একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে গোটা সম্পর্ককে আটকে না রেখে নতুন সরকারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো হোক। তারেক রহমানের ভারত সফর সেই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে বলে মনে করছে নয়াদিল্লি। তবে দিল্লির বার্তায় একটি কূটনৈতিক চাপও রয়েছে। সূত্রের বক্তব্য, তারেক রহমান যদি ভারতের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন, তাহলে তাকে নয়াদিল্লিতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে স্বাগত জানানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি ঢাকাকে একটি ‘অভাবনীয়’ কূটনৈতিক উপহার দেওয়ার ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সফর প্রত্যাখ্যান করা হলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে অস্বস্তি বাড়তে পারে।
ফলে এখন দেখার বিষয়, ঢাকা কোন পথ বেছে নেয়। তারেক রহমানের ভারত সফর হলে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে বলে মনে করছে কূটনৈতিক মহল। আর সফর না হলে সম্পর্কের বর্তমান অস্বস্তি আরও কিছুদিন বহাল থাকার আশঙ্কা রয়েছে। সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নের পাশাপাশি এখন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে তারেক রহমানের ভারত সফর।
এনডিটিভি লিখেছে, সম্ভাব্য এই সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এর মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা গুরুত্ব পেতে পারে। সব ঠিক থাকলে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে এটাই হবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর। দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এ সফর তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, দুই দিনের এই সফরকে দ্বিপক্ষীয় সফর হিসাবেই পরিকল্পনা করা হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জিতে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল নরেন্দ্র মোদির সরকার। এছাড়া সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনেও বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
এনডিটিভি আরও লিখেছে, ভারত সফরে তারেক রহমানের আলোচনায় শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ভারত বলে আসছে, বাংলাদেশের অনুরোধ তারা ‘যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায়’ পর্যালোচনা করছে। তবে ভারত তাকে ফেরত দেবে, তেমন সম্ভাবনা দেখছেন না অধিকাংশ বিশ্লেষক। গত ৫ আগস্ট দিল্লির সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বক্তব্য দেওয়ার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল ঢাকা। ঢাকার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার মধ্যে ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ হয় নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর। ওই বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, ভারতের কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চাওয়ার পাশাপাশি তাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত রাখতে বলেছে ঢাকা। পরদিন দিল্লির ব্রিফিংয়ে রণধীর জয়সওয়ালকে এ বিষয়ে আবারও প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বিষয়ে জানতে চান একজন সাংবাদিক। শেখ হাসিনার মামলার নথি ঢাকা থেকে পাঠানো হয়েছে কিনা, সে প্রশ্নও তিনি করেন। জবাবে জয়সওয়াল বলেন, এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট। ভারতের নিজস্ব প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ায় বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আর এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য থাকলে জানিয়ে দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে এনডিটিভি লিখেছে, তারেক রহমান ও ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠকেও শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। তবে দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্ক যাতে এই একটি প্রশ্নে আটকে না যায়, সেজন্য বিষয়টি কীভাবে আলোচনায় আনা হবে, তাও উভয় সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।