বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে এখন ভাঙাগড়ার খেলা চলছে। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা আজ অনেকটাই অতীত, জায়গা করে নিচ্ছে বহুমেরুকেন্দ্রিক এক জটিল ও পরিবর্তনশীল বিশ্ব। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও কৌশলগত মানচিত্রে এক বিশাল রদবদল ঘটতে যাচ্ছে, যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো সম্প্রতি সই হওয়া ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ বা ‘মক্কা প্যাক্ট’। পবিত্র নগরী মক্কায় মুসলিম বিশ্বের তিন প্রভাবশালী রাষ্ট্র— সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি কেবল একটি সাধারণ সামরিক সমঝোতা নয়, বরং এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার এক নতুন স্থাপত্য। এখন সবচেয়ে বড় ও প্রাসঙ্গিক আলোচনাটি আবর্তিত হচ্ছে এই জোটের সম্প্রসারণ এবং সেখানে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানকে ঘিরে। বাংলাদেশের এই জোটে যোগ দেওয়া কতটা যৌক্তিক, এর ভূরাজনৈতিক লাভ-ক্ষতিই বা কী, এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে জোর আলোচনা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত পরিবর্তন, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে তার অধিক মনোযোগের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে তার সেই ঐতিহ্যবাহী ‘নিরাপত্তা ছাতা’ ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত, আব্রাহাম অ্যাকর্ডের দৃশ্যমান ব্যর্থতা এবং ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বুঝতে পেরেছে যে, নিজেদের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আর ভিনদেশি পরাশক্তির ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করা চলবে না। ঠিক এই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নিয়েছে মক্কা প্যাক্ট।
এই চুক্তির প্রতিষ্ঠাতা তিন সদস্যের দিকে তাকালে এর শক্তিমত্তার প্রকৃত চিত্রটি অনুধাবন করা যায়। সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল জ্বালানি সম্পদ ও অর্থনৈতিক আধিপত্য, তুরস্ক নিয়ে এসেছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞতা এবং সর্বাধুনিক সমরাস্ত্র প্রযুক্তি (বিশেষ করে ড্রোন ও সাইবার যুদ্ধাস্ত্র), আর পাকিস্তানের হাতে রয়েছে বিশাল সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী ও মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার। এই তিন দেশ মিলে প্রায় ১৪ লাখ সক্রিয় সেনাসদস্য, কয়েক হাজার যুদ্ধবিমান এবং ট্যাংকের এক বিশাল সামরিক বলয় তৈরি করেছে। চুক্তির সবচেয়ে যুগান্তকারী দিকটি হলো এর ‘যৌথ প্রতিরক্ষা’ নীতি—অর্থাৎ, জোটে থাকা যেকোনো একটি দেশের ওপর আক্রমণ হলে তা সব সদস্যের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে। এটি পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর বিখ্যাত ‘আর্টিকেল ফাইভ’-এরই এক অভিনব মুসলিম সংস্করণ।
মক্কা জোটে যোগদানের বিষয়ে বাংলাদেশের সরকারি অবস্থান এখন পর্যন্ত অত্যন্ত ইতিবাচক। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে স্পষ্টভাবেই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, এই জোটকে একটি গঠনমূলক আত্মরক্ষার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, বাংলাদেশ কেবল নীরব দর্শক হয়ে থাকতে চাইছে না। শান্তিরক্ষা মিশনে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও সামরিক শৃঙ্খলার কারণে বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, এই ইস্যুতে দেশের ভেতরে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ঐকমত্য লক্ষ করা যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন সরকার, বিরোধী দল এবং সাধারণ জনগণ— সবাই এই জোটের বিষয়ে ইতিবাচক। একটি বিভক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন ঐক্য সত্যিই বিরল। বিশেষ করে, পার্শ্ববর্তী দেশের নিরবচ্ছিন্ন ভূরাজনৈতিক চাপ ও আধিপত্যবাদী আচরণের কারণে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন একটি শক্তিশালী জোটের অংশ হওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, যা মূলত মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত নির্ভরতারই একটি বহিঃপ্রকাশ।
বাংলাদেশ যদি এই জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেয়, তবে সামরিক, কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে আমাদের প্রাপ্তির খাতাটি বেশ ভারী হবে।
প্রথমত, প্রতিরক্ষা ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। তুরস্কের মতো সামরিক ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত দেশের সাথে সরাসরি কাজ করার সুযোগ বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে বহু ধাপ এগিয়ে নেবে। তুরস্ক থেকে অত্যাধুনিক ড্রোন, সেন্সর, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) নির্ভর সমরাস্ত্র এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের প্রযুক্তি অত্যন্ত সহজ শর্তে পাওয়া যেতে পারে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সাথে যৌথ প্রশিক্ষণ ও কৌশলগত জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্ব আরও সুদৃঢ় হবে। এছাড়া, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের সামরিক গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও সীমান্ত নিরাপত্তাকে নিñিদ্র করবে।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। সৌদি আরব শুধু একটি সামরিক মিত্রই হবে না, বরং তারা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রাণশক্তির এক বিশাল জোগানদাতা হতে পারে। জোটে থাকলে সৌদি আরবের জ্বালানি নীতিতে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার পাবে, যা দেশের বর্তমান তীব্র গ্যাস ও তেল সংকট সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখবে। সৌদি আরামকো-এর মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের তেল শোধনাগার বা জ্বালানি অবকাঠামোয় বিশাল বিনিয়োগ করতে পারে। পাশাপাশি, সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ মেগা প্রকল্পগুলোতে বাংলাদেশের বিশাল শ্রমবাজার আরও সুরক্ষিত হবে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে নতুন গতি আসবে। তুরস্কের সাথেও আমাদের শুল্কমুক্ত বাণিজ্য এবং তৈরি পোশাক রপ্তানির বিশাল সুযোগ তৈরি হবে।
তৃতীয়ত, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও প্রতিরোধক বলয় হিসেবে ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে এমন এক স্থানে অবস্থিত, যার তিন দিক ঘিরে রয়েছে একটি বিশাল ও শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্র। অতীতে বিভিন্ন সময় এই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসা কূটনৈতিক চোখরাঙানি বা প্রচ্ছন্ন হুমকি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের অস্বস্তিতে ফেলেছে। মক্কা প্যাক্টে যোগ দিলে বাংলাদেশ একটি ‘এক্সটেন্ডেড সিকিউরিটি আমব্রেলা’ বা সম্প্রসারিত নিরাপত্তা ছাতার নিচে প্রবেশ করবে। তখন বাংলাদেশের দিকে সামরিক বা কূটনৈতিকভাবে আগ্রাসী পদক্ষেপ নেওয়ার আগে যেকোনো রাষ্ট্রকে অন্তত দুবার ভাবতে হবে। কারণ, এর পেছনে থাকবে একটি বিশাল জোটের সম্মিলিত শক্তি। এটি আমাদের স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি প্রণয়নে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক শক্তি জোগাবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অবশ্যই মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যোগদান করা উচিত। তবে তা হতে হবে অত্যন্ত সুচিন্তিত, শর্তসাপেক্ষ এবং নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে শতভাগ সমুন্নত রেখে।
কেন যোগ দেওয়া উচিত, তার পেছনের যুক্তিগুলো অত্যন্ত সুদৃঢ়। একুশ শতকের এই বহুমেরু বিশ্বে ‘জোটনিরপেক্ষ’ থাকার অর্থ এই নয় যে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বা দুর্বল করে রাখা। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটে ছিল না, যার ফলে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে আমরা প্রায়শই এক ধরনের ‘সফট টার্গেট’ বা দুর্বল লক্ষ্যবস্তু হিসেবে পরিগণিত হয়েছি। ভারত আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র হলেও, একটি সার্বভৌম দেশের নিরাপত্তা কখনোই কেবল প্রতিবেশীর সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে ছেড়ে দেওয়া যায় না। ক্ষমতার ভারসাম্য বা ‘ব্যালেন্স অব পাওয়ার’ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এক ধ্রুব সত্য। মক্কা জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি ঠিক সেই ভারসাম্যটিই তৈরি করবে।
অনেকে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার যে ভয়ের কথা বলছেন, তারও বাস্তবসম্মত সমাধান রয়েছে। সামরিক জোট মানেই যে অন্ধভাবে অন্যের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া নয়, তার বড় প্রমাণ খোদ সৌদি আরব ও পাকিস্তান। ২০১৫ সালে তাদের মধ্যে এমন একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকার পরও, ইয়েমেন যুদ্ধে বা ইরানের সাথে উত্তেজনার সময় পাকিস্তান কিন্তু সরাসরি সৈন্য পাঠিয়ে যুদ্ধে অংশ নেয়নি। প্রতিটি চুক্তিতেই নিজস্ব সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধারা (Escape Clause) থাকে। বাংলাদেশও এই জোটে প্রবেশের সময় স্পষ্ট শর্ত যুক্ত করতে পারে যে, এই জোট কেবলই ‘প্রতিরক্ষামূলক’ (Defensive) হবে। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী কেবল তখনই সামরিকভাবে অংশ নেবে, যখন কোনো সদস্য রাষ্ট্র সরাসরি বহিঃশত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হবে এবং জাতিসংঘ সনদের সাথে তা সাংঘর্ষিক হবে না। আমরা লজিস্টিক, প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণের জায়গায় অবদান রাখতে পারি, যা সরাসরি সৈন্য পাঠানোর চেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু সমান কার্যকর।
তাছাড়া, আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো— বিশেষ করে চীন এবং রাশিয়াও এই জোটের উত্থানকে ইতিবাচকভাবেই দেখছে, কারণ এটি মার্কিন আধিপত্যকে খর্ব করছে। ট্রাম্প প্রশাসনও চাইছে আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের দায়িত্ব নিজেরা নিক। এমন একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক ঐকমত্যের সময়ে এই জোটের অংশীদার হওয়া বাংলাদেশের জন্য এক অভূতপূর্ব কৌশলগত সুযোগ।
পরিশেষে বলতে চাই, বাঁচতে হলে আগে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে হয়। মক্কা প্যাক্ট বাংলাদেশের জন্য হতে পারে সেই সক্ষমতা অর্জনের এক ঐতিহাসিক প্ল্যাটফর্ম। এটি শুধু একটি চুক্তি নয়, এটি বিশ্বদরবারে একটি আত্মমর্যাদাপূর্ণ ও মেরুদণ্ডসম্পন্ন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এক নীরব ঘোষণা। আমরা যেন অহেতুক ভীতি বা অপরের মন জুগিয়ে চলার নীতিতে আচ্ছন্ন হয়ে এই সুবর্ণ সুযোগটি হাতছাড়া না করি। কূটনীতির টেবিলে সর্বোচ্চ প্রজ্ঞা ও দরকষাকষির মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষিত করে, মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের নাম লেখানোই হবে একবিংশ শতাব্দীতে দেশের সবচেয়ে দূরদর্শী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintuanowar.com