ফখরুল মিয়া, কামাল মুন্সি, সোহান মিয়া, সুপি বেগম, শারমিন বেগম, জগলু মিয়া, ফাইজা বেগম, সাজক মিয়া, আনিকা, লাউল মিয়া, আকবর আলী ওরা ১১ জন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। তারা একই পরিবারের বাসিন্দা। তাদের মধ্যে কামাল মুন্সি ও লাউল মিয়া আপন ভাই। মানুষের সাহায্য নিয়েই চলেন। কাজকর্ম করার ক্ষমতা নেই তাদের।
সাম্প্রতিক বন্যায় বাড়ির চার দিকে পানি থৈ থৈ করছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় কেউ আসছেন না তাদের বাড়িতে। সাহায্যের আবেদন নিয়ে তাদের অভিভাবকরাও বের হতে পারছেন না। এমনই দুর্ভোগে পড়েছেন মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার বন্যাকবলিত কামারচাক ইউনিয়নের কড়াইয়া হাওর পারের দক্ষিণ ইসলামপুর গ্রামের কামাল মুন্সির বাড়ির ১১ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী।
এক বাড়িতে পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা। চারদিকে থৈ থৈ পানিতে চলাচলের সব পথ বন্ধ। দৃষ্টি না থাকায় নিজেরাই নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না। আবার কোনো সাহায্যের হাতও এখনো পৌঁছায়নি তাদের কাছে। ফলে প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে অনিশ্চয়তা, উৎকণ্ঠা ও দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে। তবে সোমবার বিকেলে রাজনগর উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার পক্ষ থেকে নগদ অর্থ পৌঁছানোর খবর পাওয়া গেছে।
টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা লাগাটা নদীর ঢলে সৃষ্ট বন্যায় বাড়িটির চারপাশ পানিতে তলিয়ে গেছে। ঘরের ভেতর আশ্রয় নিয়ে থাকা এসব দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের কাছে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সঙ্কট দিন দিন তীব্র হয়ে ওঠেছে। নিরাপদে সরে যাওয়ার কোনো উপায় না থাকায় তারা বিপদের মধ্যে দিন পার করছেন।
সোমবার (১৩ জুলাই) বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে কথা হলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সুফি বেগম বলেন, ‘আমি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। চারদিকে পানি। কোনো কাজ করতে পারি না। আগে মানুষের বাড়িতে অন্ধত্ব নিয়েও কাজে যেতাম, কিছু সাহায্য নিয়ে চলতে পারতাম। বন্যা আসার পর থেকে বড় কষ্টে আছি। কেউ সাহায্য নিয়ে আসতে পারে না। আমিও কারো বাড়ি যেতে পারি না। একবেলা খাইলে আরেকবেলা আমাদের না খেয়ে থাকতে হয়।’
বাড়ির প্রবীণ নারী কবিতুন বেগম বলেন, ‘এই বাড়ির অনেক লোক অন্ধত্বের ঝুঁকি নিয়ে দিন কাটান। তাদের অনেক কষ্ট হয়। এদের দিকে কেউ সাহায্যের হাত বাড়ালে তাদের উপকার হবে।’
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কামাল মুন্সি বলেন, ‘আমরা জন্মের পর থেকে অন্ধ। ডাক্তার বলেন, আমাদের দৃষ্টি ফিরে আসবে না। এরপর থেকে আমাদের আর চিকিৎসা হচ্ছে না।’
স্থানীয় সমাজসেবক সুমন আহমদ বলেন, ‘বন্যার কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় তাদের কাছে সহজে ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। সমাজসেবা অধিদফতরের পক্ষ থেকে আটজন প্রতিবন্ধী ভাতা পেয়ে আসছেন। বাড়ির চারদিকে পানি থাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা সেখানে পৌঁছাতে পারেনি।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো সমাজ ও রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। যোগাযোগের কারণে কোনো সামাজিক সংগঠন এগিয়ে আসতে পারছে না।’
রাজনগর উপজেলা সমাজসেবা অধিদফতরের কর্মকর্তা আজাদুর রহমান বলেন, ‘এ পর্যন্ত ১১ জনের মধ্যে আটজন প্রতিবন্ধী ভাতা নিয়ে আসছেন। বাকি তিনজনের আবেদন না থাকায় দেয়া যাচ্ছে না। আবেদন করা হলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিব। আমরা সাধ্যমত তাদের সাহায্যের চেষ্টা করে যাচ্ছি। সরকারি কোনো সুযোগ আসলে তাদের জন্য আলাদা করে দেয়ার চেষ্টা করা হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল সিকদার বলেন, ‘বিষয়টি জানা পর আমরা খবর নিয়েছি। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে বরাদ্ধ পাঠিয়েছি। আমরা তাদের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা দিতে এগিয়ে আসব।’