যানজট কেন হয় তা জানার জন্য কোন বিশেষজ্ঞর কাছে যেতে হবে না। যারা নগরে বসবাস করেন তারা বিষয়টি সবাই কমবেশি জানেন। অপরিকল্পিতভাবে নগরীর অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং রাস্তাঘাট সুপরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খলভাবে বিনির্মাণ না করার কারণে যানজটের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া রাস্তার চেয়ে গাড়ির সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত হলে যানজটের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে সেটাই ঘটছে। যানজটে দৈনিক ক্ষতি হয় কয়েকশ’ কোটি টাকা। এই ক্ষতিতে রাজস্ব আয় কমে যায়, অন্যদিকে রাজস্ব ব্যয় বেড়ে যায়। যানজট ‘একটি স্থিতিশীল বাজেটের’ জন্য বড় ধাক্কা। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এক কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করতে স্বাভাবিক গতিতে সময় লাগার কথা ৫ থেকে ১০ মিনিট, সেখানে ঢাকা শহরে সময় লাগে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট। যানজটে ৩০ মিনিট সময় নষ্ট হওয়া বিশাল অংকের অর্থনৈতিক ক্ষতি, যেটা বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের বহন করা সম্ভব নয়। এটা নাগরিক সমাজও স্বীকার করেছে বিভিন্ন সেমিনারে।
উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে শহরমুখী (City Area) গাড়ির গতি প্রতি ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার যেটা আমি ইংল্যান্ড, কানাডা এবং সিঙ্গাপুরে দেখেছি। কিন্তু বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় একঘণ্টা সময়ে ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার বেশি যাওয়া যায় না। এখানেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষতিটা লুকায়িত রয়েছে। আমরা সিটি এরিয়াতে পরিবহন সেক্টরে প্রতি বছর প্রচুর লোকসানের শিকার হচ্ছি বিষয়টিকে গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে। জাপানের টোকিও শহরের পরে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তর জনবহুল শহর হলো ঢাকা। জাপানে যানজট নেই বললেই চলে। আর ঢাকায় যানজটের কারণে দৈনিক ৩ থেকে ৪ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। পত্রিকায় উঠেছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে অফিস করতে এসে দেখেছেন, সময় মতো অল্প সংখ্যক লোক কাজে হাজিরা দিতে পারছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও জানেন, এর মূল কারণ যানজট। আর এভাবেই প্রতিদিন আমাদের বাজেট ঘাটতি দীর্ঘ হচ্ছে এবং মুদ্রার মান দ্রুত নেমে যাচ্ছে। ১০ বছর আগে ২০ (২০১৬) টাকা মূল্যের পণ্যের দাম জুন ২০২৬ এসে দাঁড়িয়েছে ১০০ টাকা। ১০ বছরের ব্যবধানে পণ্যের দাম ৮০ টাকা বেড়ে যাওয়া খুব কম দেশেই ঘটে। ২০১৬ সালে এক কেজি সাইজের ইলিশ মাছের দাম ছিল ৭০০/৮০০ টাকা, আজ ২০২৬ সালে এসে ২৫০০/২৬০০ টাকায় কিনতে হয়। এটা এখন সৌখিন মানুষের খাদ্যপণ্য। এতে প্রমাণ হয়, যানজটের কারণে টাকার দাম কমছে, অন্যদিকে পণ্যের দাম বাড়ছে। মুদ্রানীতি এখন খাতা-কলমে সচল, বাস্তবে অচল। এ ছাড়া বাংলাদেশে যানজট ও জনজট বাংলাদেশের সৌন্দর্যের ভয়াবহ ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। সময় যতই অতিবাহিত হচ্ছে সমস্যার শেকড় কেউ চিহ্নিত করছে না বা করতে পারছে না।
ঢাকা শহরে যতগুলো পাইকারি বাজার আছে তা রক্ষণাবেক্ষণ করার আধুনিক প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। যানজটের কারণে ঢাকার বাইরে থেকে যেসব পণ্যসামগ্রী ঢাকার পাইকারি বাজারে আসে তার অর্ধেকই বিলম্বজনিত কারণে পথেই নষ্ট হয়ে যায়, তারপর আছে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য। এখানেও মোটা অংকের চাঁদা দিতে হয়। এসব কিছুই যানজটের ক্ষতির মধ্যে পড়ে। যারা শহরে পরিবার নিয়ে থাকে তারা নিয়মমাফিক কাজ যেমন হাটবাজার করা, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া, ব্যক্তিগত কাজে ঘরের বাইরে যাওয়া ইত্যাদি নানা কাজে অনেক টাকা খরচ করতে হয়। দিনে ২/৩ ঘণ্টার কাজ করতে সময় নষ্ট হয় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা। এ ক্ষেত্রে ১০ ঘণ্টা যে সময় নষ্ট হয় তার মূল্য প্রতিজনে কয়েক হাজার টাকা গুনতে হয়। যানজটে অর্থনৈতিক ক্ষতির অংক লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। পৃথিবীর কোনও দেশে যানজটে বাংলাদেশের মতো এতো মোটা অংকের ক্ষতি হয় না। আমাদের দেশে এক বছরে যানজটে যে ক্ষতি হয় তা দিয়ে বাংলাদেশকে মেট্রো ও পাতাল রেল দ্বারা সুসজ্জিত করা সম্ভব। চীন দেশ ৬৫টা বাংলাদেশের সমান। তারা এতবড় দেশকে মাত্র ৫০ বছরে আজকের জায়গায় নিয়ে এসেছে। আর ৫৬ বছরে বাংলাদেশ চীনের সাথে তুলনা করলে দেখা যাবে আমরা সিকিভাগও এচিভ করতে পারিনি। নিজেদের কর্মদোষে আমরা বাংলাদেশকে ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে দিয়েছি। উন্নতির রহস্য উদঘাটনে বেরিয়ে আসবে চীনের ঘরে ঘরে ইঞ্জিনিয়ার আর বাংলাদেশের ঘরে ঘরে রাজনীতি। আরেকটি উদাহরণ: বাংলাদেশের বয়স ৫৬ বছর, পাশাপাশি সমবয়সী মালয়েশিয়ার সাথে তুলনা করলে মনে হয় আমরা পিছিয়ে আছি অনেক। আমাদের মাথাপিছু গড় আয় ৩ হাজার ২০ মার্কিন ডলার। অন্যদিকে মালয়েশিয়া ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে মাথাপিছু গড় আয় ৪৬ হাজার ৯৮৬ মার্কিন ডলার। প্রযুক্তিগতভাবে তারা এগিয়েছে অনেক। দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও রাজনৈতিক গন্ডগোল নেই বলেই চলে।
আমরা বিশ্ব দরবারে হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজি আর মালয়েশিয়া চাকরি দেয়। বাংলাদেশের কয়েক লাখ মানুষ চাকরি করছে মালয়েশিয়ায়। দেশের প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ শ্রমজীবী বিদেশে শ্রম বিক্রি করে জীবন পরিচালিত করছে। আমি দেখেছি, গাধার খাটুনি খেটে কী কষ্ট করে নি¤œ মানের কাজ করছে বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোতে। এই কষ্টটা যদি ‘স্বদেশ’ গড়ে তোলার জন্য করতো বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার মতো ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হতো। অপ্রিয় সত্য, পরিশ্রম অনুযায়ী পারিশ্রমিক পায় না বলেই মানুষ আজ প্রবাসে নি¤œমানের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।
নানামুখী সমস্যার কারণে মানুষের স্রোত ঢাকামুখী হচ্ছে। এ কারণে অনিয়ন্ত্রিত গাড়িসমূহ যান জটের সৃষ্টি করছে। ঢাকাকে ভেঙে যদি বিকেন্দ্রীকরণ করে গ্রামে নিয়ে যাওয়া যেতো, যেটা আমি লন্ডনে দেখেছি, তাহলে যানজট আজকের মতো ভয়াবহ রূপ ধারণ করতো না। নগরবাসীর কাছে যানজট একটি মূর্তিমান আতঙ্ক। প্রতিদিনের অসহ্য যানজটের কারণে মানুষের জীবন ও জীবিকা স্থবির হয়ে পড়ছে। পকেটের টাকা কেড়ে নিচ্ছে প্রতিদিনকার যানজট। অর্থনৈতিক এক অনিশ্চিত জটিলতার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে মানুষের জীবন।
সরকার চাইলে নগরীর যানজট সমস্যার সমাধান করতে পারে। প্রয়োজন আন্তরিক সদিচ্ছা। লন্ডন শহরের চতুর্দিকে প্রায় চার শত স্বনির্ভর ভিলেজ টাউন গড়ে তুলেছে লন্ডন সিটি মেয়র। মেট্রোরেল ও পাতাল রেল দিয়ে এই ৪০০ ভিলেজ টাউনের সাথে সেন্ট্রাল লন্ডনের সাথে সংযোগ স্থাপন করে দিয়েছে লন্ডন কর্তৃপক্ষ । ফলে ছুটির পর লন্ডন শহরে ছিমছাম নিরবতা বিরাজ করে। এ দৃশ্য আমি নিজের চোখে দেখেছি। আমার মতো সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও প্রতিনিয়ত দেখছে। সরকার চাইলে প্রতি বছর একলাখ কোটি টাকার ক্ষতি থেকে রাষ্ট্রকে বাঁচাতে পারে।
লেখক: গ্রন্থকার, গবেষক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক।