বসে থাকা নাকি দাঁড়িয়ে থাকা- কোনটা শরীরের জন্য বেশি ভালো? বছরের পর বছর ধরে আমাদের কানে একটা কথা গেঁথে দেয়া হয়েছে যে, ‘বেশি সময় বসে থাকা মানেই নতুন কালে ধূমপান’। মানে ‘বিষপান’।
কথাটা শুনতে বেশ নাটকীয় মনে হলেও এর ভেতরে এক গভীর সত্য লুকিয়ে আছে, আবার অনেকখানি অতিসরলীকরণও করা হয়েছে। আমরা যদি শুধু এটাই মেনে নিতাম যে, বসে থাকাটাই সব সমস্যার মূল, তবে শুধু দাঁড়িয়ে কাজ করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু বাস্তবতা মোটেও তেমন নয়।
গবেষকরা এখন বলছেন, আমরা আসলে প্রশ্নটাই ভুল করছি। আসল বিষয় কোনটা ভালো তা নয়, বরং আসল বিষয় হলো কোনো একটা অবস্থানে আপনি ঠিক কতক্ষণ স্থির হয়ে আছেন। দীর্ঘ সময় বসে থাকলে যেমন ঘাড়, কাঁধ ও কোমরের ওপর প্রভাব ফেলে, তেমনি একটানা দাঁড়িয়ে থাকলেও রক্তচাপের হেরফের থেকে শুরু করে পা এবং শিরদাঁড়ায় প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। তাই সমাধান বসা বা দাঁড়ানোর মধ্যে নেই, আছে নিরবচ্ছিন্ন গতি আর শরীরের সহজাত নমনীয়তার মধ্যে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সায়েন্স অ্যালার্টের সাম্প্রতিক এক গবেষণার প্রতিবেদন নিয়ে এ ফিচারটি তৈরি হয়েছে। এই বিশেষ বিশ্লেষণধর্মী ফিচারটি যৌথভাবে তৈরি করেছেন স্পেনের সান জোর্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওথেরাপি বিভাগের অধ্যাপক আলেজান্দ্রো জে আলমেনার আরাসাঞ্জ এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক মার্তা দিয়ার্তে অলিভা।
মূলত সায়েন্স অ্যালার্টে প্রকাশিত তাদের গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতেই এ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
স্থিরতা যখন শরীরের শত্রু
কোনো এক জায়গায় মূর্তির মতো স্থির হয়ে থাকার জন্য আমাদের শরীর তৈরি হয়নি। ইউরোপের দেশগুলোতে কর্মক্ষেত্রে অসুস্থতার সবচেয়ে বড় কারণ হলো পেশি ও হাড়ের জটিলতা। উদাহরণ হিসেবে স্পেনের কথা বলা যায়। সেখানে ২০২৪ সালে কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ৭৯ শতাংশই হাড় ও পেশির সমস্যায় ভুগছিলেন। যারা সারাদিন দাঁড়িয়ে কাজ করেন, যেমন শিক্ষক, বিক্রয়কর্মী বা কারখানার শ্রমিক- তাদের ক্লান্তি আর পায়ের পাতার ব্যথা এক সময় সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
বসা আর দাঁড়ানোর মধ্যে লড়াই বাঁধিয়ে আসলে কোনো লাভ নেই, কারণ দু’টোই যদি মাত্রাতিরিক্ত হয়, তবে শরীরের জন্য তা সমান ক্ষতিকর। শরীর চায় একটু নড়াচড়া, একটুখানি অবস্থানের পরিবর্তন।
পায়ের পাতার ওপর চাপ
যখনই কাজের চাপে পিঠ বা কোমর ব্যথা করে, আমরা কেবল মেরুদণ্ড নিয়েই ভাবি। অথচ শরীরের আসল ভারটা বহন করে ওই দু‘টি পায়ের পাতা। পা হলো আমাদের শরীরের মেকানিক্যাল ফাউন্ডেশন বা যান্ত্রিক ভিত্তি। এই ভিত্তি যদি সারাদিন বিরামহীন চাপ সহ্য করে, তবে তার প্রভাব গোড়ালি, হাঁটু ও কোমর হয়ে একদম মগজ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে।
অ্যাসেম্বলি লাইনের শ্রমিকদের ওপর চালানো এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকলে কেবল যে পা ব্যথা হয় তা নয়, বরং মানুষের দাঁড়ানোর ভঙ্গি পর্যন্ত বদলে যায়। আর এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলোই পরে দীর্ঘমেয়াদী যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
যান্ত্রিক সমাধান বনাম জীবনধারা
আজকাল বাজারে উচ্চতা পরিবর্তন করা যায় এমন ডেস্ক, দামি এরগনোমিক চেয়ার কিংবা বিশেষ জুতা পাওয়া যায়। প্রযুক্তির এই দুনিয়ায় আমরা মনে করি, গ্যাজেট কিনলেই হয়তো স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে। কিছু ক্ষেত্রে এগুলো সাহায্য করলেও কোনো যন্ত্রই আপনার অলস কর্মদিবসের ক্ষতিপূরণ দিতে পারবে না।
গবেষকরা জোর দিয়ে বলছেন, সমাধানটা আসলে খুব সাধারণ কিছু অভ্যাসের মধ্যে লুকিয়ে আছে। কাজের মাঝে ছোট ছোট বিরতি নেয়া, মাঝেমধ্যে একটু হেঁটে আসা, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করা এবং জুতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সচেতন হওয়া।
পরিশেষে বলা যায়, চেয়ারকে ভিলেন বানানোর যেমন দরকার নেই, তেমনি সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকাকে মহৌষধ ভাবারও কোনো কারণ নেই। কবি ইকবালের সেই বিখ্যাত দর্শনের কথাটি এখানে এক নতুন অর্থ খুঁজে পেয়েছে।
ইকবাল তার ফার্সি কবিতায় বলেছিলেন, মারা আস্ত পরওয়াজ দর জিন্দেগী, সুকুনত বুয়ুদ মার্গ দর জিন্দেগী। অর্থাৎ, ‘গতিতেই আমার জীবনের সার্থকতা; জীবনের মাঝে স্থিরতা মানেই তো মৃত্যু।’
আমাদের শরীরও আসলে এমন এক অভিযোজনক্ষম যন্ত্র, যা কেবল নড়াচড়া আর গতির মাঝেই প্রাণবন্ত থাকে। তাই নিজেকে কোনো একটি অবস্থানে বন্দী না রেখে শরীরকে একটু মুক্তি দিন। মনে রাখবেন, যেখানেই দীর্ঘস্থায়ী জড়তা বা স্থিরতা, সেখানেই অসুস্থতার শুরু। কোনো নির্দিষ্ট অবস্থানে আষ্টেপৃষ্ঠে আটকে না থেকে বরং কাজের ধরন অনুযায়ী শরীরকে খাপ খাইয়ে নিতে শেখাই হলো আসল বিচক্ষণতা।