২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার আগেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে দুই দফা। মাত্র কয়েক দিন আগে বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। এর প্রভাবে জিনিসপত্রের দাম হু-হু করে বাড়তে শুরু করেছে। আবার নতুন বাজেটে রাজস্ব আদায় বাড়াতে কর ও ভ্যাটের আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে করে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে আরেক দফা।
অন্যদিকে নির্বাচনি ইশতেহারের অংশ হিসেবে ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এ খাতকে বহুমুখীকরণ করা হবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে এনে ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে সৃজনশীল অর্থনীতি ও ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে কর্মসৃজনের কথা ভাবছে সরকার। এজন্য সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে প্রান্তিক পর্যায়ে টাকার প্রবাহ বাড়ানো হবে। যার অংশ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ বছরের বাজেটে ১২ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা ও কৃষক কার্ডের জন্য ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। ব্লু ইকোনমি বিকাশের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হবে। বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে ব্যবসা-বিনিয়োগে বিভিন্ন রকমের কর ছাড় ও সুযোগসুবিধা বাড়ানো হবে। সরকারের ভিতরে তীব্র আর্থিক টানাপোড়েন ও বৈশ্¦িক সংকট সত্ত্বেও ব্যয়ের বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে রেকর্ড পরিমাণ। সরকারের পরিচালন ব্যয়ও বাড়ছে। সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের জন্যও অর্থ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। জানা গেছে, ক্ষমতাসীন বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী শিক্ষা, কৃষি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনা প্রায় চূড়ান্ত করেছে অর্থ বিভাগ। বাজেট পরিকল্পনায় দেশের অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এক বছরে অন্তত ১০ লাখ মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে তারেক রহমান দেশে ফেরার সময় সবচেয়ে বেশি প্রচার পায় ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান। এই দর্শন স্থান পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম বাজেট প্রস্তাবনাতেও। এজন্য দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তুলতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ও নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করেছেন আসছে বাজেটে। কর্মসংস্থানে বৈচিত্র্য আনতে উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ নামক নতুন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের জন্য ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল বরাদ্দ করা হবে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল আকারের এই বাজেট কাল ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শন সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মানবসম্পদ উন্নয়নকেন্দ্রিক উচ্চাভিলাষী বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা ও উদ্যোক্তা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রস্তাবিত এই বাজেটে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা গঠনের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
সরকারের মতে, আধুনিক, জ্ঞানভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই বাজেটে ভৌত অবকাঠামো নয়, সবচেয়ে বেশি অর্থ মানবসম্পদ উন্নয়নে জোর দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর পেছনে সবচেয়ে যুক্তি হলো সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার এবং আগামী দিনে অর্থনীতির চাহিদা পূরণ। এর অংশ হিসেবে দক্ষতাসম্পন্ন ১০ লাখ মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ সব মিলিয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২ শতাংশ। এর আগের বছর ছিল ৯৭ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৬১ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যা জিডিপির ১.০১ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরে ছিল ৩৪ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির ০.৫৭ শতাংশ। স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, ওষুধ ও টিকা সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, জরুরি চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ এবং ১৪ জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ রয়েছে।
বেকারত্ব কমানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শূন্যপদ দ্রুত পূরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ কার্যক্রম জোরদার করতে ২১ লাখ প্রবাসী কার্ড বিতরণ এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মসংস্থান তথ্যকেন্দ্র চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে বিশেষ আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে ২ হাজার কোটি টাকার সহায়তা তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য ১২ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা এবং কৃষক কার্ড কর্মসূচির জন্য ১ হাজার ৬৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী, ক্রীড়া উন্নয়ন এবং নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণেও বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অবকাঠামো উন্নয়নেও বড় ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩৫ হাজার ১৯০ কোটি টাকা, পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ৬১ হাজার ১৩২ কোটি টাকা এবং কৃষি খাতে ৪৩ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, ব্লু ইকোনমি এবং স্টার্টআপ খাতের জন্য পৃথক বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ২০ বছর পর এটা বিএনপির প্রথম বাজেট। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানেরও প্রথম বাজেট। অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের সঙ্গে রয়েছে বৈশ্বিক অচলাবস্থা। জ্বালানির সংকট তো ভোগাচ্ছেই। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ডলারসংকট কিছুটা কমেছে। ফলে এত কিছুর মাঝে ভারসাম্য রেখে একটি কল্যাণমুখী বাজেট দেওয়া অত্যন্ত কঠিন বিষয়। এখানে ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বিপর্যস্ত স্বাস্থ্য খাত, বিনিয়োগ, ব্যবসা গুরুত্ব পেতে হবে। তবে বিএনপি হয়তো তাদের নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নকেই বেশি গুরুত্ব দেবে বলে মনে করেন তিনি।