সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য শিশির মনির শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে হওয়া গণভোট নিয়ে বলেছেন, ৩০ মে ১৯৭৭ সালে গণভোট হয়। গণভোটের প্রশ্ন কী? প্রশ্নটা হলো রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং তার নীতি ও কর্মপন্থার প্রতি আপনার আস্থা আছে কি? হ্যাঁ অথবা না বলুন। ৮৮% লোক হ্যাঁ বলেছে।
সুপ্রিম কোর্টের এ আইনজীবী বলেন, কয়টা নীতি? এখন তো চার প্রশ্নে তিন ঘণ্টা লাগে। তখন নীতি পড়তে কত সময় লাগতো? একজন রাষ্ট্রপতির নীতি পর্যায়ে কারবারটা দেখেন। একজন রাষ্ট্রপতির নীতি কতগুলো? কী নীতি? কোন নীতি- কেউ জানে না তো। কেউ বলে ১৯ দফা। এর বাইরেও আরও অনেক কিছু আছে। আর এখন আমার সালাহউদ্দিন (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ) ভাইয়ের চারটা মাত্র প্রশ্ন।
‘ছাত্র অবস্থায় মনে হয় ভালো ছাত্র ছিলেন না সালাহউদ্দিন ভাই’- এমন মন্তব্য করে শিশির মনির বলেন, ‘আমরা তো ভালো ছাত্র ছিলাম সবসময়। আমাদের চার প্রশ্ন পড়তে আমার ধারণা ব্যারিস্টার ফুয়াদ, আমি, তুষার আমরা যারা আছি আমাদের চার প্রশ্ন পড়তে দুই মিনিটের বেশি লাগবে না। কিন্তু আমার ভাইয়ের (সালাহউদ্দিন) চার প্রশ্ন পড়তে তিন ঘণ্টা সময় লেগেছে, আমার মনে হয় আবার লেখাপড়া শুরু করা দরকার তার। তখন কি সংবিধানে গণভোট ছিল? আরে এরা এসে আমাদেরকে সবক দিচ্ছে সংবিধানে নাই। তো তখন কি ছিল, সংবিধানে গণভোট ছিল নাকি?’
জামায়াতের এ নেতা বলেন, ‘সংবিধানে গণভোট এসেছে ১৯৭৮ সালে। তাও মার্শাল ল প্রক্লেমেশনের মাধ্যমে। মার্শাল ল জারি করে সংবিধান কেটে, ছিঁড়ে, পোস্টমর্টেম করে, সিজার চালিয়ে পছন্দমতো ডানে-বামে নিয়ে এখন আমাদেরকে এসে সবক শোনাচ্ছেন। কোনটা সাংবিধানিক আর কোনটা অসাংবিধানিক? এদের মুখে এগুলো মানায় না। এরা কেন এগুলো বলবে?’
শিশির মনির বলেন, উনারা এসে আমাদেরকে এখন সংবিধান শিখাচ্ছে ১৩৩টি অধ্যাদেশ পড়ে। এত রক্তক্ষরণ হচ্ছে, প্রতিদিনকে মনে হয় একটা বছর, রাতে ঘুমানো যায় না।
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন পাম্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, গাড়ির সারি মন্ত্রী কি দেখতে পাচ্ছেন না?

‘এটাকে দুঃস্বপ্ন’ উল্লেখ করে শিশির মনির বলেন, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের আইনকে রিপিল করে দিচ্ছে। গুম প্রতিরোধ প্রতিকার অধ্যাদেশকে রিপিল করে দিচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশকে রিপিল করে দিচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট থেকে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয়ের সামনে সরকার ইচ্ছা পোষণ করিলে শব্দযোগ করে দিচ্ছে। ব্যাংক রেজলিউশন অর্ডিন্যান্স বাদ করে দিচ্ছে।’
এগুলোকে ‘ট্রমাটিক’ আখ্যা দিয়ে শিশির মনির বলেন, ‘দুর্নীতি দমন কমিশনের সংশোধনীয় অধ্যাদেশ ২০২৫ যার মাধ্যমে সার্চ কমিটি করে দুর্নীতি দমন কমিশনের মহাপরিচালক নিয়োগ দিতে হবে। এই মর্মে যে বিধানটা বাদ করে দিচ্ছে। আশ্চর্য! তাহলে আপনি পুরোটাকে একসঙ্গে দাঁড় করান। এগুলো সব বাদ দিলে কী হয়, কারণ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানকে পাওয়ার দেওয়া হচ্ছে, তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গুমের তদন্ত করতে পারবে। কারণ দেখে আমি হাসলাম, ডানদিকে দিয়েছে গুম নামক অপরাধটার সঙ্গে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংবেদনশীল ব্যক্তিবর্গ জড়িত থাকে মর্মে এই আইনটিকে ল্যাপ্স করে দেওয়া দরকার। তাহলে আর একটা আয়নাঘর হবে।’
শিশির মনির আরও বলেন, ‘নোটে লিখেছে পাশে- জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রধান যিনি থাকবেন তাকে সরাতে হলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সিস্টেম অনুযায়ী সরাতে হবে, কাউকে হায়ার (নিয়োগ), কাউকে ফায়ার (বরখাস্ত) করা যাবে না। এই বিধান যদি থাকে তাহলে সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না, এইজন্য আইন বাতিল।’
সুপ্রিম কোর্টের এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, ‘দুর্নীতি দমন কমিশন বাতিল, মানবাধিকার কমিশন বাতিল, গুম কমিশন বাতিল, গুম প্রতিকার প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বাতিল, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ আন্ডার সাবসারভিয়েন্ট, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ নাই। আছে কি, তাহলে সমস্যাটা হলো শুধুমাত্র সংবিধানের ভেতরে আছে কি না, সমস্যা এই জায়গায় না- সমস্যা হলো যে কাজগুলো করা হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য, তারা ক্ষমতার ভারসাম্যটা বজায় রাখতে চান না। তারা এটাকে এবসলিউটলি এক্সারসাইজ করতে চান, যা খুবই কষ্টদায়ক। আমাদের জন্য ট্রমাটিক। আমরা যারা সময় দিয়েছি, কাজ করেছি এই সমস্ত অর্ডিন্যান্সগুলোর সঙ্গে, দেখেন এই অর্ডিন্যান্স যখন হয়, আমার মনে আছে, ল মিনিস্ট্রি প্রতিটা অর্ডিন্যান্স ফ্রেম করার আগে তিন-চারটা ওয়ার্কশপের আয়োজন হতো।’
শিশির মনির বলেন, ‘আমরা অনেকেই অংশগ্রহণ করেছি এগুলোতে। এখনকার যিনি আইনমন্ত্রী তিনিও অংশগ্রহণ করেছিলেন। আজকে বেমালুম সব ভুলে গিয়েছেন। তো আমার কথাটা হলো এটাই। আমার মনে হয় স্বপ্নটা নষ্ট হচ্ছে। আশাটা বিনষ্ট হচ্ছে। হতাশা গ্রো করছে।’
‘তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কনফিউশন তৈরি হচ্ছে’ মন্তব্য করে শিশির মনির বলেন, ‘এই কনফিউশনটা কী আকারে আবার রাজনীতিতে হাজির হবে, এটা এখনই বলার সময় হয় নাই। কিন্তু আমি খুবই উদ্বিগ্ন। এমন রাজনৈতিক ভাবনা যদি কোনো নেতাদের থাকে, তাহলে এই নেতৃত্ব সম্পর্কে আমাদের আস্থা থাকবে না। অনেক যুক্তি দিতে পারবেন কিন্তু আপনারা যে সত্য বলছেন না, এটা তো আমরা টের পাই। এই যে টের পাই তাতে আপনাদের সম্পর্কে আবার সেই ট্রল হয় ফেসবুকে।’
‘গণঅভ্যুত্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে’ আশঙ্কা প্রকাশ করে শিশির মনির বলেন, ‘আপনাদের চরিত্র যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে আল্টিমেটলি গণঅভ্যুত্থান নিয়ে প্রশ্ন হবে। আমরা তো সবাই একসঙ্গে ছিলাম কম- বেশি। অভ্যুত্থানের আইকনিক নেতৃত্বকে যদি ধরে ধরে ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেট করার মতো কর্মকাণ্ড করে, তাহলে মূলত অভ্যুত্থানটা একটা বড় ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হবে দিনের পর দিন।’
বক্তব্যের শেষে শিশির মনির বলেন, এখন অভ্যুত্থানের ছাত্র নেতৃবৃন্দ যারা ছিলেন, তাদের যদি কোনো কারণে ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেট করা হয় লাভ কার, বিএনপির নেতাদের ক্যারেক্টার যদি অ্যাসাসিনেট করা হয় লাভ কার, জামায়াত নেতাদের ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেট করা হলে লাভ হবে কার? অন্যান্য যারা ভূমিকা রেখেছেন তাদের ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেট করলে লাভ হবে কার? ফলে আমার মনে হয় এগুলো দেখা উচিত। নিজের চেহারার দিকে তাকিয়ে নিজের ব্যক্তিত্বকে সংরক্ষণ করা দরকার। আর দ্বিচারিতার দিকে যাওয়া উচিত না। তাহলে অসম্মান সবার হবে। পরিণতি সবার একই রকম।’