ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকারের প্রথম ও দেশের ইতিহাসে বৃহত্তম ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। প্রায় একমাস ধরে চলা সংসদের বাজেট অধিবেশনে সরকারি ও বিরোধিদলীয় সদস্যদের গঠনমূলক আলোচনা ও বির্তক শেষে গত ৩০ জুন বাজেট পাস হয়। শুধুমাত্র বাজেটের আকার দিয়ে একটি বাজেটের গুনাগুণ বিচার্য নয়। বিগত স্বৈরাচারি আমলে প্রতিবছরই আগের বছরের চেয়ে বড় বাজেট বরাদ্দ দেখিয়ে উন্নয়নের ন্যারেটিভ প্রচার করতে দেখা গেছে। তবে বছরের ৯-১০ মাসেও অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেটের অর্ধেকও বাস্তবায়ন না করতে পারার বাস্তবতা সামনে রেখে শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে যেনতেন প্রকারে অবশিষ্ট বাজেট বাস্তবায়নের নামে অবকাঠামো উন্নয়নের বরাদ্দ হরিলুটের আয়োজন আমরা দেখেছি। এভাবেই একেকটি ঘাটতি বাজেট নিয়ে দেশি-বিদেশি ব্যাংকিং সেক্টর, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বাজেট বাস্তবায়নের নামে দেশের উপর হাজার হাজার কোটি ডলারের ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এই মূহূর্তে দেশের নাগরিকদের মাথাপিছু ঋণের আকার ১ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা। এবারের জাতীয় বাজেটে জনপ্রতি বরাদ্দ প্রায় ৫৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ মাথাপিছু বরাদ্দের চেয়ে ঋণের পরিমান প্রায় আড়াইগুণ। তবে গত ১৭ বছরে দেশ থেকে অর্থ পাচারের অঙ্ক সরকারের দেশি- বিদেশি ঋণের চেয়ে বেশি। গত এক দশক ধরে জাতীয় বাজেটে এককভাবে দ্বিতীয় বৃহত্তম অংশ ঋণের সুদ পরিশোধের খাতে ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। ঘাটতি এবং এ ধরণের সুদের ভারবহুল বাজেট থেকে আত্মনির্ভরশীল ও উন্নয়নমুখী বাজেটে পদার্পণই তারেক রহমানের সরকার প্রথম জাতীয় বাজেটের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
ঋণ নির্ভর অর্থনীতিকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলার জন্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ব্যাপক উদ্যোগ ও কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। পতিত স্বৈরাচারের দেড় দশক ধরে চলা বল্গাহীন দুর্নীতি, অর্থনৈতিক লুটপাট ও অর্থপাচারের ধারাবাহিকতা থেকে জাতীয় বাজেটকে সত্যিকার অর্থে গতিশীল উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানমুখী করে তোলাই এই বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আরো এক ধাপ এগিয়ে এই জাতীয় বাজেটকে কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠণের লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অতীতের যে কোনো বাজেটের চেয়ে বেশি বরাদ্দের মাধ্যমে তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যের সারবত্তা প্রমাণ করেছেন। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সঠিকভাবে বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা অর্জন করা এবং বাজেটের প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের উৎস হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে অতীতের ব্যর্থতা-অক্ষমতা থেকে বের করে আনার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। বাজেটের আকার বড় হলেও রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষেত্রে নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব ব্যাপার নয়। আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় নানামুখী অসঙ্গতি ও ঘাটতি ও অব্যবস্থাপনার যে বিষয়গুলো বিদ্যমান তা দূর করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও যৌক্তিকভাবে এর পরিধি বাড়িয়ে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো যেতে পারে। কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠন করতে হলে ধনী ব্যবসায়ী ও কর্পোরেট কর বাড়িয়ে গরিব ও নি¤œবিত্ত মানুষের উপর থেকে করের বোঝা কমিয়ে আনার বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নিতে হবে।
অর্থবছরের শুরুতেই জাতীয় বাজেটের অগ্রাধিকারভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোর ত্বরিৎ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। রাজস্বখাতের জনবল, শিক্ষাখাতে বিদ্যমান সমস্যা, আমলাতান্ত্রিক অব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন বাজেট ব্যয়ের ক্ষেত্রে দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা ও সময়ক্ষেপনের প্রবণতা রোধ করতে শুরুতেই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। আগামী দশকের শুরুতে দেশকে একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিনত করার লক্ষ্য গ্রহণ করেছে সরকার। এ ক্ষেত্রে দেশে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, রফতানি বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ও বহুমুখীকরণের পাশাপাশি বিশ্ববাজারে দক্ষ জনশক্তি নিয়োগের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর দিকে বাড়তি নজর দিতে হবে। বিগত প্রায় দুই দশক ধরে দেশে কাঙ্খিত বিনিয়োগ হয়নি। এ জন্য দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক দৌরাত্ম্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অনিশ্চয়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রস্তাবসমুহ বাস্তবায়নে সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করা যায়। পরিবর্তিত আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত নতুন সরকারের অগ্রসর ধ্যান-ধারণা এবং বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরকার ও বিরোধীদলের চমৎকার বোঝাপড়া ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ জাতিকে আশা জাগাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্কন্নোয়ন , তিস্তা মহাপরিকল্পনার মত গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্পে অংশীদারিত্ব এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে যে ইতিবাচক সমঝোতা দেখা গেছে, তার বাস্তবায়ন নিশ্চিতে সরকারকে নিরলস প্রয়াস চালাতে হবে। গত সাড়ে চারমাসে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধনে তেমন কোনো সাফল্য দেখাতে না পারলেও তারেক রহমান প্রমাণ করেছেন, তিনি ক্ষমতার ভরকেন্দ্র ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে গতানুগতিক আমলাতান্ত্রিক ধারা থেকে বের করে আনতে চান। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি এবং কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা বাস্তবায়নে সরকারের প্রথম বাজেট একটি এসিড টেস্ট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে বাজেট বাস্তবায়ন ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্দেশনা ও কর্মপন্থা গ্রহণ করা জরুরি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে এই সরকারের প্রথম বাজেট বাস্তবায়নে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতে পারে।