ইংরেজি দৈনিক নিউএজ-এ রাজধানীর বাংলামোটর থেকে তোলা একটি ছবি গতকাল প্রকাশিত হয়েছে। ছবিটি একটি তারের জঞ্জালের। রাস্তার পাশে উচুতে ভবনের গা-ঘেঁষে এ জঞ্জাল ঝুলে আছে। না, শুধু বাংলামোটর এলাকাতেই নয়, রাজধানীর প্রায় সর্বত্র রাস্তার দু’পাশে এরকম তারের জঞ্জাল লক্ষ্য করা যায়। বিদ্যুতের তারের সঙ্গে স্যাটেলাইট টিভি ক্যাবল, ইন্টারনেট ক্যাবল প্রভৃতি একজোট হয়ে অবস্থান করছে। বিশ্বের কোনো সভ্য দেশে এ ধরনের দৃশ্য দেখা যায় না। বিশ্রী বা দৃষ্টিকটুই নয়, তারের এই জঞ্জাল নিশ্চিত দুর্ঘনারও কারণ হতে পারে যে কোনো সময়। সাধারণত বিদ্যুতের খুঁটিতে তারগুলো ঝুলে থাকে। ভবনগামী এসব তারের ভারও নিত্যন্ত কম নয়। বাতাসে বা ঝড়-বৃষ্টিতে যে কোনো সময় তার ছিড়ে রাস্তায় পড়ে যেতে পারে। স্যাটলাইট টিভি ক্যাবল কিংবা ইন্টারনেট ক্যাবল হলে বিপদের আশংকা নেই। কিন্তু বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়লে বিপদের সমূহ আংশকা থাকে। বিদ্যুতের ছেঁড়া তারের স্পর্শে তড়িতাহত বা আখেরে মৃত্যু হওয়া অবধারিত। বিশেষ করে ঝড়-বৃষ্টিতে বিদ্যুতের তার রাস্তায় জমে থাকা পানির মধ্যে পড়ে, যা দেখা যায় না। এই অজানা-অদেখা তারের স্পর্শে প্রতিবছর অনেক মানুষের মৃত্যু হয়। ঝুলন্ত তারের জঞ্জল শুধু শহরের সৌন্দর্যই বিনষ্ট করে না, একই সঙ্গে এ ধরনের দুঘর্টনার জন্ম দেয় বলে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে তো বটেই, তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেও রাস্তার দু’পাশে ঝুলন্ত তারের জঞ্জাল দেখা যায় না। ওইসব দেশে মাটির নিচ দিয়ে তারের লাইন স্থাপন করা হয়েছে, স্যুয়ারেজ লাইন ও পানির লাইনের মতো। নিরাপদ তার ব্যবস্থাপনার এই নীতি-পদ্ধতি আমাদের দেশেও অনুসরণ করার তাকিদ অনুভূত হয়েছে অনেক আগেই। সিদ্ধান্তও হয়েছে বিদ্যুৎসহ যাবতীয় তার মাটির নিচ দিয়ে টানার। উদ্যেগ নেয়া হয়েছে, আল্টিমেটাম পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে; কিন্তু আজ পর্যন্ত রাজধানী থেকে তারের জঞ্জাল সরেনি। পতিত স্বৈরাচারের আমলে এ ব্যাপারে তেমন গরজ দেখানো হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারও উদ্যেগ নেয়নি।
জানা যায়, তারের লাইন মাটির নিচ দিয়ে টানার ব্যাপারে স্যাটেলাইট টিভির ক্যাবল লাইন ও ইন্টারনেট ক্যাবল লাইন প্রদানকারী ব্যবসায়ীরাই প্রধান বাধা হিসাবে কাজ করেছে। প্রায় বিনা পুঁজির এই ব্যবসাটি ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরাই সাধারনত করে থাকে। দলও তার নেতা-কর্মীদের এ সুযোগ দিয়ে পৃষ্টপোষকতা করে। তারের লাইন মাটির নিচে দিয়ে টানা খরচসাপেক্ষ ব্যাপার। এজন্য বিনিয়োগের প্রয়োজন। এই বিনিয়োগটি ক্যাবল লাইন ব্যবসায়ীরা করতে রাজি নয়। তারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কাজটি ঠেকিয়ে রাখার নীতি অবলম্বন করে যাচ্ছে। সরকারও কাজের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব এড়িয়ে যাওয়ার নীতি অনুসরণ করছে। বিদ্যুতের খাম্বা ও তারের সাথে অন্যান্য ক্যাবল ঝুলিয়ে দিলেই যখন চলে, তখন কে আর মাটির নিচ দিয়ে লাইন টানতে বাড়তি টাকা খরচ করবে? ক্যাবল লাইনের ব্যবসা পতিত স্বৈরাচারের আমলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাই একচেটিয়াভাবে করেছে। তারা পূর্ববর্তীদের কাছ থেকে ব্যবসা দখল করে নিয়েছে। এই দখল নিয়ে খুনোখুনি পর্যন্ত হয়েছে। নিজেদের মধ্যেও খুনোখুনি হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার উৎখাত হয়ে পালিয়ে গেলে স্বভাবই ক্যাবল লাইনের ব্যবসায়ীরা বিপাকে পতিত হয়। শোনা যায়, তারা অনেকে পালিয়ে যায়, আত্মগোপন করে কিংবা স্বেচ্ছায় ব্যবসা অন্যের কাছে হস্তান্তর করে। এখন ব্যবসা কাদের হাতে, কীভাবে চলছে, বলা মুশকিল। পর্যবেক্ষকদের মতে, আগের ব্যবসায়ীদের অনেকে ফিরে এসেছে। অনেকে ‘ম্যানেজ’ করে নিয়েছে। অনেকে ব্যবসা ভাগাভাগী করে নিয়েছে। যাই হোক, ক্যাবল লাইনের ব্যবসা এখন স্থিতিশীল বা স্থিতিস্থাপক অবস্থায় আছে। এখনকার ব্যবসায়ীদের সাথে বর্তমান সরকারের সম্পর্ক কেমন, আমাদের জানা নেই। সম্পর্ক যে ধরনেরই হোক, রাজধানীর মানুষ আশা করে, অবিলম্বে সরকার তারের জঞ্জাল অপসারণ করুক।
সরকার রাজধানীকে দৃষ্টিনন্দন ও সৌন্দর্যময় করার ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ। রাজধানীর যানজট নিরসন, যাতায়াত সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করার জন্য ইতোমধ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ ও প্রকল্পের কথা সরকারের তরফে জানানো হয়েছে। ময়লা-আবর্জনা দ্রুত ও নিয়মিত পরিষ্কার, বিভিন্ন দূষণ প্রতিরোধ, দেয়াল লিখন বন্ধ, পোস্টার-ব্যানার লাগানোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ, মশা নিধন ও দমন ইত্যাদি ক্ষেত্রে সরকারের দৃঢ উগ্যোগ ও পদক্ষেপ নগরবাসীর প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে। সরকার এদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেবে বলে আমরা আশা করি। ওপরে বিপজ্জনক তারের জঞ্জাল, নিচে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, অস্বাস্থ্যকর পরিবশ, অস্বাভাবিক যানজট, পানিজট ইত্যাদি কোনো রাজধানীরই চিত্র হতে পারেনা। রাজধানী ঢাকার বসবাসযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ ও প্রশ্নের অবধি নেই। বলা হয়ে থাকে, রাজধানী হলো একটি দেশের মুখ। রাজধানী দেখেই সেই দেশকে দেখা যায়, চেনা যায়, উপলব্ধি করা যায়। সেই রাজধানী যদি মলিন হয়, বিশ্রী হয়, আকর্ষণহীন হয়, তবে সেই দেশের প্রতি আগ্রহ ও আকর্ষণ কোনো দেশি-বিদেশিরই থাকতে পারে না। আমাদের রাজধানীর ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। দেশের মানুষের জন্যও এটা লজ্জার বিষয়। বাস্তবতার এই প্রেক্ষাপটে আমরা আশা করতে চাই, রাজধানী ঢাকাকে সৌন্দর্যময় ও বসবাসযোগ্য করতে সরকার একটা সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করবে এবং দ্রুত তার বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে। আমরা সঙ্গতকারণে এও আশা করবো, রাজধানী থেকে তারের জঞ্জাল দূর করার পাশাপাশি মাটির নিচ দিয়ে তারের লাইন স্থাপনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।