দৈনিক ইনকিলাব ডিজিটাল স্টুডিওর বিশেষ রাজনৈতিক আলাপে অতিথি হিসেবে অংশ নিয়ে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন গ্ল্যামার পেরিয়ে রাজনীতিতে আসা আলোচিত ও সমালোচিত ব্যক্তিত্ব মেঘনা আলম। সাবেক এই বিউটি কুইন ও বিএনপির অংগ সংগঠনের নেত্রী তাঁর রাজনীতিতে আসার পেছনের গল্প, সাম্প্রতিক নির্বাচনের অভিজ্ঞতা এবং দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নেন দৈনিক ইনকিলাবের নিউজ এডিটর (মাল্টিমিডিয়া) তানভীর খন্দকার।

মেঘনা আলম তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকে এক শব্দে ‘বাংলাদেশ পন্থী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি মনে করেন, দেশে ডান-বাম, ধর্ম বা বর্ণের যে পার্থক্যই থাকুক না কেন, দেশের সীমানার ভেতরে যারা মাটির সাথে সম্পৃক্ত, তারা সবাই বাংলাদেশী। তিনি রাজনীতিতে মাইনরিটি বা মেজরিটি (সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগরিষ্ঠ) শব্দগুলোর ব্যবহারের তীব্র বিরোধিতা করেন। শৈশব থেকে বিশ্বজুড়ে মানুষের সাথে মেশার অভিজ্ঞতার আলোকেই তাঁর এই চিন্তাভাবনার উদয় বলে জানান তিনি।

আলোচিত ও সমালোচিত এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জানান, দেশের বাইরে তিনি এক ধরণের সুপ্ত বর্ণবাদের  মুখোমুখি হয়েছেন। অনেক সময় তাঁর নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা, সৌন্দর্য বা বাচনভঙ্গির কারণে মানুষ আকৃষ্ট হলেও, যখনই তারা জানত তিনি একজন বাংলাদেশী, তখনই তাদের সেই আগ্রহ বা আকর্ষণ হঠাৎ শিথিল হয়ে যেত। বিদেশে অন্য দেশের মানুষেরা বাংলাদেশীদের সাথে হয়তো মেশে, কিন্তু সত্যিকারের বন্ধু ভাবেনা। ইমিগ্রেশন থেকে শুরু করে সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশী ভাইবোনদের আটকে দেওয়া এবং নার্ভাস ফিল করানোর চেষ্টা করা হয়। এই বৈষম্য তাঁর আত্মসম্মানে আঘাত হানে এবং সেখান থেকে তিনি জাতীয়ভাবে দেশের মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনীতিতে আসার অনুপ্রেরণা পান।

নিজের আত্মসম্মানে লাগা সেই আঘাতের কথা মনে করিয়ে দিয়ে মেঘনা আলম বলেন, "যেই মোমেন্টে তারা শুনছে আমার পরিচয় হচ্ছে আমি বাংলাদেশী, এই যে আমার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করাটা এটা হঠাৎ করে শিথিল হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি আমাদের যে জিনিসটার অভাব আমার কাছে মনে হয়, সেটা হচ্ছে আমাদের আত্মসম্মান। এই আত্মসম্মানের জায়গাটায় লাগছে। সো ওই আত্মসম্মানটা এখন আমার মনে হয় যে জাতীয়ভাবে দেশের স্বার্থ নিয়ে আমাকে কাজ করতে হবে; আমার দেশ নিয়ে যেন কেউ আমাকে ছোট করতে না পারে।"

সাক্ষাৎকারে দেশের শিক্ষা ও সামাজিক খাতের ত্রুটিগুলো তুলে ধরে মেঘনা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি মাস্টার্স ডিগ্রিধারী বাংলাদেশে থাকার পরেও কেন সমাজে এত অবক্ষয়, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘সাউথ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাস্টার্স ডিগ্রি হোল্ড করে বাংলাদেশ। কিন্তু সেই দেশে আসলে আপনি দেখেন রাস্তাটা নোংরা, সেই দেশে আপনি দেখেন ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হয়ে যায়, সেতু থেকে ওই যে রিং চুরি হয়ে যাচ্ছে। ...রাজনৈতিক পালাবদল হলেই আমরা দেখি যে বিনা বিচারে নানা রকম হচ্ছে উদ্ভট মামলা দিয়ে একদল আরেক দলের লোককে আটকে রাখছে, আবার যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা ফেরত পাচ্ছে তারা আবার তখন তারা এসে প্রতিশোধ নিচ্ছে—মানে এই যে নিচু মন-মানসিকতা, তাহলে এত উচ্চশিক্ষিত মানুষদের মধ্যে এগুলো কিভাবে আছে? তার মানে শিক্ষাটা আসলে প্রকৃত শিক্ষা হচ্ছে না।’’

তিনি জানান, গণঅধিকার পরিষদ থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কারণ শুধু দুর্নীতি উৎখাত নয়, বরং দেশকে মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত করা। তিনি নারী হিসেবে এবং একজন নাগরিক হিসেবে নিজের স্বার্থেই কাজ করতে চান। তাঁর মতে, তিনি এমন এক বাংলাদেশে বাঁচতে চান যেখানে বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার মতো পরিষ্কার বাতাস থাকবে এবং দূষণমুক্ত পানি পাওয়া যাবে।

গত সংসদ নির্বাচনে বেইলি রোড ও মতিঝিল এলাকায় প্রতীকী প্রচারণায় অংশ নিয়ে মাত্র ৬০৮টি ভোট পেয়েছিলেন মেঘনা। তাঁর জামানত হারানোর বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে দীর্ঘ সময় আলোচনা হওয়াকে তিনি বেশ ইতিবাচক ও কৌতুকপূর্ণভাবেই দেখছেন।

রাজনীতিতে প্রথমবারেই হোঁচট খাওয়া নতুন কিছু নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘আমার খুব মজা লেগেছে ইলেকশন শেষ হয়ে গিয়েছে, কিন্তু মাসের পর মাস মিডিয়াতে নিউজ হচ্ছে মেঘনা আলমের জামানত হারিয়েছে, মেঘনা আলম কম ভোট পেয়েছে। ...আমাদের জামাতের আমির সাহেবও জামানত হারানোর অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। আমাদের জোনায়েদ সাকি যে আছেন, বা অনেক মন্ত্রী আছেন এখন আমাদের সংসদে যারা জামানত হারিয়েছেন। আমি ভুল নাম বলেছি কিনা জানিনা, চেক করে দেখতে হবে। বাট অনেক মন্ত্রী-এমপি আছেন যাদের জামানত হারিয়েছে, এটা কোন বিষয় না।’’

সমালোচকদের জবাব দিয়ে সাবেক এই বিউটি কুইন স্পষ্ট করে জানান, আভিজাত্য বা গ্ল্যামারের লোভে তিনি রাজনীতিতে আসেননি। লাইমলাইট ও আন্তর্জাতিক মহলের আতিথেয়তা তিনি অনেক আগেই পেয়ে গেছেন। রাজনীতির পেছনের প্রকৃত কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, "অনেকে মনে করে এটা কোটি কোটি টাকার প্রাসাদ গড়ার জায়গা, দুর্নীতি না করলে এটা সেরকম জায়গা না। এখানে একটা লিমিটেড স্যালারি থাকে, লিমিটেড লাইফস্টাইল। দেখুন, আমি যে রাজনীতিটাতে এসেছি আমি কিন্তু এই লাইফটা অলরেডি লিভ করে এসেছি—গ্ল্যামার, দিস আপস্কেল লাইফস্টাইল, এটা আমার জীবনে দেখা হয়ে গেছে। আমাকে নতুন করে সম্মান দেয়া হবে, এটা আমার নতুন করে পাওয়ার কিছু নাই। আমার যেটা এখন দরকার এই সময়ে এসে, সেটা হচ্ছে সত্যিকার অর্থে রাজনীতিটাকে মানুষের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য সুন্দর মসরিন করা।"

মেঘনা আলম জানান, তাঁর রাজনৈতিক চলার পথে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা। তবে এখনো একটি শক্তিশালী ও নিঃস্বার্থ ‘বাংলাদেশ পন্থী’ জনশক্তি গুছিয়ে উঠতে না পারাটাকে নিজের একটি সীমাবদ্ধতা হিসেবেও স্বীকার করেছেন এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews