খেলাধুলা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। শরীরকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখার জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খেলাধুলা ইসলাম শুধু জায়েজই রাখেনি, উৎসাহিতও করেছে। নবীজি (সা.) নিজে শারীরিক সক্ষমতা ও আনন্দ উদ্যাপনে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি তাঁর সহধর্মিণী আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন, রুকানা নামক প্রখ্যাত কুস্তিগিরের সঙ্গে কুস্তি লড়েছেন এবং সাহাবিদের ঘোড়দৌড়, তিরন্দাজি ও সাঁতার শিখতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এসব খেলা একদিকে যেমন আনন্দ দেয়, তেমনি শরীর সুস্থ রাখতেও ভূমিকা রাখে।  তবে কোনো বিনোদন বা খেলা যখন মানুষের চিন্তা, সময়, সংস্কৃতি, আবেগ ও অগ্রাধিকারের বড় অংশ দখল করে নেয়, তখন সেটি আর নিছক বিনোদনের মাধ্যম থাকে না। বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট এমনই এক খেলা, যে খেলায় মেতে মানুষ নিজেদের ধর্মীয় দায়িত্ব, আত্মপরিচয় ও জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য ভুলে বেঘোর উন্মাদনায় মেতে ওঠে। চায়ের দোকান, রাস্তাঘাট, অফিস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-সবখানেই মানুষের প্রধান ব্যস্ততা ও আলোচনার বিষয় বিশ্বকাপ ফুটবল।

অথচ এই খেলা যেভাবে খেলা হয় এবং উপভোগ করা হয়, তা মানুষের শারীরিক কিংবা মানসিক প্রফুল্লতার জন্য ন্যূনতম উপকারী তো নয়ই; বরং অবস্থাভেদে এটি ব্যক্তি ও জাতীয় পর্যায়ে অভাবনীয় ক্ষতির কারণও হয়ে দাঁড়ায়। তদুপরি একজন মুসলমান কখনো অনর্থক কাজে নিজের মূল্যবান সময় ব্যয় করতে পারেন না। নবীজি (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য হলো অনর্থক কাজ ত্যাগ করা (তিরমিজি)। পবিত্র কোরআনেও সফল মুমিন ও যাঁরা জান্নাতের উপযুক্ত হবে তাঁদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেছেন, সফলকাম তাঁরা, যাঁরা অনর্থক কথা ও কর্ম থেকে বিরত থাকে (সুরা মুমিন)।

বিশ্বকাপ উন্মাদনা অন্তত একবার ভাবুনএ ঘোর উন্মাদনা প্রতিদিনের কাজের প্রতি মানুষকে উদাসীন করে, নীতিনৈতিকতাবিবর্জিত আচরণের প্রসার ঘটায়, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ ব্যাহত করে, আবার মানুষের মানসিক, শারীরিক, অর্থনৈতিক ও জাগতিক ক্ষতিও হয় ব্যাপক। একজন সচেতন মানুষ হিসেবে আমাদের ভাবা উচিত, এই উন্মাদনা আমাদের ব্যক্তিজীবন ও জাতীয় জীবনে কী পরিমাণ প্রভাব ফেলছে। সম্প্রতি একটি বৈশ্বিক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বকাপের এই ঘোর মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও কর্মদক্ষতাকে এমনভাবে ব্যাহত করে, যা বিশ্বজুড়ে কয়েক হাজার কোটি ডলারের সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট করে দেয়। তবে এটি কেবল আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়; বরং এর চেয়ে বড় ক্ষতি হলো মানুষের মেধা, মনোযোগ ও সৃজনশীলতার অবক্ষয়।

আমাদের দেশেও এর প্রভাব কিন্তু কম নয়। অধিকাংশ খেলা বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী গভীর রাতে সম্প্রচারিত হয়। ফলে হাজার হাজার তরুণ, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রাত জেগে খেলা দেখে। এর স্বাভাবিক পরিণতি হলো পরদিন কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা দৈনন্দিন কাজে স্থবিরতা ও কর্মক্ষমতার হ্রাস।

নিঃসন্দেহে সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য বিনোদনের প্রয়োজন আছে। তবে সেই বিনোদন হতে হবে সুস্থ, নির্মল ও কল্যাণকর। কিন্তু বিনোদনের নামে উন্মাদনা মানুষকে প্রফুল্ল করার চেয়ে বরং বেশি মানসিক অস্থিরতা ও ডিপ্রেশনের দিকে ঠেলে দেয়। তা ছাড়া মুসলমানের জীবনের প্রতিটি কাজের লক্ষ্য হওয়া উচিত মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। যে কাজ আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয় কিংবা তার বিধান পালনে শৈথিল্য সৃষ্টি করে, তাতে কোনো সচেতন মুসলমান লিপ্ত হতে পারেন না। এই খেলা নামাজের প্রতি উদাসীন করে। খেলোয়াড়দের সতর উন্মুক্ত থাকার কারণে দৃষ্টির গুনাহ হয়। কখনো কখনো খেলার অতিরিক্ত উত্তেজনায় শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। প্রিয় দলের জয়পরাজয়কে কেন্দ্র করে হতাশা, পারস্পরিক বিদ্বেষ, ঝগড়াবিবাদ এমনকি আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটে। যেগুলো গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা দেখতে পাই। নিঃসন্দেহে এসব একজন মুসলমানের জন্য খুবই উদ্বেগের বিষয়। এ ছাড়া এই খেলাকে কেন্দ্র করে জুয়া ও বাজির যে বিস্তার লাভ করে, তা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের শান্তি বিনষ্ট করে। আমরা কী ভেবে দেখেছি, যাদের জন্য আমরা আমাদের মূল্যবান সময় ব্যয় করছি, শান্তি বিনষ্ট করছি, এমনকি হারামেও জড়িত হচ্ছি; এতে আমাদের কী লাভ হচ্ছে! মূলত বিনোদনের নামে আমরা কিছু সুচতুর মানুষের পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছি। তারা আমাদের আবেগকে পুঁজি করে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করে নিচ্ছে। বিনিময়ে আমরা পাচ্ছি ক্লান্তি, কলহ, সময়ের অপচয় এবং আধ্যাত্মিক শূন্যতা।  একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের মনে রাখা জরুরি, কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ সময়ের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব নেবেন। সেই দিন কোনো ফুটবল তারকা আমাদের রক্ষায় এগিয়ে আসবে না। অথচ আমরা তাদের পেছনে স্রেফ উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে নিজের পরকালকে নষ্ট করে চলছি। আল্লাহ আমাদের সঠিক উপলব্ধি দিন।

জুমার মিম্বর থেকে

♦ গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews