ইসরাইল, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধাবস্থা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই ত্রিমুখী সংঘাতের সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে জ্বালানি তেলের ওপর, যা বর্তমানে বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিয়েছে। আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশও এই সংকটের বাইরে নয়। বিশ্বের অনেক দেশ এই আপৎকালীন পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে নানামুখী সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নিলেও বাংলাদেশে এখনো কোনো কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। বরং সরকার এবং তেল পাম্প মালিকদের পক্ষ থেকে আসা পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
এমন এক নাজুক পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত কার এবং মোটরসাইকেল চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় জরুরি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি ছাড়া সর্বসাধারণের ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচলের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে তেলের ওপর চাপ অনেকাংশে কমে আসবে এমনটা বলছেন কেউ কেউ। এই সাশ্রয়কৃত জ্বালানি তখন সরাসরি কৃষি এবং কলকারখানাগুলোতে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো মূলত কৃষিপ্রধান, আর এখন চলছে সেচের মৌসুম। যদি তেলের অভাবে কৃষকের পাম্প বন্ধ হয়ে যায়, তবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। তাই বিলাসিতা বা ব্যক্তিগত সুবিধা ত্যাগ করে উৎপাদনের চাকা সচল রাখাই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
সরেজমিনে গত কয়েকদিন উত্তরের জেলা রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, নওগাঁ এবং সিরাজগঞ্জ ঘুরে দেখা গেছে পাম্পগুলোতে তেলের জন্য মানুষের দীর্ঘ হাহাকার। প্রতিটি পাম্পের সামনে শত শত মোটরসাইকেল ও কারের লম্বা লাইন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এই অনিশ্চয়তা থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে অবৈধ মজুতের এক ভয়ংকর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ড্রাম ও বোতলে তেল ভরে রাখছে, যা কৃত্রিম সংকটকে আরও উসকে দিচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ প্রতিদিন বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে হাজার হাজার লিটার অবৈধভাবে মজুত করা তেল উদ্ধার করছে। যদি ব্যক্তিগত যান চলাচলে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আসত, তবে এই তেলের চাহিদা যেমন কমত, তেমনি মানুষের অবৈধ মজুতের মানসিকতাও দূর হতো।
অপর দিকে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ডিলার্স ডিস্ট্রিবিউট এজেন্টস এ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স এসোসিয়েশন রাজশাহী বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল বর্তমান জ্বালানি সংকটের এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে নিজের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, তার দীর্ঘ ব্যবসায়িক জীবনে তেলের পাম্পে বাইকের এমন অস্বাভাবিক এবং নজিরবিহীন ভিড় তিনি আগে কখনো দেখেননি। বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এই বিশাল সংখ্যক বাইক হুট করে কোথা থেকে এলো এবং এরা আসলে কারা? আব্দুল জলিল মনে করেন, যদি এখনই এই বাইকগুলোর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা না হয়, তবে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে এবং সংকট আরও ঘনীভূত হবে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, পাম্পগুলোতে তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বাইকারদের বড় একটি অংশই কোনো সুনির্দিষ্ট বা জরুরি প্রয়োজন ছাড়াই রাস্তায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। অপ্রয়োজনীয় এই যাতায়াত দেশের সীমিত জ্বালানি সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, পাম্প মালিক বা ডিলারদের পক্ষে এই বিশাল জনস্রোত কিংবা অপ্রয়োজনীয় বাইক চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাদের সেই প্রশাসনিক ক্ষমতাও নেই। তাই দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এবং কৃষি ও শিল্পের চাকা সচল রাখতে সরকারকেই এই বাইক চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ বা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। আব্দুল জলিলের মতে, সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এখন প্রায় অসম্ভব।
এছাড়াও জ্বালানি খাতের এই বিশৃঙ্খলা ও পাম্পগুলোতে তেলের প্রকৃত মজুত কতটুকু আছে, তা নিয়ে সরকার ও মালিকপক্ষ থেকে আসা ভিন্ন ভিন্ন তথ্যে জনমনে চরম বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। একটি আধুনিক অ্যাপের মাধ্যমে যদি প্রতিটি পাম্পের তেথ্যের অস্বচ্ছতা দূর করতে সরকারকে এখন ডিজিটাল মনিটরিং ও একটি সমন্বিত ফুয়েল অ্যাপ চালুর বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। লাইভ স্ট্যাটাস বা বর্তমান মজুত সাধারণ মানুষ ও প্রশাসন সরাসরি দেখতে পেত, ফলে কৃত্রিম সংকট তৈরির কোনো সুযোগ থাকত না।
পাশাপাশি সরকারকে এখন গণপরিবহন ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে। ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে মানুষকে ব্যক্তিগত গাড়ি ছেড়ে বাস বা ট্রেনের মতো গণপরিবহনে উৎসাহিত করতে হবে। এতে জ্বালানি তেলের সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি রাজপথে যানবাহনের অসহনীয় চাপও কমবে। পরিস্থিতি যে হারে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, তাতে এখনই কঠোর সিদ্ধান্ত না নিলে সামনের দিনগুলোতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। তাই জাতীয় স্বার্থে এবং অর্থনীতিকে সচল রাখতে ব্যক্তিগত কার ও বাইক নিয়ন্ত্রণ করে জ্বালানি তেলের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা এখন সময়ের অনিবার্য দাবি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি দ্রুত এই পথে না হাঁটে, তবে তেলের এই চোরাবালি থেকে উত্তরণ কঠিন হয়ে পড়বে।