কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে হাওরের সাত জেলায় মোট চার লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৯ লাখ ২৫ হাজার ২৫০ টন। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ ৮২ হাজার ১৯৫ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে, যা মোট আবাদের ৬২ শতাংশ। ২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, উজানের পাহাড়ি ঢল এবং টানা ভারী বর্ষণে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ হাওর অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় হাজার হাজার হেক্টর জমির আধাপাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে, যা কৃষকের জন্য চরম বিপর্যয় নিয়ে এসেছে। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করছে কৃষি বিভাগ। তখন ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ জানা যাবে। প্রাথমিকভাবে হাওরাঞ্চলে ৯৪১ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে বলে স্থানীয় কৃষকেরা জানিয়েছেন। অন্যদিকে শিলাবৃষ্টিতে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার প্রায় সাড়ে ৩০০ হেক্টর জমির ধান আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

হাওরাঞ্চলে ফসল বলতে একটাই বোরো ধান। কৃষকের সারা বছরের খাদ্যের জোগান, আশা-ভরসা, স্বপ্ন সবকিছু এই ফসল ঘিরে আবর্তিত হয়। মাত্র কয়েক দিনের বৃষ্টিতে সেই ধান এখন পানির নিচে। চোখের সামনে পাকা ধান পচে যাচ্ছে। অথচ আর কয়েক দিন পরই কৃষকের গোলা ভরে যেত। পরিস্থিতি এতটাই করুণ, হাওরাঞ্চলের কৃষকের অস্তিত্বই বিপন্ন হতে চলেছে। গবাদি পশুর খাবারেও সংকট দেখা দিয়েছে। সব মিলিয়ে কৃষকের মাথায় হাত। ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যার পর হাওর ব্যবস্থাপনায় পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠিত হলেও এ বছর তারা উজানের ঢলের পানি ঠেকাতে বাঁধ নির্মাণ, বন্যা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাপনা সকল ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এর ফলে উজানের ঢল ও গত সপ্তাহের অতিবৃষ্টিতে হাওরের কষ্টার্জিত ফসল তলিয়ে গেছে। হাওরের এই শোচনীয় পরিস্থিতি পুরোটাই প্রাকৃতিক দুর্যোগ, তা পরিপূর্ণ সঠিক নয়। বেশ কয়েক বছর থেকে হাওরে অপরিকল্পিত কিছু বাঁধ নির্মাণ এবং অপ্রয়োজনীয় নতুন নতুন প্রকল্প নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে আসলেও সরকার তাতে কর্ণপাত করে নাই। বরং লুটপাটের জন্য এমন কিছু বাঁধ হাওরের ফসল রক্ষার নামে তৈরি করা হয়, যেগুলো কৃষকের গলার ফাঁস হয়ে ওঠেছে। এবার পাহাড়ি ঢলে ফসলের বেশি ক্ষতি হয়নি, বরং টানা বৃষ্টির পানি বাঁধের কারণে নদীতে নামতে না পারায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চল বর্তমানে পানির নিচে। কৃষকের তিন মাসের কষ্টে উৎপাদিত সোনালী ধান তলিয়ে যাওয়ায় বিপর্যয় নেমে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে ডুবে থাকা পাকা ধানের আশা ছেড়েই দিয়েছেন কৃষকরা। শুকানোর জায়গা ও সুবিধাজনক আবহাওয়া না থাকায় ঘরে তোলা বেশির ভাগ ধানও নষ্ট হয়ে পচে যাচ্ছে। যে সময়টায় সোনালি ধানের ঘ্রাণে ভেসে থাকার কথা, সে সময়ে হাওর জুড়ে হতাশা আর পচা ধানের গন্ধ। হাওর জুড়ে কোলাহল ও প্রাণচাঞ্চল্যের বদলে চাপা কান্না ও আহাজারি ছড়িয়ে আছে। দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে, যার উল্লেখযোগ্য ২৩ ভাগ হাওর অঞ্চল থেকে উৎপাদিত হয়। অন্যান্য এলাকা এবং হাওরের কৃষি উৎপাদনের মধ্যে সময় ও বাস্তবতায় নানা ফারাক আছে। যে বছর হাওর অঞ্চলের বোরো ধানের ফলন কৃষক নির্বিঘেœ ঘরে তুলতে পারেন, সে বছর চালের দাম ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে, নিশ্চিত হয় দেশের খাদ্য নিরাপত্তা। অন্যথায় চালের বাজারেও অস্থিরতা তৈরী হতে বাধ্য।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন দেশে দেশে স্পষ্ট। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি প্রতিবছরই দেখা যাচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতিও অনেক। কিন্তু অনেক দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে, ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমাদের দেশ এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে। অনেক সময় শুধুমাত্র লুটপাটের ক্ষেত্র তৈরী করতে পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, এমন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হয়। হাওর অঞ্চলে প্রতি তিন বছরে একবার আকস্মিক বন্যায় ফসল নষ্ট হওয়া একটি পুরনো ও নিয়মিত ঘটনা। এবারের ঢলে পানির তোড়ে এবং অসময়ের বৃষ্টিতে ধান কাটার আগেই তা তলিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে বলেছেন, হাওরাঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিন মাস সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে। নিঃসন্দেহে এটি ইতিবাচক সাড়া। আমরা মনে করি, এর যথাযথ বাস্তবায়ন হতে হবে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক যেন সহায়তা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে হাওরে ফসল রক্ষায় টেকসই পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, আবহাওয়ার পূর্বাভাস সহজে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের খুঁজে বের করতে হবে। জমির মালিকদের একটা হিসাব থাকলেও প্রকৃত চাষিদের কোনো তালিকা সরকারের কাছে আছে বলে মনে হয় না। ফলে জমির মালিক ক্ষতিপূরণ পেলেও সত্যিকারের ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক এর থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। মনে রাখতে হবে, বন্যায় জমির মালিকদের কোনো ক্ষতি হয় না। তারা আগাম টাকা নিয়ে চাষিকে চাষ করতে দেন। চাষি ধারকর্জ করে ফসল ফলান। তিন মাসের সহায়তা হোক আর এককালীন সহায়তা হোক, কোনোটাই ক্ষতিগ্রস্ত চাষির কাছে পৌঁছায় না। স্থানীয় সরকারের কার্যকর অনুপস্থিতিতে এখানে দলবাজদের দৌরাত্ম্য দেখা দিলে সরকারের উদ্যোগ বাঁধাগ্রস্থ হবে। মানুষ আসলে ত্রাণ নয়, টেকসই বাঁধের ব্যবস্থা দেখতে চায়। দেখতে চায়, যারা বাঁধ ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি করে, তাদের বিচার হোক, যা কেউ কোনো দিন করেনি।

বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হাওর অঞ্চল। প্রতি বছর বোরো মৌসুমে এই অঞ্চলের কৃষকরা প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে যে ফসল ফলান, তার ওপর নির্ভর করে দেশের চালের একটি বড় অংশ। দুঃখজনক হচ্ছে, যে হাওর আমাদের খাদ্যের নিশ্চয়তা দেয়, সেই হাওরই আজ কৃষকদের জন্য পরিণত হয়েছে অনিশ্চয়তা ও বেদনার প্রতীকে। এবারের টানা বৃষ্টি, উজানের ঢল ও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধিতে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেটের বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগজনক। এই সংকট কেবল একটি মৌসুমি দুর্যোগ নয়। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সমস্যার বহিঃপ্রকাশ। হাওরের নদ-নদী ও খাল-বিলগুলো বছরের পর বছর খননের অভাবে নাব্য হারিয়েছে। পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই পানিবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। খোয়াই, সুরমা, কুশিয়ারা, কংশ, ভোগাইসহ প্রায় সব নদীরই একই চিত্র। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল যখন এই নদীগুলো দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন তা ধারণ করার সক্ষমতা না থাকায় পানি পাড় উপচে হাওরে ঢুকে যায়। ফলে কয়েকদিনের মধ্যেই হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে চলে যায়। এই অবস্থা থেকে হাওরের কৃষককে রক্ষা করতে হবে।

হাওরের সমস্যা নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে স্থানীয় কৃষকরা স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদী খনন এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি থাকলেও কার্যকর বাস্তবায়ন নেই। অনেকক্ষেত্রে অস্থায়ী বা দুর্বল বাঁধ নির্মাণ করা হয়, যা সামান্য চাপেই ভেঙে পড়ে। কোথাও কোথাও প্রকল্প নেওয়া হলেও তা শেষ পর্যন্ত দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা বা সমন্বয়হীনতার কারণে কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি। অতিবৃষ্টিতে ও পাহাড়ি ঢলে হাওর অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া ও হাওরের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই। একই সাথে পরবর্তী ফসল না ওঠা পর্যন্ত হাওর এলাকাকে দুর্গত ঘোষণা করে রেশনিং ব্যবস্থা চালু রাখা উচিত। হাওরের ফসল সুরক্ষায় আগে থেকে আলাদা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে সরকারকে। অবিলম্বে হাওর অঞ্চলকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করে আগামী ফসল না আসা পর্যন্ত প্রতিটি পরিবারকে প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং আগামী অন্তত ৬ মাস রেশনিংয়ের ব্যবস্থা জারি রাখা প্রয়োজন। একই সাথে কৃষকের কৃষিঋণ-এনজিও-মহাজনী ঋণ আদায় আগামী ছয় মাসের জন্য স্থগিত ও সুদ মওকুফ করতে হবে। হাওর অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্থ ধান চাষিদের জন্য সরকারিভাবে বিশেষ শস্যবীমা চালু করা প্রয়োজন। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত ‘প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) দূর্নীতি ও অনিয়মের হোতাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি সরকারকে স্থানীয় কৃষকদের সংগঠিত করা, পানি ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় কমিটি গঠন, বাঁধের ছোটখাটো মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, স্থানীয় মানুষ যেন নিজেরাই বাঁধ রক্ষা করে সেই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা, দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা, বাঁধ দ্রুত মেরামত করা, কৃষকদের মালিকানাবোধ তৈরি করার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। আমাদের প্রত্যাশা, বর্তমান সরকার হাওরের কৃষকের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews