বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আলোচনা হলেই একটি পরিসংখ্যান প্রায়শই সামনে আসে—হাসপাতালের শয্যা কত, নতুন কত শয্যা যুক্ত হলো, কোথায় কত শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ হচ্ছে। যেন শয্যার সংখ্যা বাড়ানোই স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের প্রধান সূচক। অথচ বাস্তবতা হলো, একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে হাসপাতাল কত মানুষকে ভর্তি করল, তার ওপর নয়; বরং কত মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারল, তার ওপর।
অবশ্যই জনসংখ্যার তুলনায় পর্যাপ্ত হাসপাতাল, শয্যা, চিকিৎসক, নার্স ও আধুনিক চিকিৎসা-প্রযুক্তি অপরিহার্য। জরুরি ও বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য এসব অবকাঠামোর বিকল্প নেই। কিন্তু স্বাস্থ্যনীতির কেন্দ্রবিন্দু যদি কেবল হাসপাতালনির্ভর চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে রোগের বোঝা কমানো সম্ভব নয়। কারণ হাসপাতাল মূলত অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা দেয়; সুস্থ মানুষ তৈরি করে না।
আধুনিক জনস্বাস্থ্যবিজ্ঞানের মূল দর্শন হলো—রোগ হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা। নিরাপদ পানি, উন্নত স্যানিটেশন, পুষ্টিকর খাদ্য, টিকাদান, মাতৃ ও শিশুসেবা, পরিবেশগত স্বাস্থ্য, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, তামাক ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস নিরুৎসাহিত করা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বাস্থ্যশিক্ষা—এসবই একটি কার্যকর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভিত্তি। এই বিনিয়োগের সুফল হাসপাতালের বেডে নয়, মানুষের সুস্থ জীবনে প্রতিফলিত হয়।
বাংলাদেশ সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, টিকাদান এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় অতীতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু বর্তমানে অসংক্রামক রোগ—যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ, ক্যানসার এবং কিডনি রোগ—দ্রুত বাড়ছে। এসব রোগের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ এবং নিয়মিত জীবনধারাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবল হাসপাতালের শয্যা বাড়িয়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
এ কারণেই এখন সময় এসেছে চিকিৎসাকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যনীতি থেকে মানুষকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যনীতির দিকে অগ্রসর হওয়ার। প্রতিটি নীতিগত সিদ্ধান্তে জনস্বাস্থ্যের প্রভাব বিবেচনা করা, স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলা, রোগ প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা এবং স্বাস্থ্যকে কেবল চিকিৎসা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হিসেবে নয়, শিক্ষা, কৃষি, পরিবেশ, স্থানীয় সরকার ও নগর পরিকল্পনাসহ সব খাতের সমন্বিত দায়িত্ব হিসেবে দেখা জরুরি।
একটি দেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার মানুষ সুস্থ থাকে। হাসপাতাল বাড়ানো প্রয়োজন, বিশেষায়িত চিকিৎসা সম্প্রসারণও জরুরি। কিন্তু তার সঙ্গে সমান গুরুত্ব না পেলে জনস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা—স্বাস্থ্যখাতের ব্যয় যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে মানুষের ভোগান্তিও।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত হাসপাতালের শয্যা পূর্ণ রাখা নয়; বরং এমন একটি বিজ্ঞানভিত্তিক, সমতাভিত্তিক ও গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ যতটা সম্ভব কম অসুস্থ হবে। কারণ একটি সুস্থ জাতি তৈরি হয় হাসপাতালের দেয়ালের ভেতরে নয়, সমাজের প্রতিটি পরিবার, বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র ও সম্প্রদায়ের স্বাস্থ্যকর পরিবেশে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)