আজকের ভোর কোনো সাধারণ ভোর নয়। ইতিহাসের ভার যেন এই প্রভাতের আলোকে আরও গভীর করে তুলেছে। একটি জাতি যার জন্য অপেক্ষা করেছে ৭,০৭৫ দিন, সেই প্রতীক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আজ। আজ শুরু হচ্ছে নবনির্বাচিত সংসদের অধিবেশন—এক দীর্ঘ, কঠিন এবং সংগ্রামময় যাত্রার পর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুত এক নতুন সূচনা। ২০০৬ সালের ২৯ আগস্ট, যখন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার মেয়াদ শেষে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়, তখন থেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এক অস্থির অধ্যায়ে প্রবেশ করে। ২০০৭ সালের কুখ্যাত “১/১১”—দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আমূল পাল্টে দেয়। পরবর্তী বছরগুলোতে চারটি বিতর্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সময়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়াই জবরদস্তিভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখে—রাজনৈতিক সংকট ক্রমেই গভীর হয়। বহু নাগরিক ও রাজনৈতিক কর্মীরা সেই সময়টিতে খুন, নিপীড়ন, গুমের শিকার হয় এবং গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার এক দীর্ঘ অন্ধকারে নিপতিত হয় দেশ। ২০০৯ থেকে ২০২৪—এই পনেরো বছরে বারবার উঠে এসেছে প্রতিরোধের ঢেউ। ২০১৩, ২০১৫, ২০১৮ এবং আবার ২০২৩–২০২৪ সালে গণআন্দোলন সংগঠিত হয়—যার মূল দাবি ছিল গণতান্ত্রিক অধিকার, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং নাগরিক স্বাধীনতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

এই দীর্ঘ সংগ্রামের শেষ অধ্যায় রচিত হয় ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের নাটকীয় ঘটনাবলিতে। দেশজুড়ে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ এবং আন্দোলনে কেঁপে ওঠে জনপদ। হাজারো মানুষ জীবন উৎসর্গ করেন, অগণিত মানুষ আহত হন। অনেকের কাছে সেই দিনগুলো ছিল প্রায় দুই দশকের প্রতিরোধ ও আকাঙ্ক্ষার চূড়ান্ত পরিণতি। অবশেষে সেই বিজয়ের দিন আসে—ইতিহাসে স্মরণীয় “জুলাই ৩৬”। অসংখ্য সাহসী মানুষের আত্মত্যাগ আর লক্ষ লক্ষ মানুষের ত্যাগ ও বেদনার বিনিময়ে অর্জিত হয় সেই বিজয়। সেই সংগ্রাম বিজয়ের দেড় বছর পরে, আজ, নবনির্বাচিত সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্য দিয়েই গণতন্ত্রের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত যাত্রা আবার শুরু হচ্ছে। আশা করা যায়—গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠা পাবে, মানুষের মৌলিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং ভোটের অধিকার আবার দৃঢ় ভিত্তি পাবে। স্বপ্ন একটিই—একটি ন্যায়ভিত্তিক, ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ, যেখানে জনগণের ইচ্ছাই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শক্তি।

যারা সেই উত্তাল দিনগুলোতে রাজপথে দাঁড়িয়েছিল, তাদের কাছে এই সংগ্রাম ছিল কেবল রাজনৈতিক নয়—এটি ছিল এক প্রজন্মের ইতিহাস। পূর্বের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা নিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম বিশ বা বাইশ বছরের তরুণদের পাশে। তারা আমার সাথে তর্ক করেছে, মতবিনিময় হয়েছে, কৌশল নিয়ে বিতর্ক হয়েছে—কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহসই পথ দেখিয়েছে। সেই দিনগুলোয় এক বিরল প্রজন্মগত ঐক্য গড়ে উঠেছিল—যার বন্ধন ছিল ইতিহাস বদলে দেওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস। এভাবেই আমরা হাজারে হাজারে, লক্ষ্যে লক্ষ্যে একসঙ্গে লড়েছি—এবং একসঙ্গেই জয়ী হয়েছি। লাশের ওপর দাঁড়িয়ে সেই আন্দোলন চালানো এক জটিল কাজ ছিল। বিশেষ করে ছাত্রদের নয় দফা দাবি থেকে হাসিনা পতনের এক দফায় টেনে আনা—গণভবন ঘেরাও করার ডাক—আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ১৮ জুলাই আমি আহ্বান জানিয়েছিলাম, গণভবন ঘেরাও করে বাস্তিল দুর্গের ন্যায় পতন ঘটানোর, যা আন্দোলনের এক প্রতীকী মোড় হয়ে ওঠে। অনেকের কাছে সেই মুহূর্তটি ইতিহাসের ‘Storming of the Bastille’-এর স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলেছিল—অবিচল ক্ষমতার পতনের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে।

কিন্তু পথটি সহজ ছিল না। দেশের নানা প্রান্তে তরুণেরা জীবন দিচ্ছিল। বুলেট আর লাশের সামনে দাঁড়িয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন। দিনে সংঘর্ষ, রাতে গ্রেপ্তার, গুম ও দমন-পীড়নের ভয়—প্রতিটি রাতই ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। অস্ত্রহীন মানুষের এই অসম সংগ্রাম—আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত প্রশিক্ষিত বাহিনীর বিরুদ্ধে—ছিল এক অভূতপূর্ব সাহসের পরীক্ষা। অনেক সময় আমি তরুণদের আগেই কর্মসূচি ঘোষণা করে দিতাম। তারা কখনো আমাকে থামাতে চাইত। তখন আমি তাদের ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিতাম—কিভাবে ইতিহাসের নানা সংগ্রাম বিশ্বকে বদলে দিয়েছে। আমি জনগণকে আহ্বান করেছিলাম: “নিজ নিজ ঘরের সামনে রাস্তায় বেরিয়ে দাঁড়ান—আপনারা দেখবেন বিজয়।” তারা বিশ্বাস করেছিল। আমি পুলিশ, সেনাবাহিনী ও সরকারি কর্মচারীদের বলেছিলাম: “বাঁচতে চাইলে জনগণের পাশে দাঁড়ান।” দেরিতে হলেও অনেকেই এসেছিল। আর সংগ্রামীদের বলেছিলাম: “নেতা নেই তো কি হয়েছে, এখন তুমিই নেতা—আন্দোলনের নেতৃত্ব দাও।” দিয়েছিলো।

জুলাইয়ের শেষ দিকে হাসিনার পতন নিশ্চিত করতে আমি প্রতীকীভাবে জুলাই মাসটিকেই বাড়িয়ে দিয়েছিলাম—এভাবেই জন্ম নেয় ঐতিহাসিক “জুলাই ৩৬”। যখন একদিন বিরতি নিয়ে ৬ আগস্ট ঢাকা অভিমুখে কর্মসূচি নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়, আমি বলেছিলাম—বিরতির সুযোগ নেই। কর্মসূচি এগিয়ে আনতে হবে। ৫ আগস্টই গণভবন ঘেরাও করতে হবে। আমি বারবার বলেছিলাম—এগিয়ে চলুন, গণভবন ঘেরাও করুন, পতন ঘটান। অবশেষে তরুণদের অদম্য সাহস, দৃঢ়তা এবং দক্ষতার সামনে দমন-পীড়নের শক্তি পরাজিত হয়। শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচার পালিয়ে যায়। এই ঘটনা ইতিহাসে ক্ষুদ্র কোনো ঘটনা নয়। এই মহান সংগ্রামের বিজয় বহুদিন ধরে জাতির স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে। এটি থাকবে গর্বের প্রতীক হিসেবে—গণতন্ত্রের জন্য এক অবিস্মরণীয় সংগ্রামের ইতিহাস হয়ে। আগামী প্রজন্মের কাছে এটি হবে অনুপ্রেরণার উৎস—শুধু এই দেশের জন্য নয়, বিশ্বের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্যও।

আজ যখন দেশ প্রবেশ করেছে পবিত্র রমজানের শেষ দশকে—যা আত্মশুদ্ধি ও পবিত্র রজনীর অনুসন্ধানের সময়—তখন এই মুহূর্তটি ইতিহাসের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক তাৎপর্যও বহন করছে। এই নতুন অধ্যায়ে আমাদের প্রার্থনা—দেশে প্রতিষ্ঠিত হোক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, প্রতিষ্ঠিত হোক ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা, সমৃদ্ধি পৌঁছে যাক প্রতিটি নাগরিকের কাছে, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গড়ে উঠুক এক নির্ভীক গণতান্ত্রিক সমাজ। এক ঐতিহাসিক বৃহস্পতিবারের সকাল সমগ্র জাতির জন্য উৎসর্গিত। আশা আমাদের পথ দেখাক, ভবিষ্যৎ হোক উজ্জ্বল।

লেখক: সিনিয়র সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews