এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলনে পুলিশের লাঠিচার্জের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি বলেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা কখনো সফল হয়নি। ইতিহাসে প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শিক্ষার্থীরাই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিয়েছে। তাই দমন-পীড়ন, ভয়ভীতি কিংবা শক্তি প্রয়োগ করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সন্ধ্যায় বগুড়া শহরের সাতমাথায় জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি শেষে আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সমাবেশে দলটির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, দাবি-দাওয়া আদায়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন গণতান্ত্রিক অধিকার। সেই আন্দোলনের জবাবে বলপ্রয়োগ কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়িত্ব এবং ইতিহাস বারবার সেটিই প্রমাণ করেছে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ও সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বগুড়াকে এমন একটি মডেল জেলায় পরিণত করতে হবে, যেখানে চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি, ধর্ষক ও সন্ত্রাসীদের কোনো জায়গা থাকবে না। প্রকৃত পরিবর্তন কোনো ব্যক্তি বা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর মাধ্যমে নয়, বরং জনগণের সম্মিলিত শক্তির মাধ্যমেই সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখনো চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা চলছে। ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হলেও অনেকেই ভয়ে মুখ খুলতে পারছেন না। এ অবস্থায় অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সবাইকে সাহসের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, মানুষের ভয় পাওয়ার একমাত্র সত্তা মহান আল্লাহ; অন্যায়ের কাছে মাথা নত করার কোনো সুযোগ নেই।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এনসিপির এই নেতা। তিনি বলেন, ভারত সীমান্তে বিভিন্ন সময়ে উসকানিমূলক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে। সীমান্ত হত্যা, পুশইন এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়গুলো সংসদে যথাযথ গুরুত্ব না পাওয়া দুঃখজনক। দেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের স্বার্থ রক্ষায় এসব ইস্যুতে রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নারীর ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গ তুলে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, দেশের উন্নয়ন ও অর্থনীতিতে নারীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত লাখো নারী দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাই কর্মক্ষেত্র ও সমাজের সর্বস্তরে নারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পেশিশক্তি, অস্ত্রের মহড়া ও ভয়ভীতির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও জবাবদিহিতাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান, যেখানে দুর্নীতি, বৈষম্য ও নির্যাতনের কোনো স্থান থাকবে না এবং প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ও মর্যাদা ভোগ করবেন।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, সৎ, দক্ষ ও গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তিনি বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর কেউ যদি দুর্নীতি, অনিয়ম বা জনগণের সঙ্গে প্রতারণায় জড়িয়ে পড়েন, তাহলে এনসিপি তার দায় নেবে না; বরং জনগণের পক্ষে অবস্থান নেবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে।
সমাবেশের শেষ দিকে বগুড়াবাসীর উদ্দেশে তিনি আহ্বান জানিয়ে বলেন, পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের ওপর আস্থা রাখতে হবে। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই বৈষম্য, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।