হাতে রংতুলি, পরনে অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত গ্লাভস। গাজার একটি বড় তাঁবুর ভেতরে স্বেচ্ছাসেবকেরা যত্নের সাথে পাথরের মোজাইকের ওপর জমে থাকা ধুলো পরিষ্কার করছেন। এরপর সেগুলো সংরক্ষণের জন্য নিরাপদে রাখা হচ্ছে। যুদ্ধের ক্ষতিগ্রস্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার উদ্যোগের এটি একটি অংশ ।

জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইল ও হামাসের সংঘাতে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ১৬০টিরও বেশি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব নিদর্শনের অনেকগুলোর ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরোনো।

দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস শহরে সংরক্ষণকাজে যুক্ত ফিলিস্তিনি চিত্রশিল্পী মোহাম্মদ আবু লাহিয়া বলেন, ‘অনেক মোজাইক শিল্পকর্ম সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে হারিয়ে গেছে কিংবা ধ্বংস হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা জরুরি। আমাদের সন্তানদের এবং সমাজকে আমাদের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিতে হবে। একইসাথে বিশ্বকে জানাতে হবে, আমরা আমাদের ঐতিহ্য ও ফিলিস্তিনি জাতীয় উদ্দেশ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের পাশাপাশি তুলনামূলক সাম্প্রতিক সাংস্কৃতিক সামগ্রীও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলার ধ্বংসস্তূপের নিচে সেগুলো চাপা পড়ছে।

জাতিসঙ্ঘের হিসাবে, সংঘাত চলাকালে গাজার ৯০ শতাংশের বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পারস্য, গ্রিক, রোমান, বাইজেন্টাইন ও অটোমানদের উপস্থিতিতে গাজায় সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। গির্জা, মসজিদ, বন্দর ও নানা প্রত্ননিদর্শনে সেই ইতিহাসের ছাপ রয়েছে। সংঘাতে এর অনেকগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনাকারী বেসরকারি সংস্থা মায়াসেম অ্যাসোসিয়েশন ফর কালচার অ্যান্ড আর্টসের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবিষয়ক গাইড মুহান্নাদ আবু লাহিয়া বলেন, ‘এই পাথরের টুকরাটিকে বলা হয় মর্টার। শস্য ও ভেষজ পেষার কাজে এটি ব্যবহার করা হতো। এর বয়স আনুমানিক পাঁচ হাজার বছর।’

এর পেছনে আবহাওয়াসহিষ্ণু প্লাস্টিকের পাত্রে রাখা কাঠের তাকজুড়ে নিরাপদে সংরক্ষণের জন্য তালিকাভুক্ত নিদর্শন সাজানো রয়েছে।

অতীত সংরক্ষণের সংগ্রাম
গাজা উপত্যকায় প্রবেশ করা পণ্যের ওপর ইসরাইলের কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এসব বিধিনিষেধের কারণে বিভিন্ন সময় খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রীর তীব্র সঙ্কট তৈরি হয়েছে। ফলে স্বেচ্ছাসেবকদের পেশাদার সংরক্ষণ সরঞ্জাম ছাড়াই কাজ করতে হচ্ছে।

তারা সাধারণ রংতুলি দিয়ে মোজাইকের ধুলো পরিষ্কার করছেন। আবার কালো কাগজে মোড়ানো একটি বাক্সের ওপর ক্যামেরা বসিয়ে অস্থায়ী স্ক্যানিং স্টেশনও তৈরি করেছেন।

এই অস্থায়ী স্ক্যানারের মাধ্যমে পুরোনো ছবি ও কাগজপত্র ডিজিটাল করা হচ্ছে। পরে সেগুলো সংরক্ষণের জন্য কম্পিউটারে রাখা হচ্ছে।

সংরক্ষণে নেয়া সবকিছু অবশ্য প্রাচীন নয়। অনেক সামগ্রী বিংশ শতাব্দির। এর মধ্যে রয়েছে অটোমান সাম্রাজ্যের শেষ সময়, ব্রিটিশ ম্যান্ডেট ও মিসরীয় প্রশাসনের আমলের বিভিন্ন বস্তু। বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর ধ্বংস বা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে মালিকেরা এগুলো সংরক্ষণের জন্য দিয়েছেন।

২৯ বছর বয়সী স্বেচ্ছাসেবক তাগরিদ হাজ্জারি বলেন, ‘এটি একটি কাগজভিত্তিক আর্কাইভ। এতে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট আমলের খান ইউনিস ও আশপাশের এলাকার মানচিত্র এবং স্থাপত্য পরিকল্পনা রয়েছে।’

একটি টেবিলে তিন নারী মূল শিল্পকর্মের ছাপানো কপিকে অনুসরণ করে কয়েক শত ভাঙা টুকরা জোড়া দিয়ে একটি আধুনিক মোজাইক পুনর্গঠন করছিলেন। অতিরিক্ত পাথরের অংশ কাঠমিস্ত্রিদের ব্যবহৃত সাঁড়াশি দিয়ে ছেঁটে ফেলা হচ্ছিল।

তবে অনেক নিদর্শন এখনো তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর ওপারে রয়ে গেছে। এই রেখা হামাসের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা ও ইসরাইলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলকে পৃথক করেছে।

ইসরাইলের দাবি, তারা এখন গাজা উপত্যকার ৬০ শতাংশের বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। গত বছরের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার সময় এই নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রায় অর্ধেক এলাকায়।

স্বেচ্ছাসেবকদের ভাষ্য, ইসরাইলের নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে নিদর্শন উদ্ধার করা এখনো অত্যন্ত কঠিন।

এদিকে হাজ্জারি বলেন, নাগালের মধ্যে থাকা সবকিছু সংরক্ষণের চেষ্টা চলছে। এর মধ্যে রয়েছে গাজার কয়েক শত বছরের ইতিহাস বহনকারী নানা দলিলও।

তিনি বলেন, ‘এখানে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট ও মিসরীয় আমলের সংবাদপত্র এবং বিভিন্ন দলিলও রয়েছে। এগুলো ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের আগমনের সময় পর্যন্ত সময়কালকে ধারণ করে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বয়োজ্যেষ্ঠ বাসিন্দাদের সাথে সাক্ষাৎ ও আলাপের মাধ্যমে এগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে।’

হাজ্জারি বলেন, ‘আমরা তাদের মৌখিক ইতিহাসও নথিভুক্ত করেছি, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তা একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র হিসেবে কাজে লাগে।’

সূত্র: বাসস



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews