দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তেলের ভূমিকা শুধু রসদ জোগানের বিষয় ছিল না; এটি ছিল যুদ্ধের এমন একটি নির্ধারক দিক, যা সামরিক কৌশল ঠিক করেছে এবং শেষ পর্যন্ত কে জিতবে, সেটাও অনেকাংশে নির্ধারণ করেছে।

হিটলার ক্ষমতায় আসার পর এমন এক জার্মানির কল্পনা করেছিলেন, যা হবে চাকার ওপর দাঁড়ানো একটি দেশ। অটোবাহন আর মোটরচালিত সামরিক শক্তিই হবে তার ভিত্তি। কিন্তু জার্মানি প্রাকৃতিক সম্পদ তেমন ছিল না। দেশটির নিজের তেল প্রায় ছিলই না। এই সমস্যা সমাধানে রাসায়নিক প্রতিষ্ঠান আইজি ফারবেন কয়লা থেকে কৃত্রিম তেল তৈরির একটি পদ্ধতি তৈরি করে। এই তেল খুব ব্যয়বহুল ছিল। তবু হিটলার এটাকেই সম্পদের সংকটের সমাধান হিসেবে দেখেছিলেন।

তবে তাতেও জার্মানির ঘাটতি কাটেনি। এ কারণেই তারা ‘ব্লিটজক্রিগ’কৌশল নেয়। জার্মান শব্দ ব্লিটজক্রিগের অর্থ হচ্ছে বিদ্যুৎগতির যুদ্ধ। এতে ট্যাংক, বিমান ও পদাতিক বাহিনী একসঙ্গে ব্যবহার করে শত্রুর প্রতিরক্ষা ভেঙে দ্রুত ভেতরে ঢুকে পড়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল, শত্রুকে পরাজিত করতে হবে, যাতে সম্পদের সংকট বড় আকার নেওয়ার আগেই যুদ্ধ শেষ করা যায়। ফ্রান্স দখল করায় জার্মানিকে সাময়িকভাবে কিছু তেলের মজুত এনে দেয়। কিন্তু ব্রিটেনের যুদ্ধে ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি ১০০-অকটেন জ্বালানি ব্রিটিশ স্পিটফায়ারকে (ব্রিটেনের তৈরি দ্রুতগতির যুদ্ধবিমান) জার্মান মেসারশমিটের (জার্মানির অন্যতম প্রধান ফাইটার বিমান) তুলনায় বেশি শক্তি ও চালনা কৌশলের সুবিধা দেয়।

১৯৪০ সালের গ্রীষ্মে ব্রিটেনের যুদ্ধে এই ১০০-অকটেন জ্বালানি ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সকে বড় প্রযুক্তিগত সুবিধা দেয়। এই জ্বালানি স্পিটফায়ারকে দেয় বেশি শক্তি, বেশি উত্তোলন ক্ষমতা এবং বেশি কৌশলে ঘোরার সামর্থ্য। ফলে ব্রিটিশ পাইলটরা আকাশযুদ্ধে জার্মান মেসারশমিটের ছিল তুলনায় ভালো অবস্থানে ছিলেন।

১৯৪২ সালে জার্মান যুদ্ধযন্ত্রের বড় ব্যর্থতাগুলোর পেছনে তেল ছিল প্রধান নিয়ামক। হিটলার মস্কোকে প্রধান লক্ষ্য না বানিয়ে ককেশাসের বাকু তেলক্ষেত্রের দিকে মন দেন। কিন্তু বিশাল দূরত্ব, কঠোর আবহাওয়া এবং খারাপ রাস্তাঘাট জার্মানির অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়। ইঞ্জিনে জ্বালানি জমে যেত, আর ট্যাংক প্রত্যাশার দ্বিগুণ জ্বালানি খরচ করত। শেষ পর্যন্ত এই অভিযান স্টালিনগ্রাদের বিপর্যয়ে গিয়ে ঠেকে।

উত্তর আফ্রিকায় জেনারেল এরউইন রোমেলের বড় পরিকল্পনা ছিল মধ্যপ্রাচ্য দখল করে ককেশাসমুখী জার্মান বাহিনীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা। কিন্তু তাঁর অগ্রযাত্রা বারবার থেমে যায় পেট্রলের ঘাটতিতে। কখনো তাঁকে দখল করা ব্রিটিশ গাড়ি ও জ্বালানি ব্যবহার করতে হতো।

অন্যদিকে, মন্টগোমারির নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনী তেলের মধ্যে যেন ভাসছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাদের পর্যাপ্ত সরবরাহ ছিল। এই পার্থক্যই শেষ পর্যন্ত আল আলামেইনে রোমেলের পরাজয়ের পথ তৈরি করে।

অক্ষশক্তি যখন সংকটে লড়ছিল, তখন মিত্রশক্তি তাদের বিশাল শিল্পশক্তিকে কাজে লাগায়। মিত্রদের ব্যবহৃত প্রতি ৭০০ কোটি ব্যারেল তেলের মধ্যে ৬০০ কোটিই জুগিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এই সরবরাহ নিরাপদ রাখতে যুক্তরাষ্ট্র বিগ ইঞ্চ পাইপলাইন তৈরি করে। একই সঙ্গে তারা ভাসমান তেল ট্যাংকার ব্যবহার করে, যাতে নৌবাহিনীকে বারবার বন্দরে ফিরে যেতে না হয়। নরম্যান্ডি অভিযানের সময় প্লুটো পাইপলাইনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews