গতকাল বৃহ¯পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেছেন। এই বাজেটের শিরোনাম দিয়েছেন, ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’। এটি বাংলাদেশের ৫৫তম বাজেট। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত এটিই সর্বোচ্চ বাজেট। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সরকার গঠনের পর মাত্র চার মাসের মাথায় এত বড় অংকের বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। এত অল্প সময়ে আর কোনো সরকারকে বাজেট ঘোষণা করতে হয়নি। একটি বাজেট প্রণয়ন করতে নিদেনপক্ষে ছয় মাস লাগে। সে জায়গায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারকে বাজেটের মতো বিশাল কর্মযজ্ঞকে দেড়-দুই মাসের মধ্যে প্রণয়ন করতে হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বাজেট অন্যান্য বাজেটের মতো গতানুগতিক নয়। এটি একটি ‘মানবিক বাজেট’। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত শুক্রবার বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এই বাজেটকে ‘সব শ্রেণির মানুষের বাজেট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এতে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ থেকে শুরু করে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, চাকরিজীবী, বিভিন্ন পেশাজীবী, কেউই এই বাজেট থেকে বাদ যায়নি। বাজেটের প্রেক্ষাপট, চিন্তা ও দর্শন আলাদা। তিনি এই বাজেটকে নৈতিক ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়েছেন। অতীতের মতো বাজেটের অর্থের যাতে অপচয় না হয়, সেদিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এবারের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের মধ্যে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই আয় করা হবে রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে। ঘাটতি থেকে যাবে ২ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। এই ঘাটতি ঋণ ও অনুদানসহ অন্যান্য উৎস থেকে পূরণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী মূলধারার অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা সৃজনশীল বা ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি, ক্রীড়া অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি এবং সুনীল অর্থনীতির মতো খাতগুলোকেও জাতীয় অর্থনীতির একেবারে কেন্দ্রে নিয়ে আসার কথা বলেছেন। এ জন্য নানা ধরনের কর ছাড়ও দিয়েছেন। এতে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে তা গতিশীল হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা আগের বাজেটগুলোর তুলনায় অনেক বেশি সুলিখিত এবং যা বলার তিনি সরাসরি বলেছেন।

প্রায় বিশ বছর পর বিএনপি সরকার এই বাজেট পেশ করার সুযোগ পেয়েছে। এই সরকার এমন এক সময়ে ক্ষমতায় এসেছে, যখন দেড় দশকের বেশি সময় ধরে স্বৈরাচার হাসিনা সরকার লুটপাট, অর্থপাচার, সীমাহীন দুর্নীতির মাধ্যমে দেশকে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত করে গেছে। গণঅভ্যুত্থানে তার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিবিষয়ক যে শ্বেতপত্র কমিটি গঠন করে, তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেড় দশকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এসেও তার দেড় বছরের শাসনামলে তলানিতে থাকা অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। বরং উল্টো অর্থনীতিকে আরও তলানিতে নিয়ে গিয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এমন এক শোচনীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার যাত্রা শুরু করে। এর মধ্যে ‘মড়ার উপর খাড়ার ঘা’ হয়ে আসে ইরানযুদ্ধ। এই যুদ্ধ পুরো বিশ্বের অর্থনীতিকে টালমাটাল অবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ধনী দেশগুলোর অর্থনীতিও মন্দার কবলে পড়েছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের উপর এর নেতিবাচক প্রভাব তীব্র হয়ে উঠেছে। আভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কঠিন পরিস্থিতিতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ইতিহাসের বৃহৎ বাজেট ঘোষণা করতে হয়েছে। এটি অত্যন্ত সাহসী, দূরদর্শী ও দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে রোডম্যাপের বাজেট। বিএনপি সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে যে ১ ট্রিলিয়ন (লাখ কোটি) ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়েছে, তার যাত্রা শুরু এই বাজেটের মধ্য দিয়ে হয়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। প্রস্তাবিত এই বাজেট নিয়ে রাজনৈতিক দল এবং অর্থনীতিবিদরা জোরালো কোনো সমালোচনা করতে পারেনি। তারা বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জের কথা বলেছেন। যেকোনো বাজেট বাস্তবায়ন সব সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জের হয়ে থাকে। এমন কোনো বাজেট নেই, যার শতভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। লক্ষ্য ও প্রত্যাশার মধ্যে ঘাটতি থেকেই যায়। এর কারণ হচ্ছে, বাজেট বাস্তবায়নের সাথে প্রশাসন থেকে শুরু করে যেসব প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বরত ব্যক্তি জড়িত থাকেন, তাদের দক্ষতা, আন্তরিকতা, সময়ানুবর্তিতা ও সততার উপর বাজেট বাস্তবায়ন নির্ভর করে। এতে যখন ঘাটতি দেখা দেয়, তখনই বাজেট যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয় না। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটকে দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ‘বাস্তববাদ ও আশাবাদের দ্বন্দ্ব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, এর নীতিকাঠামো নিয়ে খুব বড় মতভেদ নেই। অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংকট ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতা বিবেচনায় অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করাই হবে সরকারের প্রথম কাজ। সরকারের ঘোষিত তিন ধাপের কর্মপরিকল্পনার প্রথম ধাপ অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আগে ভিত্তি দৃঢ় করতে হবে, তারপর লক্ষ্য অর্জনের দিকে এগোতে হবে। প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আগামী দিনগুলোতে অনেক আলোচনা ও মতামত বিশ্লেষকরা প্রকাশ করবেন। এটাই স্বাভাবিক। সংসদ অধিবেশনেও এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা হবে, সংশোধনের প্রস্তাব আসবে এবং তা গ্রহণ-বর্জন হয়ে চূড়ান্ত রূপ লাভ ও তার বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে। এর বাইরে সরকার দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সাথেও আলাপ করতে পারে। তবে এবারের বাজেট যে, জনবান্ধব, গণতান্ত্রিক ও মানবিকতার উপর ভিত্তি করে প্রণয়ন করা হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। সরকারকে এ বাজেট বাস্তবায়নে সময় দিতে হবে। এ বাজেটের মাধ্যমেই অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের রোডম্যাপ দিয়ে একটি যুগান্তকারী বাজেট উপস্থাপন করেছেন। এজন্য তাদেরকে মোবারকবাদ জানাই।

যে কথাটি সবসময়ই বলা হয়ে থাকে, বাজেট প্রণয়ন করাই বড় কথা নয়, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করার মধ্যেই তার সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। এবারের বাজেট দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করে সমৃদ্ধ অর্থনীতির স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে যাত্রা করার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে। এর জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। এই অর্থ জোগাড় করাই সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ। সরকার রাজস্বের মাধ্যমে যে ৬ লাখ ৯৫ হাজার টাকা জোগাড়ের লক্ষ্য নিয়েছে, স্বপ্ন বাস্তবায়নে তা অর্জন করতে হবে। ঘাটতি পূরণে আয় বাড়াতে হবে। এজন্য সুশাসন নিশ্চিতের বিকল্প নেই। সরকারকে ট্যাক্সের আওতা বাড়াতে হবে। ব্যবসা সহজ করার জন্য সরকার অনেক ক্ষেত্রে যেমন ট্যাক্স ছাড় দিয়েছে, তেমনি ট্যাক্সের আওতা বৃদ্ধিরও কথা বলেছে। এতে একটি চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স তৈরি হয়ে অর্থনীতি স্থিতিশীল হতে পারে। এ কথা সবসময়ই বলা হয়ে থাকে, বিশ কোটি মানুষের দেশে ট্যাক্স দেয় সামান্য সংখ্যক মানুষ। করযোগ্য আয় আছে এবং নিয়মিত কর দেয়, এমন মানুষের সংখ্যা ১৫ থেকে ১৬ লাখ। যদিও দেশে টিআইএন বা কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী বা নিবন্ধিত করদাতার সংখ্যা কোটির কাছাকাছি। তবে এদের মধ্যে বিশাল একটি অংশ করযোগ্য আয়ের মধ্যে পড়ে না বা রিটার্ন জমা দেয় না। সরকারকে বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে, এই করের আওতা বাড়াতে হবে। যারা আয় করে এবং করের আওতার বাইরে রয়েছে, তারা যাতে কর দেয়, এ ব্যাপারে রাজস্ব বোর্ডকে অধিক তৎপর হতে হবে। কর দেয়ার জন্য সকলকে উৎসাহিত করতে হবে। সবাই মিলে কর দিলে সরকারের আয় বাড়বে এবং বাজেট বাস্তবায়ন সহজ হবে। যেকোনো ধরনের দুর্নীতি ও লুটপাটের ব্যাপারে সরকারকে জিরো টলারেন্সে থাকতে হবে। যেসব ছোট-বড় প্রকল্প নেয়া হবে, সেগুলো যাতে সময়মতো শেষ হয় এবং অর্থের অপচয় না হয়, তা কঠোরভাবে মনিটর করতে হবে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সময়মতো প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়া নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছেন।কাজেই, প্রকল্প যাতে সময় মতো শেষ হয়ে তার সুফল জনগণ পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে হলে বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ যাতে আসে, সে পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ব্যবসা সহজীকরণ প্রক্রিয়া ও গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এই সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারলে বিনিয়োগ গতি পাবে না। যেসব দেশ প্রচুর বিনিয়োগ করে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় সেসব দেশকে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তুলতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ উন্নত বিশ্বের অনেক দেশ ব্যাপক পরিসরে বিনিয়োগ করে থাকে। এসব দেশের সাথে অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে বিনিয়োগ আনার উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারের রাজস্ব বাড়াতে গ্যাস-বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতে যেসব বকেয়া রয়েছে, তা আদায় করতে হবে। এসবের অবৈধ সংযোগ ও অপচয় রোধে কঠোর পদেক্ষেপ নিতে হবে। সরকার যে বাজেট পেশ করেছে, তা বাস্তবায়নে প্রশাসনসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত সকলকে নিরলস পরিশ্রম করতে হবে। ইতোমধ্যে সরকার মাঠপ্রশাসনসহ সর্বত্র তার লোকজন বসিয়েছে। বাজেট বাস্তবায়নে তাদেরকে কাজে লাগাতে হবে। তাদেরকে পদপদবীতে অলংকার হয়ে বসে থাকলে চলবে না। সরকার যে জনকল্যাণমুখী ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির লক্ষ্যে বাজেট দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে সকলকে সহযোগিতা করতে হবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews