আস্থা, অধিকার ও দূরত্বের রাজনীতি
১. সফরের রাজনীতি, প্রত্যাশার অর্থনীতি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশ সফর কখনোই কেবল বিদেশ সফর নয়। এর ভিতরে থাকে বার্তা, প্রতীক, কৌশল এবং কখনো কখনো ভবিষ্যতের রূপরেখাও। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে তাই শুধু একটি কূটনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে নতুন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান পুনর্নির্ধারণের একটি প্রচেষ্টা। বাংলাদেশ আজ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে প্রবৃদ্ধির ভাষণের চেয়ে কর্মসংস্থানের ভাষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ জানতে চায়, তাদের সন্তানের চাকরি কোথায়, কারখানার নতুন বিনিয়োগ কোথায়, রপ্তানির নতুন বাজার কোথায়।
একসময় উন্নয়ন মানে ছিল সেতু, ফ্লাইওভার, বিদ্যুৎকেন্দ্র। এখন উন্নয়ন মানে দক্ষতা, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান। যে রাষ্ট্র তার তরুণদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারে না, সে রাষ্ট্র যত বড় অবকাঠামোই নির্মাণ করুক, তার ভিত্তি দুর্বল থেকে যায়। চীন ও মালয়েশিয়া-দুটি দেশই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভিন্ন কারণে। মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের দরজা, আর চীন বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির উৎস। ফলে এই সফরের সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে কতটি যৌথ বিবৃতি স্বাক্ষরিত হলো, সেটি নয়; বরং কতজন তরুণ আগামী কয়েক বছরে কাজ পেল, কতটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বাস্তবে চালু হলো, সেটি। রাজনীতিতে অনেক সময় আমরা ছবি দেখি, ফলাফল দেখি না। বিমানবন্দরের লাল গালিচা দেখে মুগ্ধ হই, কিন্তু তিন বছর পর প্রকল্পের অগ্রগতি দেখি না।
রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় লিখেছিলেন, ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু।’ রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই। বিনিয়োগ আসে শুধু অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় নয়, রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও। বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রথমে দেখে সরকার কী বলছে, পরে দেখে সরকার কী করছে। আজকের বাংলাদেশকে তাই শুধু বন্ধু খুঁজলে হবে না; আস্থা অর্জন করতে হবে।
২. নদী, বন ও রাষ্ট্রের স্মৃতিভ্রংশ
একটি দেশের চরিত্র বোঝার সহজ উপায় হচ্ছে, সে তার প্রকৃতির সঙ্গে কেমন আচরণ করে। আমরা প্রায়ই পরিবেশ নিয়ে কথা বলি, কিন্তু আচরণ করি যেন পরিবেশ একটি বিলাসিতা। যেন নদী, বন, জলাভূমি বা
পাহাড়ের অস্তিত্ব অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে একটি বিরক্তিকর বাধা। সম্প্রতি বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে নদীদখল, বন উজাড়, পাহাড় কাটা, জলাভূমি ধ্বংস-সবকিছুই এখনো অব্যাহত। আইনের ভাষা আছে, নীতিমালা আছে, আদালতের নির্দেশনা আছে; নেই শুধু কার্যকর প্রয়োগ।
মজার বিষয় হলো, আমরা প্রায়ই প্রকৃতিকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখি। যেন নদীকে সরিয়ে দিলে উন্নয়ন সহজ হবে। অথচ প্রকৃতি শেষ পর্যন্ত তার হিসাব নিজেই বুঝে নেয়। বন্যা, জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহ, নদীভাঙন-এসব প্রকৃতির প্রতিশোধ নয়; এগুলো মানুষের ভুল পরিকল্পনার বিল। কিছুদিন আগে ঢাকার তাপমাত্রা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। শহর ক্রমশ উষ্ণ হয়ে উঠছে। গাছ কমছে, জলাধার কমছে, কংক্রিট বাড়ছে। আমরা ছায়া কেটে ভবন বানাচ্ছি, তারপর সেই ভবনে এয়ার কন্ডিশনার বসিয়ে গরম থেকে বাঁচার চেষ্টা করছি। এটি অনেকটা এমন, যেন কেউ নিজের ঘরের ছাদ খুলে ফেলে পরে ছাতা কিনতে যায়।
একজন পরিবেশবিদ একবার বলেছিলেন, ‘মানুষ প্রকৃতিকে রক্ষা করে না, প্রকৃতি মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।’ রাষ্ট্র যদি দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা হারায়, প্রথম ক্ষতিগ্রস্ত হয় পরিবেশ। আর পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় অর্থনীতি। তাই বিদেশি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও উন্নয়নের আলোচনা যত জরুরি, তত জরুরি নদী ও বন নিয়ে আলোচনা। কারণ প্রকৃতি ছাড়া অর্থনীতির কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
৩. শিক্ষা : ডিগ্রির বিস্তার, জ্ঞানের সংকোচন
বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তার হয়েছে-এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশ্ববিদ্যালয় বেড়েছে, শিক্ষার্থী বেড়েছে, সনদ বেড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, জ্ঞান কি বেড়েছে?
এটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন। কিন্তু প্রয়োজনীয়। আজকের অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় চাকরির প্রস্তুতির জন্য, শেখার জন্য নয়। অনেক শিক্ষকও গবেষণার চেয়ে প্রশাসনিক ব্যস্ততায় বেশি সময় দেন। আর অভিভাবকেরা শিক্ষাকে দেখেন বিনিয়োগ হিসেবে, যার রিটার্ন হবে একটি চাকরি। ফলে শিক্ষা একটি মানবিক প্রক্রিয়া না হয়ে ধীরে ধীরে বাজারজাত পণ্যে পরিণত হচ্ছে। কোচিং সংস্কৃতি তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা যথেষ্ট নয়, এই ধারণা এতটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক নিজেই নিজের ক্লাসের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। একটি অদ্ভুত চক্র তৈরি হয়েছে। বিদ্যালয় ছাত্রকে কোচিংয়ে পাঠায়, কোচিং আবার পরীক্ষার দিকে ঠেলে দেয়, আর পরীক্ষা মুখস্থবিদ্যার দিকে।
জীবনানন্দ দাশের কবিতা মুখস্থ করা যায়, কিন্তু জীবনানন্দকে বোঝা যায় না। শিক্ষার বর্তমান সংকটটি মূলত আস্থার সংকট। পরিবার শিক্ষাব্যবস্থাকে বিশ্বাস করে না, শিক্ষক শিক্ষার্থীকে বিশ্বাস করে না, শিক্ষার্থী নিজের সক্ষমতাকে বিশ্বাস করে না। একসময় বিশ্ববিদ্যালয় ছিল চিন্তার জায়গা। এখন অনেক ক্ষেত্রে তা সনদ উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। অথচ জ্ঞান অর্থনীতির যুগে একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মেধা। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়ার সাফল্যের পেছনে শুধু কারখানা নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ও কাজ করেছে। সুতরাং কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও উন্নয়নের যে আলোচনা প্রথম অংশে করেছি, তার ভিত্তি তৈরি হবে শিক্ষার ভিতরেই।
৪. দূরত্বের প্রয়োজনীয়তা
রাষ্ট্রের মতো মানুষের জীবনেও একটি মৌলিক সত্য আছে, সব শব্দের উত্তর দিতে হয় না। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন যোগাযোগের মাধ্যম বেড়েছে, কিন্তু বোঝাপড়া কমেছে। মানুষ আগের চেয়ে বেশি কথা বলে, কিন্তু কম শোনে। কিছু মানুষ কথোপকথনকে সম্পর্ক মনে করে। তারা কথা বলে বোঝার জন্য নয়, উপস্থিত থাকার জন্য। উত্তর চায় বোঝাপড়ার জন্য নয়, নিজেদের গুরুত্ব নিশ্চিত করার জন্য। সমস্যা হলো, প্রতিটি বার্তার উত্তর দিতে দিতে একসময় মানুষ নিজের ভিতরের নীরবতাকে হারিয়ে ফেলে।
আমরা প্রায়ই মনে করি, কাউকে বোঝাতে পারলেই শান্তি আসবে। বাস্তবে অনেক সময় শান্তি আসে বোঝানো বন্ধ করার পর। দূরত্ব মানেই শত্রুতা নয়। দেয়াল মানেই বিচ্ছিন্নতা নয়। অনেক দেয়াল তৈরি হয় সীমা নির্ধারণের জন্য। রাষ্ট্রেরও সীমান্ত আছে, সংসদেরও কার্যবিধি আছে, আদালতেরও এখতিয়ার আছে। কারণ সীমা না থাকলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনও তার ব্যতিক্রম নয়। যে সম্পর্ক সম্মান হারায়, সেখানে প্রবেশাধিকার ধীরে ধীরে অর্থহীন হয়ে যায়। কারণ সম্পর্কের ভিত্তি অধিকার নয়, সম্মান। অনেক সময় নীরবতা সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর। কারণ বিশৃঙ্খলা প্রায়ই প্রতিক্রিয়া খোঁজে। আপনি প্রতিক্রিয়া দেওয়া বন্ধ করলে তার শক্তিও কমে যায়। শান্তি কোনো বিতর্ক জিতে পাওয়া যায় না। শান্তি শুরু হয় তখন, যখন আপনি আর সবাইকে আপনার অবস্থান বোঝাতে বাধ্য বোধ করেন না।
শেষ কথা
এই সপ্তাহের চারটি ঘটনাকে আলাদা মনে হতে পারে। কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যাবে, চারটিই আসলে আস্থার গল্প। বিদেশ সফরে আমরা বিনিয়োগকারীর আস্থা চাই। পরিবেশ রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতার আস্থা চাই। শিক্ষায় জ্ঞান ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা চাই। আর ব্যক্তিগত জীবনে চাই পারস্পরিক সম্মানের আস্থা। যেখানে আস্থা থাকে না, সেখানে চুক্তি থাকে কিন্তু সম্পর্ক থাকে না; আইন থাকে কিন্তু ন্যায়বিচার থাকে না; বিশ্ববিদ্যালয় থাকে কিন্তু জ্ঞান থাকে না; কথোপকথন থাকে কিন্তু সংযোগ থাকে না। রাষ্ট্র হোক বা মানুষ-দুজনেরই সবচেয়ে বড় শক্তি ক্ষমতা নয়, আস্থা। আর সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞা হয়তো এই যে কখন কথা বলতে হবে এবং কখন নীরব থাকতে হবে-সেটি জানা। কারণ ইতিহাসের অনেক বড় পরিবর্তন শুরু হয়েছে বক্তৃতা দিয়ে। কিন্তু অনেক বড় বিপর্যয় এড়ানো গেছে নীরবতার মধ্য দিয়ে। কখনো কখনো দূরত্বই সম্পর্ককে বাঁচায়। কখনো সীমারেখাই স্বাধীনতাকে রক্ষা করে। আর কখনো নীরবতাই সবচেয়ে স্পষ্ট ভাষা হয়ে ওঠে।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ