বাংলাদেশে জেন-জির নেতৃত্বাধীন ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বিশ্বের প্রথম নির্বাচন শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ভোটাররা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ভোটের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। এই নির্বাচনে দেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থার জন্য এবারের নির্বাচনের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। গণঅভ্যুত্থানের কারণে দেশের বিভিন্ন শিল্প ও অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ে, তাই নির্বাচনের ফলাফল দেশ ও অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। ৩৯ বছর বয়সী মোহাম্মদ জোবায়ের হোসেন জানান, ২০০৮ সালের পর তিনি ভোট দিচ্ছেন এবং ১৭ বছর পর অবাধভাবে ভোট দিতে পারায় রোমাঞ্চিত।
বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক জোট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন দুটি জোট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। জনমত জরিপে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও প্রচারণা মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল।
বিগত সরকার আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় এবং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ভারতে নির্বাসনে থাকায় দেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে, কিছুটা শীতল হয়েছে। এ সুযোগে চীনের প্রভাব বিস্তার বেড়েছে। সমালোচকরা বলছেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে নির্বাচন হলেও বিরোধী দল ও ভোটারদের ওপর ভয়ভীতি প্রয়োগের অভিযোগ ছিল।
নির্বাচনে মোট ৩০০ আসনে ২ হাজারের বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। একজন প্রার্থী মারা যাওয়ায় এক আসনে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। মোট ৫০টির বেশি রাজনৈতিক দল নির্বাচনেও অংশ নিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, এই নির্বাচন নিয়মিত ভোট নয়; এটি গণজাগরণের সাংবিধানিক প্রকাশ। সংবিধান সংস্কারের জন্য একাধিক প্রস্তাবও ভোটে আনা হয়েছে, যার মধ্যে সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করা, নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার করা এবং প্রধানমন্ত্রী মেয়াদ সীমিত করার বিষয় রয়েছে।
নির্বাচনের দিন সারা দেশে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ভোটগ্রহণ শুরু হয় সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে এবং বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত চলবে। ভোট গণনা শুরু হবে বিকেলের পর এবং প্রাথমিক ফলাফল মধ্যরাতের দিকে পাওয়া যেতে পারে।
ভোটার তালিকায় নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ, যার ৪৯ শতাংশ নারী। মোট ভোটারের অর্ধেক বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। অনেকেই প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী দু’জন—বিএনপির তারেক রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীর শফিকুর রহমান।
ভোটাররা বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। কেউ কেউ খরচ ও সময়ের কারণে দ্বিধায় থাকলেও অনেকেই ভোট প্রদানে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। রিকশাচালক শাকিল আহমেদ বলেন, ‘‘হাসিনার সময় আমরা ভোট দিতে পারিনি, এবার এটা হাতছাড়া করব না।’’ এভাবে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে চলছে। তথ্যসূত্র : রয়টার্স