ধরুন, গভীর রাতে একজন চিত্রনাট্যকার একটি দৃশ্য লিখছেন। দৃশ্যটি লিখতে লিখতে হঠাৎ তাঁর নিজের জীবনের কোনো স্মৃতি এসে মিশে গেল চরিত্রটির সঙ্গে। তিনি বুঝলেন, এতক্ষণ যে গল্পটি কাগজে লিখছিলেন, এই জায়গায় এসে সেটি সত্যি হয়ে উঠেছে। হয়তো একটু অস্বস্তিকর সত্য, হয়তো রাজনৈতিক, হয়তো সম্পর্কের এমন একটি দিক, যা আমরা প্রকাশ্যে খুব সহজে বলতে চাই না। তিনি লিখলেন। কয়েক দিন পর চিত্রনাট্যটি গেল প্রযোজকের কাছে। প্রযোজক পড়লেন, বললেন, গল্প ভালো, তবে এই জায়গাটা একটু বদলানো যায় কি না? ভুল–বোঝাবুঝি হতে পারে। তিনি বদলালেন। পরে অভিনয়শিল্পী এলেন। চরিত্রটি পড়ে তাঁরও অস্বস্তি হলো। বললেন, এই দৃশ্যটা করলে আমাকে নিয়ে অযথা আলোচনা হতে পারে। নির্মাতা আবার একটু বদলালেন। ছবির সম্পাদনার সময় মনে হলো, এই সংলাপটাও না হয় বাদ দেওয়া যাক। প্রদর্শনের আগে আরেকটি দৃশ্য ছোট হলো। শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রটি তৈরি হলো, কিন্তু যে সত্যটি থেকে গল্পটির জন্ম হয়েছিল, সেটি পথে পথে একটু একটু করে সম্পাদিত হতে হতে অনেকটাই হারিয়ে গেল।
এই গল্পটি কাল্পনিক। কিন্তু একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে এর মনস্তত্ত্ব আমার কাছে খুবই পরিচিত। কারণ, আমরা এমনিতেই একটি বহুল সম্পাদিত সমাজে বাস করি। পরিবারে একধরনের সম্পাদনা, সামাজিক জীবনে আরেক ধরনের, রাজনীতিতে আরেক ধরনের, শিল্পে আরেক ধরনের। তার ওপর একজন সৃষ্টিশীল মানুষ যদি গল্প লেখার সময় থেকেই ভাবতে শুরু করেন কে মামলা করতে পারেন, কোন গোষ্ঠী আপত্তি তুলতে পারে, কোন দৃশ্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচারসভা বসতে পারে, কোন বিষয় প্রযোজকের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে, তাহলে কোনো আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই তাঁর মাথার মধ্যে একজন অদৃশ্য সম্পাদক বসে যান। আমার কাছে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় বিপদটি এখানেই।