৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবক্ষয় ঘটেছে। একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড, প্রকাশ্য দিবালোকে ছিনতাই, বেপরোয়া চাঁদাবাজি, মাদক কারবার এবং বীভৎস ধর্ষণের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কারামুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণের মরণনেশায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এখন জনসাধারণের জন্য অনিরাপদ ও ভীতিকর হয়ে উঠেছে।
অভিযোগ উঠেছে, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং চিহ্নিত অপরাধীদের গ্রেফতারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দৃশ্যত ব্যর্থ। এমনকি চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করতে গিয়ে বা রাজনৈতিক আধিপত্যের জেরে প্রকাশ্যে খুনের শিকার হচ্ছেন খোদ রাজনৈতিক কর্মীরাও।
আন্ডারওয়ার্ল্ডে জেলমুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের রক্তাক্ত লড়াই
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘকাল কারাবাস শেষে একে একে জামিনে মুক্তি পেয়েছে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসী। জেল থেকে বেরিয়েই এরা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও ডিশ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ফলে দীর্ঘদিনের সুপ্ত আন্ডারওয়ার্ল্ড আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে এবং শুরু হয়েছে একের পর এক নৃশংস ও রক্তাক্ত খুনোখুনি। খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নমনীয়তা এবং অপরাধীদের দমনে দৃশ্যমান ব্যর্থতার কারণে ঢাকার বেশ কিছু এলাকা এখন সাধারণ মানুষের জন্য ‘মৃত্যুকূপ’ ও চরম আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে।
আন্ডারওয়ার্ল্ডের রক্তাক্ত যুদ্ধ : সাম্প্রতিক সহিংসতা
দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর কারাগার থেকে মুক্ত হওয়া সন্ত্রাসীরা মাঠে নামার পর রাজধানীতে নতুন করে গ্যাং-ওয়ার বা দলীয় কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
কাইল্ল্যা পলাশের ওপর প্রকাশ্য হামলা (রামপুরা) : গত শুক্রবার রাজধানীর রামপুরা এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে গুলিবিদ্ধ হন এক সময়ের কুখ্যাত আন্ডারওয়ার্ল্ড ত্রাস ইয়াসিন খান পলাশ ওরফে ‘কাইল্ল্যা পলাশ’। তিনি যুবদল নেতা মিজান হত্যাসহ অসংখ্য চাঞ্চল্যকর মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। দীর্ঘ ২৪ বছর কারাদণ্ড ভোগের পর মাত্র এক মাস আগে জামিনে মুক্তি পান পলাশ। জেল থেকে বেরিয়েই রামপুরা-খিলগাঁও এলাকার আধিপত্য ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে নামেন তিনি। অভিযোগ উঠেছে, তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ‘কাইল্ল্যা মাসুদ’ গ্রুপ তাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই এই সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন হত্যাকাণ্ড (ধানমন্ডি): সম্প্রতি ধানমন্ডি এলাকায় প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন আন্ডারওয়ার্ল্ডের আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন। নিহতের পরিবারের দাবি, ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর এলাকার ফুটপাথ, ডিশ ব্যবসা ও পরিবহন চাঁদাবাজির একক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে কুখ্যাত ‘পিচ্চি হেলাল’ গ্রুপ পরিকল্পিতভাবে টিটনকে খুন করেছে।
‘আতঙ্কের নগরী’ ঢাকা : অবরুদ্ধ যেসব এলাকা
রাজধানীর বেশ কিছু এলাকা এখন ছিনতাইকারী, মাদককারবারি এবং গ্যাংস্টারদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এসব এলাকায় দিন-দুপুরে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা ও মালামাল লুটের ঘটনা ঘটছে, অথচ কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম:
মোহাম্মদপুর ও শ্যামলী : কিশোর গ্যাং ও মাদককারবারিদের উপদ্রবে এই দুই এলাকার বাসিন্দারা সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন।
যাত্রাবাড়ী ও মুগদা : মহাসড়ক ও সংযোগ সড়কগুলোতে গভীর রাত তো বটেই, দিন-দুপুরেও দেশীয় অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সর্বস্ব লুটে নেয়া হচ্ছে।
পুরান ঢাকা ও কামরাঙ্গীরচর : গলি ও সরু রাস্তাগুলোতে চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর আধিপত্য বিস্তারের মহড়া নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
সামাজিক অবক্ষয় : অব্যাহত নারী ও শিশু নির্যাতন
আইনশৃঙ্খলার এই চরম সঙ্কটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়েছে নারী ও শিশুরা। সম্প্রতি শিশু ‘রামিসা’ ধর্ষণের মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হলেও, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় ঢাকা ও এর আশপাশ এলাকায় একের পর এক ধর্ষণের খবর মিলছে। প্রশাসনের নজরদারির অভাব এবং সামাজিক অস্থিরতাকে এর জন্য দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশিষ্ট নাগরিক ও নাগরিক সমাজের উদ্বেগ
আইনশৃঙ্খলার এই নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার ও সামাজিক সংগঠন।
সেবা বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বলেন : ‘দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। মানুষের জান-মাল চরম হুমকির মুখে এবং নাগরিক জীবন অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত। যে গভীর প্রত্যাশা ও রক্তের বিনিময়ে ২৪-এর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লব ঘটেছিল, বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যর্থতার কারণে তা ভণ্ডুল হতে চলেছে। এই জাতীয় সঙ্কট উত্তরণে অবিলম্বে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ব্যতিরেকে দেশের সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটি ‘জাতীয় কনভেনশন’ বা সর্বদলীয় বৈঠকের আয়োজন করা জরুরি। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে (প্রধান উপদেষ্টা) অবিলম্বে এই উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’
একই সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক মূল্যায়নে। টিআইবির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে, যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা অসম্ভব।
বিপরীতমুখী অবস্থানে প্রশাসন : দায়িত্ব এড়ানোর অভিযোগ
জনসাধারণের তীব্র আতঙ্ক ও নাগরিক সমাজের উদ্বেগের বিপরীতে প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের বক্তব্যে উদাসীনতা ও ভিন্ন সুর লক্ষ করা গেছে:
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য : সম্প্রতি একটি সরকারি অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (বা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা) দাবি করেছেন, ‘গত বছরের তুলনায় এ বছরে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।’ সাধারণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে প্রশাসনের এই দাবির কোনো মিল নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতা : উদ্ভূত পরিস্থিতি, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা জানতে পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসনের জবাবদিহিতার অভাবকে আরো স্পষ্ট করে তোলে।
পর্যালোচনা ও সুপারিশ
২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই পুনরুত্থান এবং শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অবাধ বিচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অবিলম্বে কঠোর হতে হবে। কোনো প্রকার রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অনুকম্পা না দেখিয়ে কাইল্ল্যা পলাশ, কাইল্ল্যা মাসুদ কিংবা পিচ্চি হেলাল গ্রুপের মতো অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার এবং বিশেষ যৌথ অভিযানের মাধ্যমে ঢাকার প্রতিটি পাড়া-মহল্লাকে নিরাপদ করা এখন সময়ের দাবি।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রতিক নৃশংসতার চিত্র
বিগত দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘটে যাওয়া কয়েকটি লোমহর্ষক অপরাধের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
ক. মুন্সীগঞ্জে মা-মেয়েকে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা
শহরের জমিদারপাড়া এলাকায় সৌদি প্রবাসী জনি ইসলামের বাড়িতে ঢুকে তার স্ত্রী রিতা মণি ইসলাম (৩০) এবং অষ্টম শ্রেণীতে পড়ুয়া মেয়ে জান্নাতুল ইসলাম রিধিকে (১১) ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা। গুরুতর আহত অবস্থায় বর্তমানে তারা মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
খ. চট্টগ্রামে মা-মেয়ে খুন, শিশুসন্তান গুরুতর আহত
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের চেনামতি বড়ুয়া পাড়ায় নিজ বাড়িতে নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন এনি বড়ুয়া (৪০) ও তার কিশোরী মেয়ে প্রিয়ন্তী বড়ুয়া (১৬)। এ সময় তাদের পাঁচ বছরের শিশুসন্তান পিয়াস বড়ুয়াকে গুরুতর জখম করা হয়। নিহতের স্বামী সুজন বড়ুয়ার দাবি, প্রতিবেশী লিমন বড়ুয়ার সাথে আর্থিক লেনদেনের বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। আনোয়ারা থানা পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে।
গ. খুলনায় মসজিদে ঢুকে নামাজরত মুসল্লিদের ওপর গুলি
খুলনা মহানগরীর দৌলতপুর কাশিপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র জামে মসজিদে ফজরের নামাজ চলাকালীন মোটরসাইকেলে এসে দুর্বৃত্তরা এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতরত মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি ও তেল ব্যবসায়ী লোকমান হাকিম (৪৫) এবং মুসল্লি আলম মন্ডল (৫৫) গুলিবিদ্ধ হন। লোকমানের মাথায় চারটি গুলি লাগায় আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
ঘ. রাজধানীতে প্রতিবাদ করায় রাজনৈতিক নেতা খুন
রাজধানীর মৌচাক এলাকায় শত শত মানুষের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয় ঢাকা মহানগরী স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লালকে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে ৮৫টি রাজনৈতিক মামলার ধকল সামলানো বিল্লালকে শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্য চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে হলো।
নারীর ওপর পাশবিকতা : নোয়াখালী ও ঠাকুরগাঁওয়ে ধর্ষণ
আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী ও শিশুরা চরম অবমাননা ও সহিংসতার শিকার হচ্ছে।
নোায়াখালী (কোম্পানীগঞ্জ) : চরএলাহী ইউনিয়নের চরবালুয়া গ্রামে গভীর রাতে ঘরের টিন কেটে প্রবেশ করে দুই সন্তানের জননী এক গৃহবধূকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে তারেক নামের এক যুবক। পরবর্তীতে স্থানীয় জনতা তাকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে।
ঠাকুরগাঁও : ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে বেড়ানোর কথা বলে ডেকে নিয়ে সারা রাত ধরে গণধর্ষণ করে তার প্রেমিক তামিম (২২) এবং তার দুই বন্ধু রনি (২১) ও মাসুদ (২২)। পুলিশের টহল দল টের পেয়ে গোডাউন ঘর থেকে আসামিদের হাতেনাতে গ্রেফতার করে এবং ভুক্তভোগীকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করে।
গভীর পর্যবেক্ষণ : রাউজানের ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ ও দলীয় কোন্দল
বিগত ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকে উত্তর চট্টগ্রামের রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া এলাকা অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১০ মাসে কেবল রাউজান এলাকাতেই ২৫টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
অপরাধের নেপথ্য কারণ ও নিয়ন্ত্রণের উৎস
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভৌগোলিক কৌশলগত অবস্থানের কারণে রাউজান চোরাচালানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাউজানের অপরাধ ও খুনোখুনির পেছনে মূলত নি¤েœাক্ত কারণগুলো দায়ী :
অবৈধ চোরাচালান ও মাদক : রাঙ্গামাটি ও কাপ্তাই সড়ক দিয়ে চোলাই মদ ও কাঠের অবৈধ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ।
অর্থনৈতিক উৎস : বালুমহাল দখল, অবৈধ পাহাড় ও মাটি কাটা এবং জলাশয় ভরাট।
প্রবাসী চাঁদাবাজি : প্রবাসীরা নতুন বাড়ি নির্মাণ করতে গেলে নির্দিষ্ট গ্রুপ থেকে ইট-বালু-রড-সিমেন্ট কিনতে বাধ্য করা।
টেন্ডারবাজি : রাউজান তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র ও চুয়েটের কোটি কোটি টাকার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ।
প্রধান দু’টি সন্ত্রাসী গ্রুপ ও তাদের প্রভাব
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মতে, মূলত দু’টি প্রবাসী ও স্থানীয় গডফাদারের কোন্দলে রাউজান আজ রক্তাক্ত।
১. জসিম গ্রুপ : দুবাই প্রবাসী হাজী জসিমের নেতৃত্বে রায়হান, ইলিয়াস, ডেভিড ইমন ও ছোটনরা সক্রিয়।
২. ফজল হক গ্রুপ : সাবেক এনডিপি ক্যাডার ফজল হকের অনুসারী জানে আলম, কামাল, মাহমুদ, ডাকাত আলম ও রমজানরা সক্রিয়।
সর্বশেষ নির্মমতা : যুবদল নেতা মাসুদ খুন
গত শনিবার রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্য দিবালোকে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক মাসুদ চৌধুরীকে (৪৫) ৬-৭ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী সিএনজি অটোরিকশায় এসে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে হত্যা করে। সিসিটিভি ফুটেজে তিনজনের হাতে পিস্তল ও দু’জনের হাতে শটগান দেখা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, কর্ণফুলী নদী থেকে বালু উত্তোলন ও আসন্ন ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জসিম গ্রুপের সন্ত্রাসীরা ফজল হকের সাথে যুক্ত হওয়া মাসুদকে হত্যা করেছে।
প্রশাসনের বক্তব্য ও বর্তমান পরিস্থিতি
জনগণের চরম উদ্বেগ এবং আইনশৃঙ্খলার এই নাজুক পরিস্থিতির মুখে প্রশাসনের ভূমিকা ও বক্তব্য নিম্নরূপ :
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মো: মাসুদ আলম জানান, ‘রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রক্রিয়াগত কারণে কিছুটা দেরি হলেও ইতোমধ্যে মাসুদ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজন একজনকে আটক করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বাকিদেরও চিহ্নিত করার কাজ চলছে।’
অন্য দিকে, রাউজান থানার ওসি ঘটনার পর থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলেও পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অপরাধীরা কদলপুরের পাহাড়ি পথ দিয়ে পালিয়েছে এবং তাদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর নাম ব্যবহার করে অপরাধীরা যেভাবে জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে, তাতে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভাবমূর্তি চরম সঙ্কটের মুখে পড়ছে। সাধারণ মানুষের দাবি, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং খুনি-ধর্ষকদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ও দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। অন্যথায়, জনমনে সৃষ্ট এই গভীর ক্ষোভ ও আতঙ্ক অদূর ভবিষ্যতে আরো বড় সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।