এক সময় মাদক মানেই ছিল টেকনাফের নাফ নদ কিংবা হিলির দুর্গম সীমান্ত এলাকা। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে সেই চিত্র এখন আমূল বদলে গেছে। মাদককারবারিরা এখন প্রথাগত রুট ছেড়ে বেছে নিয়েছে ডিজিটাল মাধ্যম আর কুরিয়ার সার্ভিসের ছদ্মবেশ। বাংলাদেশের মাদক চোরাচালানের মানচিত্র এখন আপনার হাতের স্মার্টফোনের স্ক্রিন আর কুরিয়ার সার্ভিসের পার্সেলের আড়ালে আপনার শোবার ঘর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের সর্বশেষ তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, মাদক পাচারের এই ‘ডোরস্টেপ ডেলিভারি’ মডেল জনস্বাস্থ্যের জন্য এক ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করেছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ১৮টি সীমান্তবর্তী জেলার অন্তত ১৫০টি সক্রিয় পয়েন্ট দিয়ে মাদক ঢুকলেও সেগুলোর বড় অংশই এখন কুরিয়ার ও অনলাইন অর্ডারের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। ইয়াবা ও হেরোইনের মতো প্রথাগত মাদকের চেয়ে এখন আইস (ক্রিস্টাল মেথ), এলএসডি, এমডিএমএ ও কেটামিনের মতো সিনথেটিক মাদকের বিস্তার ঘটছে উদ্বেগজনকভাবে।
গত এপ্রিলে একটি কুরিয়ার কনটেইনার ট্রাক থেকে তিন হাজার ৬০০ বোতল নেশাজাতীয় সিরাপ জব্দ করা হয়, যা অনলাইন ডেলিভারি পার্সেলের আড়ালে লুকানো ছিল। গত মার্চ মাসে উত্তরার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তিনজন চীনা নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়, যারা ব্লুটুথ স্পিকারের ভেতরে তরল কেটামিনকে পাউডারে রূপান্তর করে পাচারের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এ ছাড়াও বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে তৈরী পোশাকের চালানের ভেতর থেকে ১২ কেজি ইয়াবার কাঁচামাল ‘অ্যামফিটামিন’ উদ্ধার করা হয়, যা অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার কথা ছিল।
অন্য দিকে গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর টঙ্গীর একটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস সেন্টারে তল্লাশি চালিয়ে স্তম্ভিত হয়ে যান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) কর্মকর্তারা। ইতালিগামী একটি পার্সেলের ভেতর ছিল সাতটি সাদা তোয়ালে, যা আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও আসলে ছিল মরণনেশা কেটামিনে ভেজানো। তোয়ালেগুলো থেকে উদ্ধার করা হয় প্রায় ৬০ কোটি টাকা মূল্যের ছয় কেজি তরল কেটামিন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্তমানে মাদক সিন্ডিকেটগুলো সরাসরি লেনদেনের ঝুঁকি এড়াতে কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করছে। খেলনা, ব্যক্তিগত প্রসাধনী এবং নিত্যপণ্যের আড়ালে মাদক পার্সেল করে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডার্ক ওয়েবে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে মাদকের অর্ডার বাড়ছে। নতুন প্রজন্মের মাদকের অন্তত ৯০ শতাংশ লেনদেন হয় অনলাইনে। মাদককারবারিরা এখন ফেসবুক মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা টেলিগ্রামের মতো এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগে মাদক ব্যবহারের হার এখন দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। মাদকাসক্ত তরুণরা ছিনতাই, চুরি ও হত্যার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, সিনথেটিক মাদকগুলো দ্রুত আসক্তি তৈরি করে এবং ব্যবহারকারীর স্নায়ুতন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি করে। দেশের ৮২ লাখ মাদকসেবীর মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ চিকিৎসাসেবা পায়, বাকি ৮৭ শতাংশই অগোচরে থেকে যায়।
ইউনাইটেড ন্যাশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ইউএনসিটিএডি) তথ্যানুসারে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৪৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থাৎ প্রায় পাঁচ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা মাদক কেনাবেচার কারণে পাচার হয়ে যায়। শুধুমাত্র ইয়াবা ব্যবসার বার্ষিক বাজারমূল্য প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা বলে ধারণা করা হয়। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৮৩ লাখ নিয়মিত মাদকসেবী রয়েছে। তাদের মধ্যে একটি বড় অংশই পুরুষ এবং তরুণ প্রজন্ম।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সূত্র মতে, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে মাদক পাচার শনাক্ত ও রোধে একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা মেনে প্রতিটি পার্সেল বুকিংয়ের সময় প্রেরক ও প্রাপকের নাম, পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা, ছবি এবং জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই ও সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আঞ্চলিক ও কেন্দ্রীয়পর্যায়ে আধুনিক ড্রাগ ডিটেকশন মেশিন ও স্ক্যানার স্থাপন করতে হবে এবং প্রতিটি কেন্দ্রকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় এনে কমপক্ষে এক মাসের ভিডিও ফুটেজ সংরক্ষণ করতে হবে। কোনো পার্সেল সন্দেহজনক মনে হলে তা খুলে পরীক্ষা করতে হবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর বা নিকটস্থ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করতে হবে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলেন, সিনথেটিক মাদক আগামী কয়েক বছরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। শুধু অভিযান দিয়ে নয়, বরং চাহিদা কমানো এবং ব্যাপক জনসচেতনতা ছাড়া এই সঙ্কট মোকাবেলা অসম্ভব। মাদক এখন আর শুধু সীমান্তের কাঁটাতারের গল্প নয়; এটি আপনার বাড়ির দরজার কড়া নাড়া এক নিঃশব্দ ঘাতক। এখনই প্রতিরোধ না গড়লে এই অনলাইন ডেলিভারি নেটওয়ার্ক আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকার গহ্বরে নিয়ে যাবে। দেশে অনেক কুরিয়ার সার্ভিসের বৈধ লাইসেন্সও নেই, এতে করে তদারকিকে আরো কঠিন করে তুলছে।
কুরিয়ারের মাধ্যমে এই ক্রমবর্ধমান পাচার ঠেকাতে গত ২৭ জুন জাতীয় সংসদে ’মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল ২০২৬’ উত্থাপন করা হয়েছে। এই আইনে কুরিয়ার সার্ভিস ও সাইবার স্পেস ব্যবহার করে মাদক পাচারের বিরুদ্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন ও কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তার সাথে কথা বললে তিনি নয়া দিগন্তকে জানান, গ্রাহক যখন কোনো পণ্য আমাদের কাছে দিয়ে যান, তখন প্রতিটি পণ্য আমাদের কেন্দ্রীয় হাবে পাঠানো হয় এবং হাবে প্রবেশের সময় প্রতিটি মালামাল বাধ্যতামূলকভাবে স্ক্যান করা হয়। স্ক্যানিং চলাকালীন যদি কোনো পার্সেলের ভেতর সন্দেহজনক বা অবৈধ কিছু ধরা পড়ে, তবে আমরা সাথে সাথে সেটি আটকে দিই। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আমাদের ম্যানেজমেন্ট সরাসরি হস্তক্ষেপ করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হয়। আমরা শুধু মালামাল জব্দ করেই ক্ষান্ত হই না, বরং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রেও পূর্ণ সহযোগিতা করি ।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মেহেদী হাসান নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কুরিয়ার সার্ভিসগুলোকে সতর্ক করে আসছি, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তারা এসব নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করছে না। বর্তমানে কুরিয়ার সার্ভিসগুলো মাদক চলাচলের একটি সহজ মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো তারা আমাদের নির্ধারিত কেআইসিএস পদ্ধতি মানছে না।
তিনি আরো বলেন, অধিকাংশ কুরিয়ার সার্ভিসে আধুনিক স্ক্যানার নেই, আবার যাদের আছে তারাও অনেক ক্ষেত্রে মালামাল স্ক্যান করতে অনীহা প্রকাশ করে। এ ছাড়া বর্তমানে অনিবন্ধিত ও নামে-বেনামে কুরিয়ার সার্ভিসের সংখ্যা এত বেশি বেড়ে গেছে যে তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক সময় দেখা যায়, এই অপরাধগুলোর সাথে কুরিয়ার সার্ভিসের নিজস্ব কিছু অসাধু লোকও জড়িত থাকে। যেহেতু মালামালগুলো প্যাকেটে মোড়ানো থাকে, তাই স্ক্যানিং ছাড়া ভেতর কী আছে- মাদক না অন্য কিছু তা বোঝা অসম্ভব। যদি প্রতিটি কুরিয়ার সার্ভিসে বাধ্যতামূলকভাবে মালামাল চেক করা এবং আধুনিক স্ক্যানিং পদ্ধতি কার্যকর করা যায়, তবেই এই রুটে মাদকের আদান-প্রদান বা চালান বন্ধ করা সম্ভব হবে।