সম্প্রতি বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে, বছরে প্রায় পাঁচ থেকে আট লাখ বাংলাদেশী বিদেশে চিকিৎসাসেবা নিয়ে থাকেন। যার আর্থিক মূল্যমান প্রায় পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, বাংলাদেশী টাকায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বাজেটের প্রায় দেড়গুণ অর্থ এভাবেই প্রতি বছর শুধু বিদেশে চিকিৎসাসেবার জন্য ব্যয় হয়ে থাকে। অবশ্য এটি সঠিক কোনো হিসাব নয়। এটি হিসাব করা হয়েছে রোগীপ্রতি গড়ে পাঁচ হাজার ডলার ব্যয়ের হিসাব ধরে। বাস্তবে এর চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় হয়ে থাকে, যা মূলত অবৈধভাবে হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো হয়; সে হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে থাকার কথা নয়। স্থানীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা, চিকিৎসকদের প্রতি আস্থার অভাব এবং ওয়ান স্টপ চিকিৎসাসেবার অভাবেই রোগীরা দেশের বাইরে পা বাড়ান।

অটল বিহারি বাজপেয়ি তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিস রোগে ভুগছেন। চিকিৎসকরা পরামর্শ দিলেন হাঁটু প্রতিস্থাপন করতে হবে। এ জন্য তাকে বিদেশে যেতে হবে। তিনি এ প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে চিকিৎসকদের একটি দলকে হাঁটু প্রতিস্থাপনের ওপর প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে পাঠালেন। দলটি প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে আসার পর বাজপেয়ি নিজ দেশে হাঁটু প্রতিস্থাপনের প্রথম রোগী হিসেবে অপারেশন করান।

আধুনিক মালয়েশিয়ার জনক ডাক্তার মাহাথির মোহাম্মদ তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি হৃদযন্ত্রের অসুস্থতায় আক্রান্ত হলে প্রয়োজন দেখা দেয় অস্ত্রোপচারের। এজন্য তাকে দেশের বাইরে যেতে হবে। তিনি তার চিকিৎসক দলকে জিজ্ঞাসা করলেন, দেশে অপারেশন করা সম্ভব কি-না। জবাব ছিল, এ ধরনের অস্ত্রোপচার করার যোগ্যতাসম্পন্ন চিকিৎসক দেশে নেই। তিনি তাৎক্ষণিক পুরো কার্ডিয়াক সার্জারি টিম প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে পাঠিয়ে দেন। দলটি প্রশিক্ষণ শেষে দু’বছর পর দেশে ফিরলে তিনি তাদের দিয়ে নিজের অপারেশন করান। এই দু’টি ক্ষেত্রেই সরকারপ্রধানের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত দেশ দুটোকেই আজ হেলথ ট্যুরিজমের কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

বাংলাদেশে ঘটেছিল এর বিপরীত। অধ্যাপক ইবরাহিম, অধ্যাপক নুরুল ইসলাম ও অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মতো প্রখ্যাত চিকিৎসক থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপ্রধান সর্দিজ্বর চিকিৎসার জন্য মস্কো গিয়েছিলেন। এই একটি ঘটনার মাধ্যমে সেদিন এ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ও চিকিৎসক সমাজের প্রতি আস্থাহীনতার যে উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছিল, তার জের আজও চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রায়ই দেখা যায়, রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের অপচেষ্টায় চিকিৎসক সমাজ এবং জনসাধারণকে মুখোমুখি করা হয়েছে। চিকিৎসকদের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি করার জন্য লাগাতার প্রচারণা চালানো হয়েছে। পরিণতিতে রোগীদের মধ্যে দেশের বাইরে যাওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে, যা আজ মহাপ্লাবনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকা প্রবাসীরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় দেশে এসে বিভিন্ন চিকিৎসা নিচ্ছেনÑ এমন ভূরিভূরি উদাহরণ রয়েছে, যা দেশের চিকিৎসাসেবার প্রতি গভীর আস্থার পরিচায়ক।

রোগীদের দেশের বাইরে যাওয়ার দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে আকাশচুম্বী চিকিৎসা ব্যয়। এর প্রধান কারণ হচ্ছেÑ চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ওষুধের কাঁচামালের ীপর করারোপ। অন্যান্য দেশে চিকিৎসা ব্যয় সীমিত রাখার লক্ষ্যে এসব সামগ্রীর ওপর শূন্য কর এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে ভর্তুকি দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। বিশেষ করে ক্যান্সার, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিসসহ জীবন রক্ষাকারী ওষুধের ক্ষেত্রে। দেশে এমন ব্যবস্থা নেই।

তৃতীয়ত, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত দক্ষ জনশক্তির অভাব। সরকার দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করছেন রাজনৈতিক বিবেচনায়। একটি উদাহরণ দিলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। বর্তমানে যেসব মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে তার ১০-১২টি ছাড়া কোনোটিতেই প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই, প্রয়োজনীয় শিক্ষা-সরঞ্জাম নেই, অথচ ডাক্তার তৈরি হচ্ছে। এটি ভবিষ্যতে এদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরো নেতিবাচক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা কি-না ভাবার যথেষ্ট অবকাশ আছে। এখনো মন্ত্রী-আমলা বড় বড় ব্যবসায়ী অসুস্থ হলেই ছোটেন দেশের বাইরে। এতে জনসাধারণ এ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি আরো বেশি আস্থাহীন হয়ে ওঠেন। অথচ যাদের প্রতি তারা আস্থাহীনতার ভাব দেখান, তারাই করোনাকালীন সময়ে দেশের চিকিৎসার দায়ভার সুষ্ঠুভাবে পালন করেন। অনেক ক্ষেত্রে জীবনের বিনিময়ে।

চতুর্থত, চিকিৎসা পেশাকে রাজনীতিকীকরণের মাধ্যমে মেধার অব মূল্যায়ন করা হয়, যে কারণে প্রয়োজনীয় দক্ষ শিক্ষক ও জনশক্তি তৈরি হতে পারছে না। এর মূল্য দিতে হচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষকে, বিশেষ করে সেসব প্রবাসী ভাইবোন বিদেশে প্রাণান্তকর চেষ্টার মাধ্যমে অর্জিত মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠান। চিকিৎসা ক্ষেত্রে এই নৈরাজ্য বন্ধ করতে না পারলে চিকিৎসা অবকাঠামো এবং যতটুকু চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনো টিকে আছে, একসময় তাও হারিয়ে যাবে। এক্ষেত্রে সরকারের বাস্তবমুখী নীতিমালা ও পদক্ষেপ যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন জনসচেতনতা। এ ব্যাপারে প্রথমেই প্রয়োজন বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের নীতিমালা, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের চিকিৎসার উদ্দেশে দেশের বাইরে যাওয়া সীমিত করা এবং দেশে চিকিৎসার প্রয়োজনীয় জনশক্তি প্রশিক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা। চিকিৎসা ব্যয়ভার কমানোর জন্য চিকিৎসা কার্ড প্রবর্তন করা যায় কি-না, বিশেষ করে ক্যান্সার-জাতীয় রোগের জন্য তা ভেবে দেখা দরকার। চিকিৎসা প্রার্থীদের বিদেশ গমন রোধের জন্য দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা সৃষ্টি করা। এ দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ

[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews