১৯৭১ সালের ১৮ নভেম্বর আওয়ামী লীগ কলকাতার সল্ট লেকে শরণার্থী শিবিরে এক জনসভার আয়োজন করে। সেখানে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মীজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘বিশ্বে একটি মাত্র দেশ ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র আছে তা হলো ভারত। আওয়ামী লীগের মেনিফেস্টোও তাই। আমরা ইতোমধ্যেই মুক্ত এলাকায় ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সমাজবাদ কায়েমের কাজ শুরু করে দিয়েছি।’ (কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘জয় বাংলা’ পত্রিকা, ১৯ নভেম্বর, ১৯৭১)
শেখ মুজিবুর রহমান ১০ এপ্রিল ১৯৭২-এ পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফেরার পথে দিল্লিতে যাত্রাবিরতি করেন। সেখানে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে এক জনসভায় ভাষণ দেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি সেকুলারিজমে— আমি বিশ্বাস করি গণতন্ত্রে— আমি বিশ্বাস করি সোশ্যালিজমে। আমাকে প্রশ্ন করা হয়— শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সাথে আপনার আদর্শে এত মিল কেন? আমি বলি— এটি আদর্শেও মিল— এটি নীতির মিল— এটি মনুষ্যত্বের মিল— এটি বিশ্ব শান্তির মিল।’ (উপেন তরফদার, বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ, জুন ২০০০, ঢাকা)
উল্লিøখিত ঐতিহাসিক তথ্যগুলো থেকে প্রতীয়মান হয়, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি স্বীকৃতি আদায় এবং ভারতকে খুশি করতে তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ গ্রহণ করে। কিন্তু সংবিধান যেহেতু একটি রাষ্ট্রের জনগণের সামাজিক চুক্তির বহিঃপ্রকাশ, সেহেতু তার প্রতি জনগণের মতামত গ্রহণের বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু চারটি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বিষয়ে আওয়ামী লীগ জনগণকে কখনো জানায়নি। এমনকি ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন করার পর গণভোটের আয়োজন করা হয়নি। এটি ছিল ওই সংবিধানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। বস্তুত রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি— গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ ছিল ভারতকে খুশি করতে বাংলাদেশের জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া একটি অপপ্রয়াস। এ কথার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব আবুল ফাতেহের কথায়। তিনি বলেন, Secularism came by compulsion because Mujibnagar Government (the Provisional Government) was in India and heavily dependent on India for moral, material and diplomatic support. (পিনাকী ভট্টাচার্য, মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম)
১৯৭২ সালের সংবিধানে বাংলাদেশের নাগরিকদের বাঙালি বলে অভিহিত করার মধ্য দিয়ে একটি বড় ধরনের ভুলের সূচনা করা হয়েছিল। বাঙালি ও বাংলাদেশী পরিভাষার তাৎপর্যগত মৌলিক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের উপজাতিদের ‘বাঙালি’ হয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সংবিধান বিলে বলা হয়েছিল— বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হবে। সরকারদলীয় একজন সদস্য এক প্রস্তাবে এর পরে যোগ করতে চাইলেন ‘বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন’। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলেন, পার্বত্য এলাকার অধিবাসীরা বাঙালি নয়; বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে তারা নিজেদের বাংলাদেশী বলে বিবেচনা করে। এই সংশোধনী গ্রহণ করলে চাকমা জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু সংসদ সদস্যরা এক কথায় সংশোধনীটি সমর্থন করলেন। এটি গৃহীত হলো, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা প্রতিবাদে সংসদ কক্ষ ত্যাগ করলেন। (ফাহমিদুর রহমান, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ)
প্রথম সংশোধনী : ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর নতুন সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর মাত্র সাত মাসের ব্যবধানে ১৯৭৩ সালের ১৪ জুলাই সংবিধানের প্রথম সংশোধনী প্রস্তাব সংসদে পাস হয়। এ সংশোধনী মোতাবেক স্বাধীনতা সংগ্রামকালে যারা পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করেছিল তাদের শাস্তি দিতে সংসদ আইন প্রণয়ন করতে পারবে। সে আইনকে সংবিধান এবং মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী বলে গণ্য করা যাবে না। মজার বিষয় হলো— শেখ মুজিবের জীবদ্দশায় বাংলাদেশে গণহত্যায় লিপ্ত পাকিস্তানি সৈন্যদের এক জনেরও বিচার করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে শেখ হাসিনার শাসনামলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী রাজাকার, আলবদর সদস্য এবং পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক নেতাদের বিচার করা হয়েছে।
দ্বিতীয় সংশোধনী : প্রথম সংশোধনীর মাত্র দুই মাস পরে ১৯৭৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীতে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের প্রতি বিরাট আঘাত করা হয়। বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রণয়ন ও তার আওতায় নিবর্তনমূলক আটকাদেশের ব্যবস্থা করা হয়। এর মাধ্যমে আইনটির অপপ্রয়োগ তথা বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪-এর মতো কালো আইনের প্রবর্তন ও এর রাজনৈতিক অপপ্রয়োগের সূচনাটি তখনকার সরকার করেছিল।
তৃতীয় সংশোধনী : তৃতীয় সংশোধনীর দ্বারা ১৯৭৪ সালের ১৬ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে ভারত-বাংলাদেশ সীমানাসংক্রান্ত সম্পাদিত চুক্তিকে বৈধতা দেয়া হয়। এ সংশোধনী ছিল ভারতের স্বার্থে। শেখ মুজিব ভারতের সাথে ১৬ মে ১৯৭৪ সালে এক চুক্তি করেন; যার আওতায় বেরুবাড়ী ইউনিয়ন ভূখণ্ড ভারতের কাছে হস্তান্তর করেন। একে বৈধতা দিতে সংবিধানে এই সংশোধনী আনা হয়। মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ ভারত থেকে যেসব ছিটমহল পাওয়ার কথা ছিল, তা পেতে বহু বেগ পেতে হয়েছে।
চতুর্থ সংশোধনী : ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর নতুন সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী দেশের শাসনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হয়। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে সংশোধনী প্রস্তাবটি পাস হয়। চতুর্থ সংশোধনী আইনের বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল : ক. রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার; খ. অদায়িত্বশীল মন্ত্রিপরিষদ; গ. নিষ্ক্রিয় আইন পরিষদ; ঘ. উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি; ঙ. মৌলিক অধিকার বলবৎ বাতিল; চ. বিচার বর্ধন; ঝ. স্থানীয় সরকারের সংগঠন অনিশ্চিতকরণ। বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব; ছ. একদলীয় ব্যবস্থা; জ. রাষ্ট্রপতি ও সংসদের আয়ু বৃদ্ধি।
সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী ছিল শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগের আত্মপ্রবঞ্চনা ও জনগণের সাথে প্রতারণার এক বড় দলিল। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় সূচিত হয়। ওই দিন পার্লামেন্টে সংবিধানে ব্যাপক সংশোধনী অনুমোদিত হয়। সংবিধানের মোট ১৫৩টি অনুচ্ছেদের ৩৭টিতে পরিবর্তন ও তিনটি নতুন অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হয়। এ ছাড়া তিনটি তফসিলেও সংশোধন আনা হয়। এসব সংশোধনীর ফলে সংবিধানের মূল চরিত্র পাল্টে দেয়া হয়। বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে একদলীয় রাষ্ট্রপতি শাসিত স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। রাষ্ট্রপতিকে একচ্ছত্র ক্ষমতা দিয়ে নামমাত্র উপরাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পদ রাখা হয়। এমনকি আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে দেশের একমাত্র রাজনৈতিক দল হিসেবে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ গঠন করা হয়। সব দল, সংগঠন এমনকি সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের ওই দলে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা হ্রাস করে রাষ্ট্রপতিকে বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা দেয়া হয়। সংবিধানে নাগরিকদের প্রদত্ত মৌলিক অধিকারগুলো ব্যাপকভাবে খর্ব করা হয়। এক কথায়, দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের কবর রচিত হয় এমন নেতা ও তার দলের হাতে, যারা দীর্ঘকাল গণতন্ত্রের মুখরোচক বাণী কপচিয়ে জনগণের হৃদয় জয় করেছিলেন। শেখ মুজিব কেন এমন অপরিণামদর্শী ও অজনপ্রিয় পদক্ষেপ নিতে গেলেন— এ প্রশ্নের জবাব এক কথায় দেয়া কঠিন।
জিয়ার আমলে সংবিধান সংশোধনী
১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর পর দেশে দ্রুত রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক পটপরিবর্তন হতে থাকে। শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সাংবিধানিক নীতি ও বিধির সংশোধন ও পরিবর্তন অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনতে জেনারেল জিয়ার যে পদক্ষেপটি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ, তা ছিল সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে যেসব অনাকাঙ্ক্ষিত ও অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল, পঞ্চম সংশোধনীর দ্বারা তার অধিকাংশের প্রতিবিধান করা হয়। এ ছাড়া রাষ্ট্রের মূলনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন আনা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো :
১. সংবিধানের প্রস্তাবনার প্রারম্ভে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম সংযোজন।
২. রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি হিসেবে ৮ (১) অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্তা ও বিশ্বাস’ প্রতিস্থাপন। (১ক) অনুচ্ছেদে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহ উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসই হবে যাবতীয় কার্যাবলীর ভিত্তি’ সংশোধন।
৩. ৮(১) অনুচ্ছেদের আরেক রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ‘সমাজতন্ত্র’-এর পরিবর্তে ‘সমাজতন্ত্র অর্থাৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচার’ প্রতিস্থাপন।
৪. ২৫(২) অনুচ্ছেদে ‘রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করিতে সচেষ্ট হইবেন’-মর্মে নতুন অনুচ্ছেদ সংযোজন।
৫. ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের ওপর সাংবিধানিক বাধা অপসারণ। একদলীয় বাকশালী ব্যবস্থা বাতিল।
৬. সুপ্রিম কোর্টের মৌলিক এখতিয়ার পুনঃবলবৎকরণ।
৭. সংসদে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ১৫ থেকে ৩০ বৃদ্ধিকরণ।
উল্লিখিত সংশোধনীগুলোর তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো— সংবিধান তথা রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইসলামী চেতনার প্রাধান্য। একই সাথে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের জনগণের চিন্তা ও বিশ্বাসের যে গুরুত্বপূর্ণ দিককে উপেক্ষা করেছিল, জিয়াউর রহমান ঠিক সে দুটোকে সঠিক মূল্যায়ন করে তাকে যথাস্থানে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অর্থাৎ— জেনারেল জিয়া জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও চেতনা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে দৃঢ়ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করেন।
ত্রয়োদশ সংশোধনী : আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৬ সালের ২৮ মার্চ তারিখে জাতীয় সংসদ সংবিধানের ৫৮ক অনুচ্ছেদের পরে ৫৮খ, ৫৮গ, ৫৮ঘ ও ৫৮৫ অনুচ্ছেদ সংযোজন করে একটি ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করা হয়। ওই বিধান অনুযায়ী সংসদ ভেঙে দেয়ার পর বা মেয়াদ অবসানের পর একজন প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে নতুন প্রধানমন্ত্রী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার বিধান করা হয়। ১৯৯৬ সালের ৩ মার্চ জাতীয় সংসদে সংবিধানের এয়োদশ সংশোধনী অনুমোদিত হয়, যা বাংলাদেশের সংবিধান ও রাজনীতির ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি এ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তন করা হয়। এ পদ্ধতি বিশ্বের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি ব্যতিক্রমী নতুন সংযোজন।
আদালতের রাজনৈতিক রায়ে সংবিধান সংশোধনী
২০০৫ সালে ২৯ আগস্ট বিচারপতি এম খায়রুল হক ও বিচারপতি ফজলে কবিরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ শুধু ৭নং বিধানই নয়, সামরিক আইন জারিকে অবৈধ ঘোষণা করে এক বিতর্কিত রায় দেন। হাইকোর্টের রায়ের ফলে সংবিধানে যেসব পরিবর্তন আসে তা সংক্ষেপে নিম্নরূপ :
১. রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি ‘আল্লাহর প্রতি ঈমান ও অবিচল আস্থা’ অংশটি বাতিল ঘোষিত হয়। এর পরিবর্তে ফিরে আসে ১৯৭২ সালের সংবিধানে উল্লিখিত ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’।
২. রাষ্ট্র পরিচালনার আরেকটি মূলনীতি ‘সামাজিক ন্যায়বিচার অর্থে সমাজতন্ত্র’-এর ‘সামাজিক ন্যায়বিচার অর্থে’ অংশটুকু বাদ দিয়ে ১৯৭২ সালের সংবিধানে উল্লিখিত শুধু ‘সমাজতন্ত্র’ পুনর্বহাল করা হয়।
৩. বাংলাদেশের নাগরিকরা ‘বাংলাদেশী’ বলে পরিচিত হবেন, এর পরিবর্তে ১৯৭২ সালের সংবিধানে উল্লিøখিত ‘বাঙালি’ বলে পরিচিত হবেন। অর্থাৎ— ‘বাংলাদেশী’ জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে ‘বাঙালি’ জাতীয়তাবাদ পুনর্বহাল করা হয়।
৪. পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ‘মুসলিম দেশগুলোর সাথে ভ্রাতৃত্ব জোরদার’ করার অংশটি বাদ দেয়া হয়।
৫. ১৯৭২ সালের সংবিধানে বা পঞ্চম সংশোধনীতে সংবিধানের ‘মৌলিক কাঠামো’ বলে কিছু চিহ্নিত ছিল না। কিন্তু পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের রায়ে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’, ‘গণতন্ত্র’, ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’কে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বলে ঘোষণা করা হয় এবং বলা হয়, এসব মৌলিক কাঠামো কোনো দিন সংশোধন করা যাবে না।
৬. পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের রায়ে অতীতের সামরিক সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। সে হিসেবে তাদের শাসনকালে প্রণীত আইন, বিধিবিধান ও আদেশও অবৈধ। এমনকি তাদের সিদ্ধান্তের কারণে যে গণভোট হয়েছে, জাতীয় সংসদ গঠনের জন্য যে নির্বাচন হয়েছে এবং তার মাধ্যমে যে জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে, তা সব বেআইনি ঘোষণা করা হয়। সেই সংসদ যেহেতু বেআইনি, সেহেতু পঞ্চম সংশোধনীও বেআইনি।
সপ্তম সংশোধনী বাতিল : আদালত কর্তৃক সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের চূড়ান্ত রায়ের কিছু দিন পরে ২০১০ সালের আগস্টে সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী বাতিল করে দেয়। বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ও বিচারপতি শেখ মো: জাকির হোসেন সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ ওই রায় ঘোষণা করে। পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী রায়ের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ :
১. ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত জারি করা সব সামরিক ফরমান ও বিধিবিধান অবৈধ ঘোষণা;
২. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী, তার শাস্তি হওয়া উচিত; তাকে মার্জনা করার কোনো সুযোগ নেই;
৩. ধারাবাহিকতার জন্য যেসব পদক্ষেপ ওই সময় গৃহীত হয়েছিল, সেগুলোকে মার্জনা করা হলো;
৪. জেনারেল এরশাদ ও জিয়াউর রহমান দালাল এবং তারা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুনর্বাসিত করেছেন;
৫. ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সংবিধান থেকে বাদ দিয়ে জিয়া সংবিধান ধ্বংস করেছেন। সেই সাথে জিয়া ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চালু করেছেন;
৬. জিয়া ক্যাঙ্গারু কোর্টের মাধ্যমে কর্নেল তাহেরসহ অনেককে ফাঁসি দিয়েছেন। তার এসব কর্মকাণ্ডকে কোনোভাবে মার্জনা করা যায় না।
সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়কে অনেকে তখন একটি রাজনীতিবিষয়ক রায় বলে অভিহিত করেন।
ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল : ১৯৯৬ সালে তিনজন আইনজীবী তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দাখিল করেন। হাইকোর্ট রিটটি খারিজ করে দেন। একই সাথে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা তথা ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ এবং সংবিধানসম্মত আইন। ওই আইনজীবীরা ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। আদালত তাদের সাহায্য করতে ১০ জন এমিকাস কিউরি বা আদালত-বান্ধব আইনজীবী প্যানেল নিয়োগ করেন। এই ১০ জনের ৯ জন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল রাখার পক্ষে বলিষ্ঠ মত দেন। ২০১৪ সালের নির্বাচন কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ২০১১ সালে অযাচিতভাবে আদালতের ওপর বন্দুক রেখে কেয়ারটেকার সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। সুপ্রিম কোর্টের ফুল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে রায় প্রদান করেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবলিত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী সংবিধান পরিপন্থী। তাই সেটি বাতিল করা হলো। তবে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আগামী দশম সংসদ নির্বাচন ও একাদশ সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভিত্তিতে হতে পারে।
সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদীয় কমিটি : উল্লেখ্য, ২০১০ সালে সরকার সংবিধান সংশোধনে সংসদ সদস্য সাজেদা চৌধুরীকে চেয়ারম্যান ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে কো-চেয়ারম্যান করে ১৫ সদস্যের একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করেছিল। বিভিন্ন মহলের সাথে বৈঠকের অংশ হিসেবে কমিটি ২৭ এপ্রিল ২০১০ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বৈঠকে বসলে তিনি সরকারি ও বিরোধী দল থেকে পাঁচজন করে সদস্য নিয়ে ১০ জনের কেয়ারটেকার সরকার হতে পারে এবং সেই সরকারের মেয়াদ হবে ৯০ দিন। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে কমিটি ৩০ মে ২০১০ শেষবারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বৈঠক করেন, তখন তিনি সম্পূর্ণ ঘুরে গিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলের পক্ষে তার মত ব্যক্ত করেন। এমনকি তিনি আগামী দু’টি নির্বাচন আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠানের বিষয়টিও আমলে নিতে রাজি হননি।
পঞ্চদশ সংশোধনী : ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদ কর্তৃক সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এর সাথে আরো কিছু সংশোধনী অনুমোদিত হয়। তবে জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এবং জেনারেল এরশাদ কর্তৃক প্রবর্তিত ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ বহাল রাখা হয়। এর মধ্যে রহস্য লুকায়িত ছিল। তখন শেখ হাসিনা এক সভায় বলেছিলেন, ‘পরিস্থিতির কারণে সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ ও রাষ্ট্রধর্ম ‘ইসলাম’ রাখতে হচ্ছে’। সংসদীয় কমিটি সংবিধান সংশোধনী বিলের ওপর রিপোর্ট পেশকালে উল্লেখ করে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশেষত ‘বিসমিল্লাহ’ ও ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ বিষয় তাদের ’কম্প্রোমাইজ’ করতে হয়েছে। তখন কারো এটি বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, সংবিধান সংশোধনী প্রস্তাবে একমাত্র শেখ হাসিনার ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে। শেখ হাসিনার কথা থেকে মনে হয়েছে, তিনি শেষ মূহূর্তে কৌশলগত কারণে হয়তো মহাজোট সরকারের অংশীদার জাতীয় পার্টির সাথে দূরত্ব সৃষ্টি করতে চাইছিলেন না। এ ছাড়া জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করতেও চাননি। তবে তিনি তার পিতার রেখে যাওয়া রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র বিষয়ে শক্ত অবস্থান নেন। এ জন্য সংবিধান থেকে ‘আল্লাহর ওপর অবিচল বিশ্বাস ও আস্থা’ তুলে দিয়ে তার স্থলে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ সংযোজনের সিদ্ধান্ত নেন।
উপরোল্লিখিত আলোচনা থেকে এটি প্রতীয়মান হয়, শেখ মুজিব ও তার কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সংবিধানকে নিজেদের খেয়ালখুশি মতো সংশোধন, সংযোজন ও বিয়োজন করেছেন। সে জন্য কখনো জনগণের ম্যান্ডেট গ্রহণের প্রয়োজন বোধ করেননি। সুতরাং বেগম খালেদা জিয়া যথার্থভাবে বলেছিলেন, ‘এই সংবিধান হলো আওয়ামী লীগের ইশতেহার’।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানে একই সাথে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু জামায়াত ও এনসিপিসহ বিরোধীদলীয় সদস্যরা দুটো শপথ নিলেও বিএনপি সদস্যরা দ্বিতীয় শপথ নেননি এ যুক্তিতে যে, এরূপ কোনো ব্যবস্থা সংবিধানে নেই। প্রথম অধিবেশনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়েও বিতর্ক চলছে। সেখানেও সরকারি দল থেকে বলা হয়, আমাদের সংবিধান মতো চলতে হবে। এখন প্রশ্ন— বিএনপির মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া যে সংবিধান ছুড়ে ফেলে দিতে চেয়েছেন, বর্তমান বিএনপি নেতৃত্ব তার প্রতি সম্মান না করে উল্টোপথে হাঁটছে কেন?
লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব