জ্বালানিসংকট নিরসনে করণীয় নির্ধারণে সরকার ও বিরোধী দলের সমসংখ্যক সদস্য নিয়ে ১০ সদস্যের বিশেষ কমিটি অনুমোদন করেছে জাতীয় সংসদ। কমিটিকে ৩০ দিনের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান সংসদকে জানিয়েছেন, পুলিশসহ জরুরি সেবায় নিয়োজিত বাহিনীর ওপর আরোপিত জ্বালানি তেলের সীমাবদ্ধতা বা রেশনিং ইতোমধ্যে তুলে নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং জনগণের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে দুই দিন আগেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করে। গতকাল স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে সরকারি দলের মনিরুল হক চৌধুরী মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে দেশে সৃষ্ট জ্বালানিসংকট নিয়ে কথা বলেন। তিনি অভিযোগ করেন, জ্বালানি তেলের রেশনিংয়ের অজুহাতে পুলিশ রাতে টহল কমিয়ে দিয়েছে, যার ফলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। পুলিশের টহল কমে যাওয়ার কারণে কুমিল্লার একজন কাস্টমস কর্মকর্তা হত্যার ঘটনা ঘটেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এরপর ফ্লোর নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি সংসদকে জানান, সংসদ সদস্য যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সে বিষয়টি এরই মধ্যে আমরা অ্যাড্রেস করেছি। পুলিশসহ ইমার্জেন্সি বাহিনীর যারা আছে, পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স বা ফায়ার ব্রিগেড, তাদের ওপর থেকে যে এমবার্গো (নিষেধাজ্ঞা) ছিল, তা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দুই দিন আগেই এই সিদ্ধান্ত আমরা গ্রহণ করেছি, বিষয়টি ক্লিয়ার করে দেওয়া হয়েছে। এই সমস্যা আর হবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। এদিকে সাম্প্রতিক জ্বালানি নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে সংসদে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কার্যপ্রণালি বিধির ২৬৬ বিধি অনুযায়ী ১০ সদস্যের বিশেষ কমিটি অনুমোদন দিয়েছে সংসদ। সরকারি দলের ৫ জন ও বিরোধী দলের ৫ জনকে নিয়ে গঠিত ওই কমিটিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম এ-সংক্রান্ত প্রস্তাবটি উত্থাপনের পর স্পিকার তা সংসদে ভোটে দেন। কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতিতে প্রস্তাবটি পাস হয়।

বিশেষ অধিকারের বিশেষ নোটিস নাকচ : রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমানের জাতীয় সংসদে উত্থাপিত বিশেষ অধিকারসংক্রান্ত দুটি নোটিস নাকচ করেছেন স্পিকার। সংসদের ফ্লোর পাওয়ার সিরিয়াল নির্ধারণে স্টাফদের সহযোগিতা নেওয়া এবং এশার নামাজের বিরতিসংক্রান্ত পৃথক দুটি নোটিসের বিষয়ে সংসদে রুলিং দেন স্পিকার। তিনি জানান, বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্নের আওতায় পড়ে না, তাই ১৬৪ বিধিতে নোটিস দুটি গ্রহণ করা গেল না।

সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান প্রথম নোটিসে উল্লেখ করেন, অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডার বা সম্পূরক প্রশ্ন করার জন্য অনেক সদস্য একসঙ্গে হাত তুললে স্পিকারের পক্ষে সবার সিরিয়াল মনে রাখা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এই সমস্যা সমাধানে সামনের টেবিলে দায়িত্বরত কোনো স্টাফ যদি কে আগে হাত তুললেন সেই সিরিয়াল লিখে স্পিকারকে সহায়তা করেন, তবে সদস্যদের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। জবাবে স্পিকার সংসদকে জানান, সংসদ সচিবালয়ের সচিবসহ কর্মকর্তারা তাঁকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সংসদ পরিচালনায় সব ধরনের সহায়তা করে থাকেন।

বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দল মুখোমুখি : বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা। গতকাল সরকারি দলের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের অভিযোগ ও কঠোর সমালোচনার মুখে সরকারি দলের পাল্টা অভিযোগে গরম হয়ে উঠেছিল জাতীয় সংসদ। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ এই বিতর্কের সূচনা করেন। তিনি বলেন, বিরোধী দলের মত দমনের জন্য মামলা করা হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুকে লেখার কারণে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। হুইপকে সমালোচনা করলে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আওয়ামী লীগের সময়ও ছিল, তবে সহমত প্রকাশের। আবারও সেই পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। গতকাল প্রথমে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও পরে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশনে বিরোধী দলের অভিযোগের জবাবে সরকারি পাল্টা অভিযোগে অধিবেশন কক্ষ উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিরোধী দল এনসিপির এমপির বক্তব্যের জবাব দেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজীব হাসান। তিনি বলেন, গত ১৮ মাস যে সরকারটি (অন্তর্বর্তী) ছিল তা মূলত বিরোধী দল তথা জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি সমর্থিত সরকার হিসেবে কাজ করেছে। সেই সময়ে যারা ক্ষমতার খুব কাছাকাছি থেকে বিশেষ সুবিধা বা আরামে ছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সুবিধা না থাকাতেই তাদের মধ্যে তীব্র অস্থিরতা ও অস্বস্তি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর আগে এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, যেখানে প্রধানমন্ত্রী নিজে কার্টুন শেয়ার করে বিভিন্ন স্যাটায়ার, বিভিন্ন মকারিকে প্রমোট করছে, বিরোধী মতকে প্রমোট করছে, সেখানে এই সংসদ গঠিত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত নয়টা ঘটনা ঘটেছে- যেখানে মতপ্রকাশের জন্য বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা খুব আশাহত হই, যখন এত রক্ত, এত লড়াই, এত ত্যাগের পরে এই সংসদ গঠিত হয়েছে। কিন্তু এই সংসদ আবার আগের সেই বিষের সাইকেল, দোষারোপের সাইকেল, বিভিন্ন ট্যাগিংয়ের সাইকেল, মত দমনের নামে, বিরোধী মত দমনের নামে মামলার যে সাইকেল, আমরা সেখানে আবার চলে গিয়েছি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আওয়ামী লীগের সময় ছিল, তবে সহমত প্রকাশের। আবারও সেই পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।

বিরোধী দলকে টুকুর কটাক্ষ : এরপর আলোচনায় অংশ নিয়ে জুলাই আন্দোলন নিয়ে ‘একক কৃতিত্ব’ দাবি করার প্রবণতার সমালোচনা করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলন নিয়ে এমনভাবে কথা বলা হচ্ছে, যেন ‘শুধু একটি পক্ষই’ আন্দোলন করেছে। যেমন আওয়ামী লীগ মনে করে যে, ’৭১ আওয়ামী লীগই করছে, আর কেউ যুদ্ধ করে নাই। এরকম আচরণ আওয়ামী লীগ করছে। ইদানীং ওই রোগ তাদের (বিরোধী দলের) ভিতরে ঢুকছে। জুলাই আন্দোলন খালি তারাই করছে, আর কেউ করে নাই।

জামায়াত এত খারাপ হয়ে গেল? : প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. ইজ্জত উল্লাহ বলেন, জামায়াত আপনাদের (বিএনপি) সঙ্গে দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছে, জোটগতভাবে ক্ষমতায় এসে তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছে, ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনও করেছে- এখন জামায়াত এত খারাপ হয়ে গেল? কারা কটাক্ষ করছেন তারা কি জানেন না? অনেকেই জামায়াতকে নির্মূলের কথা বলছেন, আমরা চাই আপনারা জনগণের আস্থা অর্জন করুন। আমরা দেশ ও জনগণের স্বার্থে সহযোগিতা করতে চাই।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews