কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি মানুষের কাজের সময় কমিয়ে দেবে—এমন আশ্বাস বছরের পর বছর ধরে দিয়ে আসছেন এই খাতের শীর্ষ নির্বাহীরা। গুগলের এক প্রকৌশল পরিচালক চার বছর আগে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ২০২৫ সালের মধ্যে এআই সপ্তাহে মাত্র চার দিন কাজের সুযোগ তৈরি করবে। কিন্তু বাস্তবচিত্র ঠিক উল্টো। যে কর্মী ও প্রকৌশলীরা দিনরাত এক করে এই এআই তৈরি করছেন, তারা জানিয়েছেন, সপ্তাহে তাদের কাজ করতে হচ্ছে ৭০ থেকে ৯০ ঘণ্টা পর্যন্ত।
বিবিসির প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিবেদক কালি হেইস সোমবার (১০ আগস্ট) জানান, বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের দাবি আর তাদের ভেতরের কর্মীদের বাস্তব জীবনের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। ওপেনএআই-এর প্রাক্তন এক কারিগরি কর্মী জানান, সপ্তাহে চার দিন কাজের যে পরামর্শ তার সাবেক প্রতিষ্ঠান অন্য সংস্থাগুলোকে দিচ্ছে, বাস্তবে নিজেদের কার্যালয়ে কখনোই তা প্রয়োগ করেনি। তিনি জানান, সেখানে ঘন ঘন 'সংকট বৈঠক', ছুটির দিনে কাজ করা এবং সহকর্মীদের ছাঁটাইয়ের চরম প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের মধ্য দিয়ে যেতে হতো।
অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও কাজের সময় কমানোর একই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অ্যানথ্রোপিকের দাবি, তাদের চ্যাটবট 'ক্লদ' কোনো বিরতি ছাড়া টানা সাত ঘণ্টা কাজ করতে পারে। মেটার প্রধান মার্ক জাকারবার্গ বলেছেন, এআই ব্যবহারের ফলে কম কর্মী দিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি কাজ করানো সম্ভব হচ্ছে। তবে এসব দাবির মুখে মেটা ১০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করেছে। আর অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই সতর্ক করে বলেছেন, এআই যত দক্ষ হবে, চাকরি হারানোর ঝুঁকি তত বাড়বে।
এআই যত দক্ষ হবে, চাকরি হারানোর ঝুঁকি তত বাড়বে
যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ অফিসে দিনে ৮ ঘণ্টা বা সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজের নিয়ম থাকলেও এআই প্রতিষ্ঠানে তা ভেঙে পড়েছে। প্রযুক্তি খাতে 'স্প্রিন্ট' বলতে নতুন কোনো পণ্য বা ফিচার বাজারের আনার আগের ব্যস্ত সময়কে বোঝায়। আগে এটি স্বল্পমেয়াদী হলেও এআই কোম্পানিগুলোতে তা সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে চলছে। ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রোপিকের একাধিক কর্মী জানিয়েছেন, 'স্প্রিন্ট' চলাকালে সপ্তাহে তাদের ৯০ ঘণ্টারও বেশি কাজ করতে হয়।
মেটার কর্মীরা জানিয়েছেন, তাদের না জানিয়ে বা মতামত না নিয়েই জরুরি ভিত্তিতে এআই প্রকল্পে বদলি করা হচ্ছে। এটিকে তারা 'ড্রাফট' বা বাধ্যতামূলক নিয়োগ বলে অভিহিত করেছেন। রাজি না হলে চাকরি ছেড়ে দেয়া ছাড়া উপায় থাকে না। গভীর রাত পর্যন্ত এবং ছুটির দিনেও সেখানে কাজ করতে হচ্ছে।
গুগলের প্রাক্তন প্রকৌশলী আমিন শালী গত মে মাসে চাকরি ছেড়ে দেন। তিনি জানান, এআই মেমোরি ও প্রসেসিং শক্তি বেশি খরচ করায় গুগলের ভেতরের অনেক অভ্যন্তরীণ প্রকৌশল ব্যবস্থা ঘন ঘন বিকল হয়ে পড়ত। ফলে গভীর রাতেও তাকে কাজের পেছনে ছুটতে হতো। এতে তার শারীরিক ক্ষতি হচ্ছিল।
ইউসি বার্কলির এক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ব্যবহারের পর কর্মীরা দ্রুত কাজ করছেন ঠিকই, তবে কাজের পরিধি ও সময় দুটোই বেড়েছে। কারণ এআইয়ের তৈরি তথ্য ও কোডিং সঠিক কি না, তা প্রতিনিয়ত পরীক্ষা করে দেখতে হয় কর্মীদের। এমআইটির উদ্ভাবন বিষয়ের পণ্ডিত নীল থম্পসন বলেছেন, এআই যে সময় বাঁচায়, নতুন কাজের সৃষ্টি হয়ে সেই সময় আবার ব্যস্ততায় রূপ নেয়। ফলে এআই প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করার বদলে কাজের চাপ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।