(দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)
কক্সবাজার শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার উত্তরে ডুলাহাজারায় আছে সাফারি পার্ক। প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার দর্শনার্থী পার্কটি পরিদর্শনে আসেন। কুতুবদিয়ার অদূরে গভীর সমুদ্রবন্দর এবং কক্সবাজার থেকে মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত বিস্তৃত সড়ক নির্মাণ সম্পন্ন হলে কক্সবাজারের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বহুগুণ বাড়বে বলে আশা করা যায়।
চট্টগ্রাম শহরে পতেঙ্গা বিচ, সামুদ্রিক বন্দর, ফয়’জ লেক, বাটালি হিল পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয়। এখানে সমুদ্রবন্দর ও রফতানি প্রক্রিয়াজাত এলাকার অবস্থান বিধায় বিপুলসংখ্যক বিদেশী নাবিক ও বিশেষজ্ঞরা আসে। চট্টগ্রামের সীতকুণ্ডে আছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান চন্দ্রনাথ মন্দির। এখানে প্রতি বছর মেলা বসে। মেলায় ভারত ও নেপাল থেকেও তীর্থযাত্রীরা আসে। চট্টগ্রামের পূর্বদিকে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলা। এই তিন জেলার অধিকাংশ ভূ-ভাগ পাহাড় দিয়ে আবৃত।
রাস্তাঘাট পাহাড় কেটে বানানো। জেলাগুলো ভ্রমণের পর অনেক বিদেশী পর্যটক এমন মন্তব্য করেছেন যে, এর সৌন্দর্য কোনো অংশে সুইজারল্যান্ডের চেয়ে কম নয়। অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বাড়ালে পার্বত্য এলাকায় প্রচুর দেশী ও বিদেশী পর্যটকের আগমন ঘটবে। মূলত বাঙালি-পাহাড়ি দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে দেশী ও বিদেশী উভয় ধরনের পর্যটক এই অঞ্চলে ভ্রমণের উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। নোয়াখালী উপকূলবর্তী জেলা। এর সর্ব দক্ষিণের দ্বীপের নাম নিঝুম দ্বীপ। এই দ্বীপে যাতায়াতের সুব্যবস্থা নেই। এরপরও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে প্রতি বছর অনেক পর্যটক এই দ্বীপ ভ্রমণে আসেন। নোয়াখালী শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে ভারতের স্থপতি গান্ধীর নামে একটি আশ্রম আছে। এই আশ্রম দেখতে দেশ ও বিদেশ থেকে লোক আসে।
কুমিল্লার ময়নামতিতে প্রাচীন বৌদ্ধযুগীয় বহু নিদর্শন রয়েছে। এসব নিদর্শনের কিছু ময়নামতির জাদুঘরে স্থান পেয়েছে। জাদুঘর ও বৌদ্ধযুগীয় স্থাপনা দেখতে এখানে দেশ ও বিদেশের পর্যটকরা আসেন।
বর্তমান মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ সিলেট জেলার মহকুমা ছিল। মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেটে প্রায় ১৪০টির মতো উৎপাদনক্ষম চা-বাগান আছে। মৌলভীবাজারের মাধবকুণ্ডে বাংলাদেশের একমাত্র বছরব্যাপী প্রবহমান জলপ্রপাত। সুনামগঞ্জে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসিয়া পাহাড়ের কোলঘেঁষে টাঙ্গুয়ার হাওর। এই হাওরে শীতকালে লাখ লাখ অতিথি পাখি আসে। হাওরটি ইউনেস্কোর রামসার ঘোষণা অনুযায়ী বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। সিলেট জেলার উত্তর সীমান্তে তামাবিলে জৈন্তিয়া পাহাড় গড়িয়ে পড়ে তিন ঝরনার পানি। সিলেট শহরের ভেতরে ও কাছাকাছি আছে হজরত শাহজালাল ও হজরত শাহপরাণের মাজার। উভয় মাজার সিলেট তথা বাংলাদেশের পুণ্য তীর্থ বা আধ্যাত্মিক স্থাপনা।
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায় কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত। এই সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়। সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলার দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় চার হাজার বর্গমাইল এলাকাজুড়ে শ্বাসমূলীয় বন সুন্দরবন। এই বনে আছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বনটি ইউনেস্কোর রামসার ঘোষণা অনুযায়ী বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। এখানে আধুনিক সুযোগ সুবিধার হোটেল ও রেস্ট হাউজ বানালে, যাতায়াতব্যবস্থার উন্নয়ন করলে আরো পর্যটক আগ্রহী হয়ে উঠবে। খুলনা বিভাগে বাগেরহাট জেলায় ষাট গম্বুজ মসজিদ। এটিও বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। এই মসজিদটি মোগল স্থাপত্যের নিদর্শন।
রাজশাহী বিভাগের নওয়াবগঞ্জ জেলার পশ্চিম সীমান্তে সোনা মসজিদ। এই মসজিদটি মোগল স্থাপনা। নওগাঁ জেলার বাদলগাছি উপজেলায় প্রায় এক হাজার ৬০০ বছর আগের প্রাচীন বৌদ্ধযুগীয় নিদর্শন পাহাড়পুরের অবস্থান। দিঘাপতিয়া রাজবাড়ী নাটোর শহরের কাছাকাছি। এ রাজবাড়িটিকে বর্তমানে উত্তরা গণভবন বলা হয়।
বগুড়া শহর থেকে ১০ মাইল দূরে মহাস্থানগড়। বিভিন্ন বৌদ্ধ ধর্মীয় নিদর্শন মহাস্থানগড় সংলগ্ন জাদুঘরে রক্ষিত আছে। দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দির ও রামসাগর দীঘি আকর্ষণীয়।
ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী। এখানে মোগল আমলের স্থাপনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে লালবাগের কেল্লা। ঢাকার অদূরে সোনারগাঁ একসময় বাংলাদেশের রাজধানী ছিল। সোনারগাঁয়ে এখনো ১৬০০-১৭০০ সালে বানানো কারুকার্যমণ্ডিত অনেক দালানকোঠা আছে। ঢাকার নবাববাড়ি ঊনবিংশ শতাব্দীতে নির্মিত নবাবদের আবাসস্থল। এছাড়া আধুনিক স্থাপনার মধ্যে ঢাকায় আছে সংসদ ভবন, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, জাদুঘর, নভোথিয়েটার প্রভৃতি।
বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ত্বরান্বিত করতে হলে পর্যটন স্থানগুলোতে দেশী ও বিদেশী পর্যটকদের জন্য অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পর্যটন খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে। পর্যটন শিল্পের বিকাশে নিতে হবে সমন্বিত উদ্যোগ।
লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
E-mail: [email protected]