প্রফেসর খন্দকার এ. কে. আজাদ
১ মার্চ, ২০২৬ | ১২:২০ অপরাহ্ণ
বিশ্বব্যাপী মার্চ মাস পালিত হয় কোলোরেক্টাল ক্যান্সার সচেতনতা মাস হিসেবে। নীল ফিতা (ব্লু রিবন) আমাদের মনে করিয়ে দেয়— কোলন ও রেকটামের ক্যান্সার একটি প্রতিরোধযোগ্য ও প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য রোগ। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই ক্যান্সারের প্রকোপ ধীরে ধীরে বাড়ছে, যা এখনই গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
বাড়ছে ঝুঁকি, কম সচেতনতা
আগে কোলোরেক্টাল ক্যান্সারকে পশ্চিমা দেশের রোগ মনে করা হলেও বর্তমানে আমাদের দেশেও রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এর পেছনে রয়েছে— অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, স্থূলতা, দীর্ঘায়ু এবং প্রসেসড খাবারের ব্যবহার বৃদ্ধি। দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশে অনেক রোগী এখনো দেরিতে ও জটিল পর্যায়ে চিকিৎসকের কাছে আসেন।
আগেভাগে শনাক্তকরণ কেন জরুরি
কোলোরেক্টাল ক্যান্সার সাধারণত ধীরে ধীরে পলিপ থেকে তৈরি হয়। এই সময়টিই হলো প্রতিরোধের সোনালি সুযোগ। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে— নিরাময়ের হার ৯০%-এর বেশি, অপারেশন তুলনামূলক সহজ, চিকিৎসা ব্যয় কম এবং রোগীর জীবনমান ভালো থাকে।
যেসব লক্ষণ অবহেলা করা যাবে না
নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত— মলত্যাগের অভ্যাসে স্থায়ী পরিবর্তন, মলে রক্ত যাওয়া, অকারণ রক্তস্বল্পতা, অযাচিত ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘদিন পেটের অস্বস্তি এবং মলত্যাগের পরও অসম্পূর্ণতার অনুভূতি। মনে রাখতে হবে— অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই রোগ থাকতে পারে, তাই স্ক্রিনিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারা স্ক্রিনিং করবেন?
আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুযায়ী— সাধারণ ঝুঁকির ব্যক্তির ৪৫ বছর বয়স থেকে স্ক্রিনিং এবং উচ্চ ঝুঁকির ব্যক্তিদের (পারিবারিক ইতিহাস, ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ ইত্যাদি) আরও আগে যাদের উপসর্গ আছে তাদের বয়স নির্বিশেষে দ্রুত পরীক্ষা করতে হবে। স্ক্রিনিংয়ের মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর হলো কোলনোস্কপি, যা একসঙ্গে রোগ শনাক্ত ও পলিপ অপসারণ করতে পারে।
বাংলাদেশের বাস্তব চ্যালেঞ্জ
আমাদের অভিজ্ঞতায় কয়েকটি বড় ঘাটতি স্পষ্ট— জনসচেতনতার অভাব, দেরিতে রোগ নির্ণয়, স্ক্রিনিং সংস্কৃতির অভাব, টিউমার বোর্ড চর্চা সীমিত, রেফারেল ব্যবস্থার দুর্বলতা, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিতদের সীমিত প্রবেশাধিকার। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ।
করণীয় কী?
জনগণদের যা করতে হবে তা হলো- মলে রক্ত গেলে অবহেলা নয়, স্বাস্থ্যকর খাদ্য ও নিয়মিত ব্যায়াম, ৪৫ বছরের পর স্ক্রিনিং এবং পরিবারকে সচেতন করা। অন্যদিকে, চিকিৎসকদের জন্য যা করতে হবে তা হলো- স্ক্রিনিং জোরদার করা, টিউমার বোর্ড সংস্কৃতি শক্তিশালী করা, রোগী শিক্ষা বৃদ্ধি এবং ফলো-আপ নিশ্চিত করা। নীতি-নির্ধারকদের জন্য করণীয় হলো- সাশ্রয়ী কোলনোস্কপি সুবিধা বৃদ্ধি, জাতীয় সচেতনতা কর্মসূচি, প্রাইমারি কেয়ারে স্ক্রিনিং যুক্ত করা এবং জাতীয়ভাবে ক্যান্সার রেজিস্ট্রি চালু করা।
আমাদের অঙ্গীকার
পিজিএস একাডেমিয়া, সিএসসিআর এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের যৌথ উদ্যোগে একটি ‘ক্যান্সার সচেতন নগরী’ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চলছে। সচেতনতা শুধু প্রচারণায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না—এটি স্ক্রিনিং, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং সমন্বিত চিকিৎসায় রূপ নিতে হবে।
মার্চ ২০২৬-এর অঙ্গীকার
কোলোরেক্টাল ক্যান্সার— প্রতিরোধযোগ্য, আগেভাগে শনাক্তযোগ্য, যথাসময়ে চিকিৎসায় নিরাময়যোগ্য। সময় এখনই। সচেতন হই, স্ক্রিনিং করি, জীবন বাঁচাই।
লেখক : চেয়ারম্যান, পোস্টগ্র্যাজুয়েট সার্জারি একাডেমিয়া