জুলাই চব্বিশের আন্দোলনের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল পরিবর্তন। পরিবর্তন রাজনীতি, অর্থনীতিতে, সুশাসনে, দুর্নীতি-দুঃশাসন, বৈষম্য-বঞ্চনার অবসানে, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায়। দিন দিন অধরা সমস্যা এমনভাবে ডালপালা গজাচ্ছে, যাতে সবার মনে পরিবর্তন প্রত্যাশার বিষয়ে সংশয়-সন্দেহ ও পক্ষ-বিপক্ষের আঁচড় লাগার আভাস ফুটে উঠছে। নির্বাচনের উৎসব শেষে সব পক্ষকে এখন বেশ ভেবেচিন্তে, সক্রিয় সজাগ থেকে এগিয়ে যেতে দিতে হবে। বাংলাদেশের সমাজ রাজনীতি ও অর্থনীতি এক গুরুত্বপূর্ণ পর্বে উপনীত। প্রত্যেকে নিজস্ব উপলব্ধিতে চিন্তাভাবনা করে বৈষম্যহীন সমাজ ও দেশ গড়ার জন্য, সবাই মিলে দীর্ঘদিনের আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সময় থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছে। সে সূত্রে পরিবর্তনের প্রত্যাশার সপক্ষে জনমত যাচাইয়েও অংশ নিতে হবে। ঠিক এই সময়ে দোদুল্যমানতার পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া সমীচীন মনে করাই সমীচীন হবে না। নানান কায়দায় পুরনো রীতি-নীতি ও দুরভিসন্ধি (যার বিরুদ্ধে হাজার হাজার তাজা তরুণের রক্ত ঝরেছে) যাতে আর না আসে, সেজন্য ঐকবদ্ধ সবাইকে সজাগ করতে গিয়ে অনেকেই পারস্পরিক দোষারোপে সেই ঐক্য বিনষ্ট হওয়ার উপক্রম যাতে না হয়, তা দেখা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ মানুষ এই পরিবর্তনের প্রত্যাশাকে যদি উচ্চকণ্ঠে তুলে ধরতে এগিয়ে না আসেন বা পারেন, তাহলে ভবিষ্যৎ যেই লাউ সেই কদুতে পরিণত হবে। পরিবর্তন বা সংস্কারে সম্মত সব পক্ষকে এটি নিশ্চিত করতে হবে, এটিই যারা আত্মত্যাগ করেছে তাদের প্রতি দেয়া অঙ্গীকার পূরণ। সবাইকে এ ব্যাপারে অবশ্যই ইতিবাচক থাকার গুরুত্ব বিবেচনায় আনতে হবে। নেতিবাচককে ইতিবাচক দ্বারা পরাভূত করার এটিই মোক্ষম সুযোগ ও সময়। পরিবর্তনের জন্য সবার প্রত্যাশা পূরণ হওয়ার কোনো বিকল্প থাকতে নেই। নড়বড়ে অর্থনীতিতে জনমত প্রকাশে পথে নেমে কাদা ছোড়াছুড়িতে সময় নষ্টের মহড়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ ব্যাপারে সবাইকে সংশয়-সন্দিহান হওয়ার পথ থেকে সরে এসে বাস্তবতার চিন্তা-চেতনায় ফিরতে হবে।
মানবাধিকার, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা; সিন্ডিকেটের কবল থেকে ব্যাংকিং ব্যবস্থা, ব্যবসায়-বাণিজ্য, অবকাঠামো নির্মাণ- সবই উদ্ধারকল্পে নতুন সরকারসহ সব পক্ষকেই বর্তমান ও ভবিষ্যৎ স্বপ্নের বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। কেননা, বিগত ১৫ বছর কিংবা তার আগে রাষ্ট্র এবং সরকারের মধ্যে আনুভূমিক ও ঊর্ধ্বমুখী সম্পর্ক ও শৃঙ্খলা ব্যাপকভাবে বিনষ্ট হয়েছে; একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার পণে দলীয়করণের ফলে রাষ্ট্রীয় সংস্থার দায়িত্ব পালন বিপথগামী বা বিপর্যস্ত, জনপ্রশাসন ও বাহিনীর পেছনে রাজনৈতিক উৎকোচে ব্যয় বৃদ্ধিসহ নানা ধরনের বৈকল্য সৃষ্টি হয়। পক্ষপাতদুষ্ট আইনের শাসন, জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অবজ্ঞা-অমনোযোগিতা, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় দলীয় নির্বাচনের দ্বারা সর্বত্র দায়িত্বশীলতায় ঘুণে ধরে, সর্বত্র দুর্নীতি পরিব্যাপ্ত হওয়ায় ভূমি প্রশাসন, জনসেবা, পরিষেবা, সমাজসেবা, শোষণ ও শাসনের পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। মিডিয়া থেকে শুরু করে প্রায় সর্বত্র এক সেলফ সেন্সরড পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে জনআস্থায় চিড় ধরিয়েছিল। সিন্ডিকেটেড শক্তি ও সমস্যা বাজার ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে অর্থনীতি, রাজনীতি ও রাষ্ট্রক্ষমতাকে কুক্ষিগতকরণের পর্যায়ে পৌঁছায়। অসমতার ভিত্তিতে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে নতজানুকরণের পথে পররাষ্ট্রনীতি চলে যায়। ‘আয়নাঘরে’-এর মতো নারকীয় যন্ত্রণা, গুম, হত্যা ও অমানবিক কর্মকাণ্ড, ব্যাংক লুটসহ অর্থ পাচার সর্বোচ্চ পর্যায়ের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে দানবীয় যন্ত্রে পরিণত হয়। সংবিধানকে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবাদর্শের গঠনতন্ত্রে পরিণত করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সর্বোচ্চ পদধারীর দ্বারা সংখ্যালঘুদের জমি দখল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখল ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে নির্যাতন, নিবর্তন ও গণহত্যার চক্রান্তকারীরাই এনাম হিসেবে রাষ্ট্রের বড় বড় পদ দখল করেছিল। তারা এমন সব কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছিল যে, তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এতে জনমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাবমর্যাদা মারাত্মকভাবে নিন্দিত হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্যাংশন খাওয়া কর্মকর্তাকে প্রশ্রয় দেয়ার প্রয়াসে দেশ ও জাতির মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
এসব অবস্থা থেকে প্রশাসন, বিভিন্ন বাহিনী, বিচার ব্যবস্থাসহ সব নির্বাহী বিভাগকে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বকীয়তা উদ্ধার, সংবিধানের সীমাবদ্ধতা দূর, আইনের শাসন ও মানবাধিকার পরিস্থিতির দুর্গতি দূর, সুশাসন, সদাচার ও জবাবদিহিকরণ ব্যবস্থার পুনর্বাসনকল্পে প্রত্যাশা পূরণের পথে যাওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
এ কথা অবশ্যই ঠিক, সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের দায়িত্ব বর্তাবে শুধু জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের ওপর নয়, এটি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলের ওপর। সুতরাং সংস্কার প্রস্তাব যথাযথভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরা বাঞ্ছনীয় হবে, যা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সবার ওপর দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে।
অতীতে, বিশেষ করে ১৯৯১ সালে এবং ২০০৯ সালে তদানীন্তন নির্বাচিত সরকারের কাছে তার আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে রচিত সংস্কার প্রস্তাব ধোপে টেকেনি। বরং লক্ষণীয় হয়ে ওঠে যে, ২০০৮ সালের শেষে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি পালন বা পূরণের ব্যাপারে উপেক্ষার পথ বেছে নিয়েছিল। বরং যেসব জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ইশতেহারে উল্লেখ ছিল না সেগুলোই একতরফাভাবে বাস্তবায়নে সচেষ্ট ছিল। ২০০৯ সালের সরকার বিজনেস কাউন্সিলের সুপারিশ খুলেও দেখেনি; বরং রেগুলেটরি রিফর্ম কমিশনের প্রতিবেদন বাতিল করেছিল। এসব কারণে নির্বাচিত সরকারের সামনে সংস্কার প্রস্তাব ও সুপারিশগুলো উপেক্ষার সুযোগ না রাখাই হবে জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন। সংস্কার প্রস্তাব জনসমক্ষে প্রকাশ করে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলকে জনগণের সামনে প্রতিশ্রুতি পূরণে সচেতন থাকা বাঞ্ছনীয় হবে। সবাইকে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ বা জবাবদিহিকরণের এটিই হবে সম্ভাব্য সর্বোত্তম উপায়। এ সময় ও সুযোগকে কেউ যেন ভিন্ন খাতে নিয়ে যেতে না পারে, সেদিকে সবারই নিজ নিজ স্বার্থেই রাখতে হবে সজাগ দৃষ্টি।
কেন এই পরিবর্তন চাওয়া? যে প্রত্যাশা তা তো রক্তেভেজা আত্মত্যাগের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েই গেছে। এখন সেই প্রত্যাশা পূরণের পালা। সেখানে সবার সম্মতি লাগবে। এখন এখানে অসম্মতি প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ানোর অবকাশ নেই। তবুও ‘পক্ষ’কে শক্তিশালী করার জন্য ‘বিপক্ষ’কে দাঁড়াতে দিতে হয়। তাকে দাঁড়াতে দিতে হয় এ জন্য যে, তাতে ‘পক্ষ’-এর পক্ষে কণ্ঠ জোরালো হবে। এখানে পক্ষ আর বিপক্ষ নিয়ে টানাটানি বা রাজনীতি করার সুযোগ নেই। ‘পক্ষে’ কত বেশিজন জোরালো সমর্থন জানাবে সেটি শুধু হিসাবের ব্যাপার।
পরিবর্তন প্রত্যাশা করে আত্মোৎসর্গ করে গেছেন যারা তাদের স্বপ্ন পূরণে দৃঢ়চিত্ত হতে হবে। সবাইকে সমস্বরে পরিবর্তন চাইতে হবে, এখানে দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকার অবকাশ নেই। প্রতিপক্ষতা নিয়ে দ্বিধান্বিত হওয়ার ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। কাজের চেয়ে অকাজ নিয়ে মেতে থাকতে যারা ভালোবাসে, তাদের মাথায় এসব ধান্দা আসতেই পারে, এসব ধান্দায় ভোগা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্যও ‘পরিবর্তন’ চাওয়া দরকার।
সিলেটের গোলাপগঞ্জের হাছা চৌধুরী সত্য ও সুন্দরের পক্ষে সাদা মনের মানুষ। এ জন্য সবাই তাকে হাছা চৌধুরী বলে জানে। ১৮ কোটি মানুষের পক্ষে এই হাছা চৌধুরী চ্যাটজিপিটির মাধ্যমে জানতে পারেন, ভয়-ভীতি, সংশয়-সন্দেহ সৃষ্টির সব উদ্যোগ ঐক্যবদ্ধ সবার সমন্বিত প্রত্যাশার কাছে হেরে যাবেই। এ দৃঢ় বিশ্বাসে বলীয়ান জাতির সামনে ভয়ের কিছু নেই। অনেকে অনেক কথা বলবে, তীর্যক মন্তব্য ছুড়তে ছাড়বে না। এটিও পুরনো খাসলত। হাছা চৌধুরীর এক মেন্টর-মুরুব্বির মন্তব্য- এটি মনে রাখতে হবে মিডিয়ায় এবং অন্যান্য অনেক জায়গায়, অর্থাৎ ভেতরেই অতীতের ভূত-পেত্নিরা ভোল পাল্টিয়ে আছে। তারা পানি ঘোলা করার চেষ্টা তো করবেই। কিন্তু প্রত্যেককেই তার নিজের ভালো নিজেকেই বুঝতে হবে। অতীতে বহুবার বহুভাবে সবাইকে ঠকানো হয়েছে, ভূ-রাজনীতির ভায়রাভাইদের দিয়ে জুজুর ভয় দেখানো হয়েছে। ঘুঘুকে বারবার শস্য খেয়ে যেতে দেয়া যায় না। ঠকানোর বিরুদ্ধে কড়া প্রতিরোধ গড়ে ওঠা দরকার। পরিবর্তন প্রত্যাশার জয় হবেই। হতেই হবে।
সমাজে নানান উপায় ও উপলক্ষে এমন সব ঘটনাবলির উদ্ভব হয় যা সমাজের গতিপ্রকৃতির দিক-নির্দেশ করে। গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে সমাজ সমৃদ্ধ হয়। অবকাঠামোগত উন্নয়নের দ্বারা বিজ্ঞান ও সভ্যতার অনেক সুযোগ সহজে হাতের কাছে এসে যায়- ধ্যান-ধারণায় তা যেমন নতুন মাত্রা যোগ করে, মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠান ক্ষেত্রেও সূচিত হয় নানান সুযোগ। শোষণ-বঞ্চনা, বৈষম্যের অবসান ঘটাতে মানুষ সংগ্রাম করে, শোষণহীন বঞ্চনা বৈষম্যরহিত সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় বুক বাঁধে। প্রত্যাশা পূরণের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে দেখলে সংগ্রামের সার্থকতা সে খুঁজে পায়, উদ্দীপ্ত চেতনায় দীপান্বিত হয়ে ওঠে। তার এবং সবার ঐকান্তিক প্রয়াস প্রচেষ্টায় উন্নয়ন ও সংহতি সুদৃঢ় হয়ে ওঠে। আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশা পূরণের পরিতৃপ্তিতে তুষ্ট জনগোষ্ঠীকে কোনো বাদ-বিসংবাদ বিভ্রান্ত করতে পারে না। আগে যেমন বলা হয়েছে, মানুষ তার কর্মকাণ্ডের যৌক্তিকতা খুঁজে ফিরে নিজের নিরিখে। যদি দেখা যায়, ক্ষুদ্র ও খণ্ডিত স্বার্থবাদিতায় নানান বিভ্রান্তি ও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে তার আত্মত্যাগের মহৎ উদ্দেশ্যগুলো- তাহলে তার সক্রিয় অংশগ্রহণের যৌক্তিকতার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়। তার উদ্দেশ্য-অভিপ্রায়ের, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির খতিয়ানের আঙিনায় অপব্যাখ্যার আগাছা জন্ম হয়। প্রয়োজনে অনুরূপ সে আগাছা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সমাজের চলৎশক্তির জন্য সেটি এক নিদারুণ দুঃসংবাদ।
লেখক : উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক