‘কোথায় আছ?’এই প্রশ্নের উত্তর দিতে এখন আর ফোন করে জায়গার নাম বলতে হয় না। এক ক্লিকেই পাঠানো যায় নিজের লাইভ লোকেশন। পরিবারকে নিরাপদে পৌঁছানোর খবর জানানো কিংবা বন্ধুকে নিজের অবস্থান জানানো স্মার্টফোনের লোকেশন শেয়ারিং সুবিধা জীবনকে অনেক সহজ করেছে। তবে এই সুবিধা যখন ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহের সাত দিন চালু থাকে, তখন প্রশ্ন উঠছে, নিজের ব্যক্তিগত জীবনের কতটুকু আসলে অন্যের হাতে তুলে দিচ্ছেন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনের সময় লোকেশন শেয়ার করা নিরাপত্তার জন্য বেশ কার্যকর। তবে সবসময় এটি চালু রাখা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানসিক স্বাধীনতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সারাক্ষণ নিজের অবস্থান প্রকাশ করার প্রবণতা ভবিষ্যতে ডিজিটাল নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

নিরাপত্তার জন্য শুরু, নজরদারির ঝুঁকি

শুরুতে লোকেশন শেয়ারিং প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল নিরাপত্তা। একা ভ্রমণ, রাতে বাড়ি ফেরা, অপরিচিত কারও সঙ্গে প্রথমবার দেখা কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত নিজের অবস্থান জানাতে এটি বেশ কার্যকর।



যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিপণন বিশেষজ্ঞ ব্রিটানি গার্সিয়ার মতে, সচেতনভাবে লোকেশন শেয়ার করলে এটি নিরাপত্তার জন্য উপকারী হতে পারে। তবে সবার সঙ্গে সবসময় অবস্থান ভাগ করে রাখার প্রয়োজন নেই।

সমস্যা তৈরি হয়, যখন নিরাপত্তার এই সুবিধা ধীরে ধীরে সম্পর্কের ‘বিশ্বাসের পরীক্ষা’ হয়ে দাঁড়ায়।

কখন লোকেশন শেয়ার করা উপকারী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে লোকেশন শেয়ার করা নিরাপত্তা বাড়াতে পারে-

অপরিচিত কারও সঙ্গে প্রথমবার দেখা করতে গেলে।

একা বা দূরপাল্লার ভ্রমণের সময়।

রাতে একা যাতায়াতের ক্ষেত্রে।

জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে।

পরিবার বা বন্ধুকে নিরাপদে পৌঁছানোর খবর জানাতে।

কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত নিজের অবস্থান জানাতে।

তবে প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে লোকেশন শেয়ারিং বন্ধ করে দেওয়াই নিরাপদ অভ্যাস।

‘সবসময় অন’ রাখলেই কি সম্পর্ক ভালো থাকে?

অনেক পরিবার, বন্ধু বা দম্পতির মধ্যে এখন এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, ঘনিষ্ঠ মানুষ হলে তার লোকেশন সবসময় দেখা যাবে। আর এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের মানসিক চাপ।

যুক্তরাষ্ট্রের লোমাস হসপিটালিটির মহাব্যবস্থাপক অস্কার মেলেন্দেজের মতে, লোকেশন শেয়ারিং এখন অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দের চেয়ে সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ফলে কেউ লোকেশন বন্ধ করলেই প্রশ্ন উঠতে পারে ‘কোথায় গেলে?’, ‘লোকেশন বন্ধ করলে কেন?’ কিংবা ‘কিছু লুকাচ্ছ কি?’ এ ধরনের পরিস্থিতি ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করতে পারে।

ছুটিতেও যেন পিছু না ছাড়ে ‘ডিজিটাল নজরদারি’

লোকেশন শেয়ারিংয়ের আরেকটি দিক হলো মানসিক স্বাধীনতা। বাইরে ঘুরতে গেলে কিংবা ছুটিতে থাকলে অনেকে কিছু সময়ের জন্য লোকেশন বন্ধ রাখার সুযোগ পান। অথচ স্বাভাবিক জীবনেও নিজের অবস্থান সম্পর্কে সবসময় জানিয়ে রাখার কোনো বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্ক যত ঘনিষ্ঠই হোক, ব্যক্তিগত পরিসরের প্রয়োজন রয়েছে। তাই লোকেশন শেয়ার করা আর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মধ্যে একটি স্বাস্থ্যকর সীমারেখা থাকা জরুরি।

তরুণদের জন্য বাড়ছে গোপনীয়তার ঝুঁকি

লোকেশন শেয়ারিংয়ের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে জেন-জি ও কিশোর-কিশোরীদের ওপর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কে কোথায় আছে, কখন কোথায় যাচ্ছে এসব তথ্য প্রকাশ করা এখন অনেকের কাছেই স্বাভাবিক বিষয়।

স্ন্যাপচ্যাটের ‘স্ন্যাপ ম্যাপ’ চালুর পর তরুণদের মধ্যে বন্ধুদের অবস্থান দেখার প্রবণতাও আরও দৃশ্যমান হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ছোটবেলা থেকেই সারাক্ষণ নিজের অবস্থান প্রকাশ করতে করতে অনেকেই হয়তো বুঝতেই পারছে না, এর দীর্ঘমেয়াদি গোপনীয়তা ঝুঁকি কতটা।

কারণ, একজন ব্যক্তি কোথায় যান, কখন যান এবং কতক্ষণ সেখানে থাকেন এই তথ্যগুলো একত্র হলে তার দৈনন্দিন জীবনযাত্রার একটি পরিষ্কার ছবি তৈরি হতে পারে। সাইবার অপরাধ ও ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের সময়ে এমন তথ্য ভুল হাতে পড়লে তা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

তাহলে সীমারেখা কোথায়?

প্রযুক্তি নিজে সমস্যা নয়, বরং সেটি ব্যবহারের ধরনই আসল বিষয়। নিরাপত্তার প্রয়োজন হলে লোকেশন শেয়ার করুন, কিন্তু সম্পর্কের গভীরতা প্রমাণ করতে সারাক্ষণ এটি চালু রাখার প্রয়োজন নেই।

প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লোকেশন শেয়ার করুন।

কাজ শেষ হলে লাইভ লোকেশন বন্ধ করুন।

কার সঙ্গে লোকেশন শেয়ার করছেন, তা নিয়মিত যাচাই করুন।

অপ্রয়োজনীয় অ্যাপকে লোকেশন ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়াই ভালো।

পরিবার বা সঙ্গীর সঙ্গে লোকেশন শেয়ারিং নিয়ে আগে থেকেই ব্যক্তিগত সীমারেখা ঠিক করে নিন।

এক ক্লিকের লোকেশন শেয়ারিং যেমন বিপদের সময়ে জীবন বাঁচাতে পারে, তেমনি অপ্রয়োজনে সারাক্ষণ চালু রাখলে ব্যক্তিগত জীবনের পরিসরও ছোট করে দিতে পারে। তাই ‘লোকেশন অন’ মানেই নিরাপদ এমন নয়। কখন, কেন এবং কার সঙ্গে নিজের অবস্থান ভাগ করছেন, সেটিই আসল বিষয়। নিরাপত্তার পাশাপাশি নিজের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকেও গুরুত্ব দিন। কারণ, সবসময় কোথায় আছেন, তা সবাইকে জানানো আপনার দায়িত্ব নয়।



আরটিভি/এসকে







আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে





আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews