মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন

সময় মানুষের জীবনে অনেক ক্ষত শুকিয়ে দেয়, অনেক শোককে স্তব্ধ নীরবতায় রূপ দেয়। কিন্তু কিছু প্রস্থান থাকে, যা সময়ের প্রবাহেও ম্লান হয় না; বরং অনুপস্থিতির গভীরতা দিন দিন আরও প্রকট হয়ে ওঠে। আমাদের প্রিয় ওবায়েদ ভাই; ড. আ জ ম ওবায়েদুল্লাহ এমনই এক মহিমান্বিত মানুষ, যার বিদায় শুধু একটি মানুষকে হারানোর বেদনা নয়, বরং এক আলোকিত যুগচেতনার অবসানের অনুভূতি।

১১ মে ছিল তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। ঠিক এক বছর আগে তিনি এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর বন্ধন ছিন্ন করে মহান রবের সান্নিধ্যে পাড়ি জমিয়েছেন। অথচ এখনো মনে হয়, তিনি যেন খুব কাছেই আছেন; কোনো সভায় তাঁর প্রজ্ঞাদীপ্ত বক্তব্য শুনবো, কোনো প্রয়োজনে তাঁর স্নেহময় পরামর্শ পাব, কিংবা হঠাৎ করেই সেই পরিচিত মৃদু হাসিতে হৃদয়ের ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে। কিন্তু নির্মম সত্য হলো, আর কোনোদিন তাঁর পাশে গিয়ে বসা হবে না, কোনো আবেগ কিংবা প্রয়োজন নিয়ে তাঁর দরজায় কড়া নাড়া হবে না। এই বাস্তবতা হৃদয়কে আজও ভারাক্রান্ত করে।

ড. আ জ ম ওবায়েদুল্লাহ ছিলেন বিরল গুণাবলির এক অসাধারণ সমাহার। প্রখর মেধা, গভীর মনন, সাংগঠনিক দক্ষতা, সৃজনশীল প্রতিভা এবং অসীম মানবিকতার সঙ্গে যে গুণটি তাঁকে অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে, তা হলো তাঁর বিনয়।

তিনি ছিলেন সেইসব মানুষের একজন, যাঁরা ব্যক্তিত্বের ঔজ্জ্বল্যে আলাদা হয়ে ওঠেন, কিন্তু আচরণের কোমলতায় হয়ে থাকেন সবার আপনজন। নেতৃত্ব তাঁর কাছে কখনো কর্তৃত্বের প্রকাশ ছিল না; বরং ছিল দায়িত্ব, মমতা ও নীরব প্রজ্ঞার এক সুশোভিত প্রকাশ।

তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, গবেষক, কবি, গীতিকার, সাংস্কৃতিক সংগঠক, শিক্ষাবিদ, মোটিভেশনাল স্পিকার এবং বহু ভাষায় পারদর্শী এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে তাঁর বিচরণ ছিল দীপ্তিময়। বিশেষত ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে সুসংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। শিক্ষাজীবন থেকেই তিনি আদর্শিক সংস্কৃতি চর্চাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং আমৃত্যু সে পথেই অবিচল থেকেছেন।

ড. ওবায়েদুল্লাহ শুধু একজন সংগঠক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক দূরদর্শী স্বপ্নস্রষ্টা। তিনি বিশ্বাস করতেন, সংস্কৃতি কেবল বিনোদনের বিষয় নয়; এটি জাতির আত্মপরিচয়, মূল্যবোধ ও চেতনার নির্মাতা। তাই তিনি সংস্কৃতিকে মানুষের আত্মিক জাগরণ ও নৈতিক বিকাশের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে দেখতেন। তাঁর হাত ধরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য তরুণ কর্মী, শিল্পী, লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি তরুণদের মাঝে আত্মবিশ্বাস, আদর্শ ও সৃজনশীলতার যে বীজ বপন করেছিলেন, তার ফল আজও সমাজের নানা স্তরে দৃশ্যমান। এ কারণেই তিনি ছিলেন তরুণ প্রজন্মের কাছে এক অনুকরণীয় আদর্শ ও নির্ভরতার প্রতীক।

তাঁর কথায় ছিল প্রজ্ঞার দীপ্তি, আর ব্যবহারে ছিল হৃদয়ের উষ্ণতা। তিনি যেমন গভীরভাবে ভাবতে পারতেন, তেমনি অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় তা প্রকাশ করতে পারতেন। একজন কবি হিসেবে তাঁর কবিতায় মানবতার আর্তি, আত্মিক সৌন্দর্য ও সমাজসচেতনতার অনুরণন ধ্বনিত হয়েছে। একজন লেখক হিসেবে তিনি স্বপ্ন, সংগ্রাম, আদর্শ ও আত্মশুদ্ধির কথা বলেছেন অনন্য মাধুর্যে। তাঁর রচিত “তরুণ তোমার জন্য” কিংবা “স্বপ্নের ঠিকানা” শুধু বই নয়, বরং প্রজন্মের জন্য প্রেরণার বাতিঘর।

পেশাগত জীবনেও তিনি ছিলেন অনন্য দক্ষতা ও সততার প্রতিচ্ছবি। আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠাকালীন রেজিস্ট্রার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠা, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে। পাশাপাশি বাংলাদেশ শিশুকল্যাণ পরিষদ, ফুলকুঁড়ি আসর, বয়েজ স্কাউট, রেড ক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। সমাজ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করাই যেন ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম অঙ্গীকার।

তাঁর ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল তাঁর অমায়িকতা। তিনি ছিলেন স্নেহশীল বড় ভাই, নির্ভরযোগ্য বন্ধু এবং একজন দরদী অভিভাবক। ব্যক্তিগতভাবে আমার জীবনে তাঁর অবস্থান ছিল আরও গভীর ও অবিচ্ছেদ্য। তিনি শুধু আমার ভাই ছিলেন না; ছিলেন পথপ্রদর্শক, সাহসের আশ্রয় এবং আলোকবর্তিকা। তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, আন্তরিক পরামর্শ ও নীরব মমতা আমার জীবনের অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।

ড. আ জ ম ওবায়েদুল্লাহর মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের শোক নয়; এটি গোটা জাতির সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর প্রস্থান মানে একজন স্বপ্নচারী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, একজন আদর্শ শিক্ষক, একজন মানবিক সংগঠক এবং একজন আলোকিত মানুষের বিদায়। কিন্তু মহৎ মানুষরা কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যান না। তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের কর্মে, আদর্শে, সৃষ্টিতে এবং মানুষের হৃদয়ে। ওবায়েদ ভাইও তেমনি বেঁচে থাকবেন তাঁর গড়ে যাওয়া মানুষদের মাঝে, তাঁর উচ্চারিত প্রজ্ঞাময় কথাগুলোতে, তাঁর সৃষ্ট সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারায়।

তাঁর চলে যাওয়ার পর সর্বস্তরের মানুষ একবাক্যে স্বীকার করেছেন. ওবায়েদুল্লাহ ছিলেন এ দেশের ইসলামী সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ দিকপাল। প্রিয় কবি মতিউর রহমান মল্লিক যে সাংস্কৃতিক ধারা সূচনা করেছিলেন, ড. ওবায়েদুল্লাহ সেটিকে সাংগঠনিক ভিত্তি, ব্যাপ্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে দেশীয় ও মূল্যবোধভিত্তিক সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছেছে নতুন ব্যঞ্জনা ও নবতর প্রাণশক্তি নিয়ে।

তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অশ্রুসিক্ত হৃদয়ে তাঁকে স্মরণ করছি। মহান আল্লাহর দরবারে বিনীত প্রার্থনা-

হে পরম দয়ালু আল্লাহ,

আমাদের প্রিয় ওবায়েদ ভাইকে আপনার অসীম রহমতের চাদরে আচ্ছাদিত করুন।

তাঁর কবরকে নূরের বাগানে পরিণত করুন।

তাঁর সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন।

তিনি যেমন মানুষের হৃদয়ে প্রজ্ঞা, সৌন্দর্য, ভালোবাসা ও মানবিকতার আলো ছড়িয়ে গেছেন, তেমনি আপনি তাঁর আত্মাকে চিরশান্তির অনন্ত আলোয় আলোকিত করুন। তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো পূরণের তাওফিক আমাদের দান করুন এবং তাঁর রেখে যাওয়া প্রতিটি কল্যাণকে তাঁর নাজাতের উসিলা হিসেবে কবুল করুন।

লেখক : সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী, ফ্রান্স।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews