আকাশ পুরোপুরি পরিষ্কার, ছিল না কোনো বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসও। অথচ চোখের পলকে পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে এলো কাদা, পাথর আর বরফের এক বিধ্বংসী স্রোত। নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলে ঘটে যাওয়া এই বিরল হিমবাহ ধস (Glacial Collapse) ও আকস্মিক বন্যায় তলিয়ে গেছে একের পর এক লোকালয়। ভয়াবহ এই বিপর্যয়ে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৬০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্যানুযায়ী, শিশু ও ৮০০ জনেরও বেশি বিদেশি পর্যটকসহ নিখোঁজ রয়েছেন ১,৫০০-র বেশি মানুষ। প্রধান প্রধান সেতু ও মহাসড়ক ধসে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধারকর্মীদের পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন প্রশাসনিক কর্মকর্তারা।
ভূমিকম্প নাকি হিমবাহ ধস?
বন্যার প্রাথমিক মুহূর্তে কোনো বৃষ্টিপাত না থাকায় ধারণা করা হচ্ছিল, ৪.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের প্রভাবেই হয়তো এই বিপর্যয়। তবে ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে (USGS) ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন, ভূমিকম্প এই বন্যার কারণ নয়; বরং বিশাল আকারের হিমবাহ ধসে হাজার হাজার টন বরফ ও পাথর নিচে আছড়ে পড়ার কারণেই সেই ভূকম্পন অনুভূত হয়েছিল।
ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ সায়েন্টিস্ট ড্যান শুগার উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে জানান, প্রায় ৫,২০০ মিটার উচ্চতায় হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে প্রায় ১,২০০ মিটার নিচে উপত্যকায় আছড়ে পড়েছিল। তিব্বতের লহেন্দে নদীতে বরফ ও পাথরের এই ধসের পর সেই পানি ও কাদার স্রোত দ্রুত নেপালের রসুয়া জেলা হয়ে ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে পড়ে। মাত্র ৩০ মিনিটে ত্রিশূলী নদীর পানি প্রায় ৯ মিটার (২৭ ফুট) পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
হিমবাহ ধস বা ‘গ্লেসিয়ার কলাপস’ কী?
সহজ কথায়, পর্বতগাত্রে থাকা বিশাল আকৃতির হিমবাহ যখন তার তলদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তীব্র গতিতে নিচে নেমে আসে, তাকেই হিমবাহ ধস বলা হয়। এর ফলে লাখ লাখ ঘনমিটার বরফ, পাথর, কাদা ও পানি এক হয়ে অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করে।
হাইড্রোলজিস্টদের মতে, কাদা ও পানির মিশ্রণে তৈরি এই প্লাবণের গতি এত বেশি থাকে যে তা ‘তরল কনক্রিটের’ মতো কাজ করে। আগাম কোনো বৃষ্টিপাত ছাড়া এমন ঘটনা ঘটলে পূর্বাভাস দেওয়ার মতো সনাতন কোনো ব্যবস্থা কাজ করে না এবং কোনো বাহন বা পদে হেঁটে আত্মরক্ষার সুযোগ পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
নেপথ্যে কি বিশ্ব উষ্ণায়ন?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিন্দু কুশ হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ দ্রুত গলেছে। জাতিসংঘের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে গত তিন দশকে নেপালের হিমবাহগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ গলে গেছে।