আমাদের দেশের উন্নয়ন ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিওগুলোর ভূমিকা দীর্ঘদিনের। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন থেকে শুরু করে দুর্যোগ মোকাবেলা—সবখানেই তাদের সরব উপস্থিতি চোখে পড়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন জোরালো হয়ে উঠেছে: আমাদের এনজিওগুলো কি আসলেই সমাজের তৃণমূল মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন বুঝে কাজ করছে, নাকি তাদের সমস্ত কর্মকাণ্ড দাতা সংস্থাগুলোর ফান্ডের খামখেয়ালিপনার ওপর নির্ভরশীল?

সম্প্রতি দেশের স্বাস্থ্য খাতে একটি বড় বিপর্যয় আমাদের চোখের সামনে ঘটে গেল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হামের প্রকোপে দেশে এপর্যন্ত প্রায় সোয়া ছয়শ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একটি স্বাধীন, উন্নয়নশীল দেশে একবিংশ শতাব্দীতে এসে হামের মতো নিরাময়যোগ্য এবং প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগে এত বিপুলসংখ্যক শিশুর প্রাণহানি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং উদ্বেগজনক। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই এত বড় একটা মানবিক সংকটের সময়েও দেশের বড় বড় এবং নামী-দামী এনজিওগুলোর কোনো তৎপরতা বা জোরালো বক্তব্য চোখে পড়েনি। এমনকি ন্যূনতম আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি। যে এনজিওগুলো সামান্য বিষয়েও গোলটেবিল বৈঠক, সেমিনার আর প্রেস কনফারেন্সে মুখর থাকে, মানববন্ধন আর সমাবেশে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মুখের ফেনা তুলে ফেলে, এই সাড়ে ছয়শ শিশুর মৃত্যুর মিছিলে তারা কেন সম্পূর্ণ নীরব?

এই নীরবতার মূলে লুকিয়ে আছে এনজিওগুলোর চরম ‘ফান্ড-নির্ভরতা’। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এনজিও খাতের একটি বড় অংশই স্বকীয়তা হারিয়ে করপোরেট ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। দাতা সংস্থাগুলো যে বিষয়ে অর্থ বরাদ্দ দেয়, এনজিওগুলো কেবল সেই বিষয়েই তোতা পাখির মতো শেখানো বুলি আওড়াতে থাকে, সেই বিষয়েই প্রকল্প সাজায়।

যদি কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা জলবায়ু পরিবর্তন, লিঙ্গ বৈষম্য বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে অর্থায়ন করে, তবে দেশের সব এনজিওর চোখ সেদিকেই নিবদ্ধ হয়। অথচ তার চেয়েও বড় কোনো সংকট—যেমন এই হামের প্রকোপ বা অপুষ্টি—যদি সমাজে বিদ্যমান থাকে, তাও তারা এড়িয়ে যায়। কারণ, সেই সংকটের পেছনে কোনো ‘ফান্ড’ বা বিদেশি অনুদান নেই। ফলে, জনস্বার্থের চেয়ে দাতা সংস্থার এজেন্ডাই এখানে প্রধান হয়ে উঠছে। মানবিকতা যেন মূল্যহীন।

উন্নয়ন খাতের এই সংস্কৃতি সমাজের জন্য এক ধরণের শুভঙ্করের ফাঁকি। এনজিওগুলোর জন্ম হয়েছিল রাষ্ট্রের পাশাপাশি থেকে সমাজের প্রান্তিক মানুষের অধিকার ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য। তারা যদি কেবল ফান্ডের লোভে নিজেদের এজেন্ডা পরিবর্তন করে এবং দেশের প্রকৃত সংকট নিয়ে মুখ না খোলে, তবে তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গাটি কোথায় থাকে? সোয়া ছয়শ শিশুর এই অকাল মৃত্যু আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাকে যেমন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, তেমনি আমাদের তথাকথিত সুশীল সমাজ ও এনজিওগুলোর সুবিধাবাদী নীরবতাকেও নগ্ন করে দেয়।

একটি সুস্থ ও সচেতন সমাজ গঠনে এনজিওগুলোকে এই বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসতে হবে। প্রকল্প-নির্ভর ব্যবসার ঊর্ধ্বে উঠে দেশের মাটি ও মানুষের আসল প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিতে হবে। দাতা সংস্থাদের এজেন্ডার পেছনে না ছুটে, দেশের ভেতরের প্রকৃত সংকটগুলো চিহ্নিত করে সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং জনগণকে সচেতন করাই হওয়া উচিত তাদের মূল লক্ষ্য।

আমরা আশা করব, আগামী দিনে যেকোনো জাতীয় সংকটে এনজিওগুলো কেবল ফান্ডের হিসাব না কষে, মানুষের পাশে এসে দাঁড়াবে। অন্যথায়, জনবিচ্ছিন্ন এই উন্নয়ন খাতের ওপর সাধারণ মানুষের যেটুকু আস্থা অবশিষ্ট আছে, তাও অচিরেই হারিয়ে যাবে।

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews