২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপকে ঘিরে টিকিট ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্কের মুখে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে টরন্টোর মেয়র অলিভিয়া চাউয়ের কার্যালয়। সমালোচনার জবাবে তারা জানিয়েছে, সাধারণ দর্শকদের জন্য বরাদ্দ টিকিট কর্পোরেট স্পন্সর ও আতিথেয়তা প্যাকেজের অংশ হিসেবে বিক্রি করার সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য হলো টুর্নামেন্ট আয়োজনে করদাতাদের ওপর আর্থিক চাপ যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা।
মেয়রের কার্যালয়ের দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপ আয়োজনকারী প্রতিটি শহরকে অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহের সুযোগ করে দিতে ফিফা স্থানীয়ভাবে বরাদ্দ টিকিটের সর্বোচ্চ ১.৫ শতাংশ কেনার অনুমতি দিয়েছে। এই টিকিটগুলো কর্পোরেট স্পন্সরশিপ, ভিআইপি আতিথেয়তা, দাতা (ডোনার) প্যাকেজ এবং অন্যান্য বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে বাজারজাত করা যায়। সেই নীতির আওতাতেই টরন্টো সিটি নির্দিষ্টসংখ্যক টিকিট সংগ্রহের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
- Advertisement -
সিটি হলের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পরিকল্পনা নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নয়। ২০২৫ সালেই টরন্টো সিটি কাউন্সিল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে কর্পোরেট আতিথেয়তা ও ডোনার প্যাকেজ তৈরির প্রস্তাব অনুমোদন করে। একইসঙ্গে কাউন্সিল এমন ব্যবস্থারও অনুমতি দেয়, যাতে সিটির হয়ে নির্ধারিত কোনো ভেন্ডর এসব টিকিট পুনরায় বিক্রি করতে পারে। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়াটি আগেই কাউন্সিলের অনুমোদনের মধ্য দিয়েই চূড়ান্ত হয়েছিল।
বিশ্বকাপ আয়োজনকারী আরেক কানাডীয় শহর ভ্যানকুভারও একই ধরনের নীতি অনুসরণ করছে। শহর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা প্রায় ৯ হাজার টিকিট কিনেছে এবং এর অধিকাংশই ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ স্পন্সরশিপ প্রোগ্রামের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে। তাদের যুক্তিও একই এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিটির জন্য অতিরিক্ত রাজস্ব নিশ্চিত করা এবং আয়োজনের ব্যয় আংশিকভাবে সমন্বয় করা।
তবে এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন অন্টারিওজুড়ে টিকিট পুনর্বিক্রি নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। উচ্চমূল্যে টিকিট বিক্রির প্রবণতা ঠেকাতে সম্প্রতি প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ডের সরকার ফেস ভ্যালুর চেয়ে বেশি দামে টিকিট পুনর্বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে। ফলে একদিকে সরকার অতিরিক্ত দামে টিকিট বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, অন্যদিকে বিশ্বকাপের কর্পোরেট টিকিট বিক্রির পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
টরন্টো সিটির আর্থিক হিসাবও এই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য শহরের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৮ কোটি ডলার। এর মধ্যে ২০ কোটি ডলার প্রাদেশিক ও ফেডারেল সরকার অনুদান হিসেবে দিচ্ছে। বাকি প্রায় ১৮ কোটি ডলার সিটির নিজস্ব অংশ হিসেবে বহন করতে হবে।
মেয়র অলিভিয়া চাউয়ের কার্যালয় বলছে, এই অর্থের পুরোটা পৌর করদাতাদের ওপর চাপিয়ে দিতে মেয়র রাজি নন। তাই বিকল্প রাজস্বের উৎস তৈরি করাই প্রশাসনের লক্ষ্য। কর্পোরেট স্পন্সরশিপ, আতিথেয়তা প্যাকেজ এবং টিকিট বিক্রির মাধ্যমে যত বেশি অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব হবে, তত কম অর্থ পৌরকর থেকে ব্যয় করতে হবে।
তবে এই ব্যাখ্যা সত্ত্বেও সমালোচনা থামেনি। সমালোচকদের অভিযোগ, বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরের টিকিট সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। কর্পোরেট ক্রেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়ায় স্থানীয় ফুটবলপ্রেমীদের জন্য ম্যাচ দেখার সুযোগ আরও সীমিত হতে পারে। তাদের মতে, বিশ্বকাপ শুধু ব্যবসায়িক আয়োজন নয়; এটি সাধারণ দর্শকদের অংশগ্রহণেরও একটি আন্তর্জাতিক উৎসব।
এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আয়োজনকারী শহরগুলোর কিছু উদ্যোগ। বিশেষ করে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য লটারির মাধ্যমে ৫০ ডলারে এক হাজার টিকিট বরাদ্দ দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। সেই সিদ্ধান্তের পর অন্যান্য আয়োজক শহরের ওপরও সাধারণ নাগরিকদের জন্য স্বল্পমূল্যে টিকিট সংরক্ষণের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপ আয়োজনকারী শহরগুলোর সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুটি বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। একদিকে রয়েছে শত শত মিলিয়ন ডলারের আয়োজন ব্যয় কমানোর প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে রয়েছে সাধারণ ফুটবল সমর্থকদের জন্য টিকিট সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী রাখার সামাজিক দায়িত্ব। টরন্টো প্রশাসন আপাতত প্রথম লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে জনমতের চাপ বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে সাধারণ দর্শকদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ বা স্বল্পমূল্যের টিকিট কর্মসূচি চালুর দাবি আরও জোরালো হতে পারে।
সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার
- Advertisement -