অর্থনৈতিক সংকট, জ্বালানি সংকটসহ নানমুখী সংকটে দেশ এখন জেরবার অবস্থায় রয়েছে। সংকট ক্রমেই ঘণীভূত হচ্ছে। উন্নতির তেমন কোনো লক্ষণ যাচ্ছে না। দেশ ভয়ংকর সংকটের সম্মুখীন বলে পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। অস্বীকার করার উপায় নেই, বর্তমান সরকার দেশের ইতিহাসে এক কঠিনতম সময়ে ক্ষমতাসীন হয়েছে। অনেকটা অর্থশূন্য অবস্থায় যাত্রা শুরু করেছে। এর মধ্যে ইরানযুদ্ধে বৈশ্বিক জ্বালানিতেল সংকট দেশের জ্বালানি খাতকে ল-ভ- করে দিয়েছে। সংকট দিন দিন তীব্র বাড়ছে। জনগণের সমস্যার কথা বিবেচনা করে তেলের দাম না বাড়িয়ে সরকার এ খাতে শত শত কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। তবে এভাবে আর কতদিন ভর্তুকি দেবে? ভর্তুকি দিতে দিতে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে টান ধরেছে। সরকার অর্থসংগ্রহে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার কাছে সহায়তা চেয়েছে। এই সহায়তা পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি সংকট নিয়ে গতকাল শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) চট্টগ্রামে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ স¤পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি মজুত রয়েছে। এপ্রিল ও মে মাসের জন্য দেশে পূর্ণ মজুত রয়েছে। বর্তমানে জুন মাসের চাহিদা মাথায় রেখে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। তার এ কথার সাথে বাস্তবতার কোনো মিল জনগণ খুঁজে পাচ্ছে না। জনগণ দেখছে, জ্বালানি তেলের জন্য পাম্পগুলোতে যানবাহনের লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। পাঁচ-ছয় ঘন্টা লাইন ধরেও অনেকে তেল পাচ্ছে না। প্রতিমন্ত্রীর কথা অনুযায়ী, পর্যাপ্ত মজুত থাকলে, জ্বালানিতেলের জন্য গ্রাহকদের কেন এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে? বাস্তবতার সাথে মিল নেই, এ ধরনের বক্তব্য জনগণকে যেমন ক্ষুব্ধ করে, তেমনি সরকারের ভাবমর্যাদাও ক্ষুণœ হয়। অথচ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জ্বালানিতেল ব্যবহারে জনগণকে মিতব্যয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার এই আহ্বানে যাতে জনগণ সাড়া দেয়, তার জন্য মন্ত্রী-এমপিদের কাজ করতে হবে।

দেশের মানুষ বিএনপিকে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী করে ক্ষমতায় বসিয়েছে এই আশায় যে, দলটি সমস্যা ও সংকটের সমাধান করতে পারবে। তারা দলটির ওপর ভরসা করেছে। তাদের এই ভরসার মূল্য দেয়া ছাড়া বিকল্প নেই। সরকারের মেয়াদ মাত্র দুই মাস হলো। এই দুই মাস একটি সরকারের জন্য খুব বেশি সময় না হলেও ইতোমধ্যে মন্ত্রী-এমপিদের সাথে জনগণের দূরত্ব বেড়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তাদের হানিমুন পিরিয়ড যেন শেষ হচ্ছে না। অথচ তাদের প্রত্যেকের মনে রাখা উচিৎ, তারা কোনো শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর সরকার গঠন করেনি। এটা মনে রেখেই বিজয়ের স্বস্তির নিঃশ্বাস না ফেলে কষ্টে থাকা জনগণের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। আমরা দেখছি, তারা যেন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। সংকটকালে জনগণ যদি তাদের প্রতিনিধিদের কাছে না পায়, তখন তা তাদের কষ্টকে আরও বাড়িয়ে দেয়। অর্থনৈতিক দুরবস্থার মধ্যে জ্বালানিতেলের সংকট যে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে এবং মানুষের কষ্টের সীমা ছাড়িয়ে গেছে, এ সময়ে মন্ত্রী-এমপিদের জনগণের প্রতি সহমর্মী হওয়া জরুরি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানেরও আরও জনসম্পৃক্ত এবং জনগণের সাথে যোগাযোগ বাড়ানো উচিৎ। বলা বাহুল্য, জ্বালানি সংকটে দেশের ভঙুর অর্থনীতিকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, তা একজন সাধারণ মানুষেরও বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। কৃষিতে জ্বালানিতেল ও বিদ্যুৎ সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। শিল্পোৎপাদনে স্থবিরতা নেমে এসেছে। গতকাল একটি দৈনিকের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গরম বাড়তে না বাড়তেই গ্রামাঞ্চল দিনে ১০-১৪ ঘন্টা বিদ্যুৎবিহীন অবস্থা বিরাজ করছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় লোডশেডিং ২ হাজার মেগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, সামনে মানুষের দুর্ভোগের অন্ত থাকবে না। এমন পরিস্থিতিতে মন্ত্রী-এমপিদের যার যার অবস্থান থেকে সমস্যা ও সংকট নিরসন কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে তৎপর হওয়া বাঞ্ছনীয়। তাদেরকে এ কাজটি করতে দেখা যাচ্ছে না। তারা যেন হাতগুটিয়ে বসে আছে।

অন্যদিকে, দেশের এই সংকটকালে বিরোধীদল আন্দোলনের কর্মসূচি দিচ্ছে। জনগণকে জেগে উঠার আহ্বান জানাচ্ছে। বিরোধীদলের কর্মসূচি রাজনৈতিক হলেও অর্থনৈতিক সংকট জনগণের মধ্যে যে ক্ষোভের সঞ্চার করছে, তা এর সাথে যুক্ত হলে সরকারবিরোধী আন্দোলন বেগবান হওয়ার শঙ্কা রয়েছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনও কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না। এ আন্দোলনের সাথে হাসিনার শাসনামলে কষ্টে থাকা বিক্ষুব্ধ জনগণ যুক্ত হয়ে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ফেলে দিয়েছিল। এ বিষয়টি মাথায় রেখে সরকারের সতর্ক হওয়া জরুরি। সংকট উত্তরণে সরকারের চেষ্টা আরও জোরদার করা দরকার। চট্টগ্রাম বন্দরে বিপুল তেল নিয়ে গতকাল শুক্রবার ৩টি এবং আগামী রোববার আরও ১টি ট্যাংকারে মোট ১ লাখ ৪১ হাজার টন ডিজেল আসার কথা রয়েছে, যা দিয়ে প্রায় ১২ দিনের চাহিদা মেটানো যাবে। ৪টি ট্যাংকারের ডিজেল খালাস হলে মজুতের পরিমান প্রায় ২ লাখ ৯৬ হাজার টন হবে, যা প্রায় ২৫ দিনের চাহিদা পূরণ করবে। এদিকে, রাশিয়া থেকে জ্বালানিতেল কিনতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ৬০ দিনের অনুমতি দিয়েছে। এতে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে।

দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট যেভাবে একীভূত হচ্ছে, তা খুবই উদ্বেগজনক। এতে যদি সরকার টালমাটাল অবস্থার মধ্যে পড়ে, তা বিস্ময়কর কিছু হবে না। আমরা বারবার বলেছি, অর্থনৈতিক সংকট মানেই রাজনৈতিক সংকট। এ বিষয়টি সরকার যত দ্রুত উপলব্ধি করে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, ততই মঙ্গল। এজন্য প্রত্যেক মন্ত্রী-এমপিকে জনগণের সাথে সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। তাদের সুখ-দুঃখের সাথী হতে হবে। দল হিসেবে বিএনপির নেতাকর্মীদেরকে সক্রিয় হয়ে জনগণের কাছে যেতে হবে। দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে জনগণের দোরগোড়ায় যেতে হবে, দলকেও সক্রিয় করতে হবে। দেশের অভিভাবককে যখন জনগণ তাদের কাছে পায়, তখন দুঃখের মাঝেও তাদের মুখে হাসি ফোটে, তারা আশ্বস্ত হয়। সরকার জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে তার টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। দেশের এই সংকটকালে ষড়যন্ত্রকারিরা যে বসে আছে, কিংবা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের সুযোগ নিয়ে সরকারকে বিপাকে ফেলতে চাইছে না, এমন বলা যায় না। তার আলামত ইতোমধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে। তারা বুঝতে পারছে, সরকার বিপদে আছে। এ সুযোগ তারা নিশ্চিতভাবেই নেবে। বিপদে পড়লে আমাদের মতো দেশগুলোর সরকার নার্ভাস হয়ে পড়ে। এতে বেফাঁস মন্তব্য ও সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে। এ ব্যাপারে সরকারকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews