কানাডার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আবারও তীব্র বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে দেশটির যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ। কনজারভেটিভ নেতা পিয়েরে পয়লিয়েভর প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন যে, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কানাডিয়ানদের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
রোববার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রায় ১০ মিনিটের একটি ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রী কার্নি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক দেশটির অন্যতম বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় সেই নির্ভরশীলতাই এখন দুর্বলতার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
- Advertisement -
কার্নি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, অতীতের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে বসে থাকা কানাডার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুরোনো সম্পর্ক আগের মতো ফিরে আসার অপেক্ষায় না থেকে কানাডাকে নিজেদের বাণিজ্যিক কৌশল বদলাতে হবে। বিশেষ করে, নতুন বাজার খোঁজা এবং বাণিজ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
এর পরদিন সোমবার প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় পয়লিয়েভর কার্নির বক্তব্যকে “অসময়পযোগী” বলে আখ্যা দেন। তার দাবি, প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করছেন বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির মতো জরুরি অর্থনৈতিক সমস্যা থেকে।
পয়লিয়েভর বলেন, “ভয় তৈরি করে এবং পুরোনো বক্তব্য নতুনভাবে তুলে ধরে সরকার তাদের ব্যর্থতা ঢাকতে চাইছে।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার আবাসন সংকট মোকাবিলা, বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কার্যকর বাণিজ্য আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।
তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কষ্টের প্রসঙ্গ গ্রোসারি স্টোরের উচ্চ দাম, গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চাপ। তার ভাষায়, “মানুষ এখন বাস্তব ফলাফল চায়, কোনো রাজনৈতিক গল্প নয়।”
এই বিতর্ক শুধু ফেডারেল পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নেই; প্রাদেশিক নেতৃত্বের মধ্যেও মতভেদ স্পষ্ট। রব ল্যান্টজ মনে করেন, কার্নির বক্তব্য যথেষ্ট শক্তিশালী নয় এবং তিনি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক সম্পর্কের সম্ভাবনা দেখেন। অন্যদিকে, আর.জে. সিম্পসন কার্নির বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সত্যিই কানাডার জন্য দুর্বলতা তৈরি করতে পারে।
ডাগ ফোর্ড বাণিজ্য বৈচিত্র্যকরণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন, যা কার্নির অবস্থানকে আংশিকভাবে সমর্থন করে। একইভাবে, সুজান হল্টও প্রধানমন্ত্রী কার্নির বক্তব্যের সঙ্গে একমত হন।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ থেকে স্পষ্ট যে, কানাডার অর্থনৈতিক কৌশল এখন একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। একদিকে সরকার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিবর্তনের কথা বলছে, অন্যদিকে বিরোধীরা তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলছে।
কার্নির অবস্থান মূলত একটি “স্ট্র্যাটেজিক শিফট” যেখানে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আরও বহুমুখী বাণিজ্য কাঠামোর দিকে যেতে চায়। অন্যদিকে পয়লিয়েভরের বক্তব্য বেশি “পপুলিস্ট ইকোনমিক ফোকাস” যেখানে সাধারণ মানুষের বর্তমান আর্থিক চাপকে প্রধান ইস্যু হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, কানাডার ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পথনির্দেশ নিয়ে মতবিরোধ এখন স্পষ্ট ও তীব্র। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক যা একসময় নিঃসন্দেহে শক্তির প্রতীক ছিল তা এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। এই বিতর্ক আগামী দিনে কানাডার নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
- Advertisement -