তীরে এসে তরী ডুবানো বলে একটা কথা আছে। আবার মরুতে চলতে চলতে ক্লান্ত-শ্রান্ত মুসাফিরদের সামনে কখনো কখনো মরুদ্যান চোখে পড়ে। বাস্তবে তা মরুদ্যান নয়, মরিচিকা। কথাগুলো এ কারণে বললাম যে, দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি প্রবল প্রতিকূল ও প্রতাপশালী রাষ্ট্রীয় এবং দলীয় ফ্যাসিস্টশক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে দলটির নেতাকর্মীরা অসীম ত্যাগ স্বীকার করেছে। খুন, গুম, অপহরণ, হামলা-মামলা, গ্রেফতার, জেল-জুলুমসহ হেন কোনো নিপীড়ন-নির্যাতন নেই, যার শিকার হয়নি। ভারতের দাসী হয়ে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা বিএনপিকে নিঃশেষ করে দিতে চেয়েছিলেন। সে সময় কথায় কথায় আওয়ামী লীগের নেতারা বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে বলতেন, বিএনপি মুসলিম লীগে পরিণত হবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত আমার এক ঘনিষ্ট বন্ধু বলেছিলেন, বিএনপি বলে কোনো দল থাকবে না। তার কথা তখন বিশ্বাস করতে পারিনি। ভেবেছিলাম, এটা কখনো সম্ভব নয়। বিপুল জনসমর্থিত এত বড় একটি দলকে কি নিশ্চিহ্ন করা যায়! পরবর্তীতে দেখলাম, বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য হাসিনা তার রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে কীভাবে স্টিম রোলার চালিয়েছে। দলটিকে সভা-সমাবেশ করতে দেয়া দূরে থাক, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মানববন্ধনও করতে দেয়নি। নয়াপল্টনে বিএনপির কার্যালয়েও সংবাদ সম্মেলন করতে বাধা দেয়া হতো। বিএনপিকে ‘সন্ত্রাসী ও জঙ্গী দলের’ অপবাদ দিয়ে শীর্ষ নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে তৃণমূলের লাখ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে শত শত মামলা দিয়ে দৌড়ের ওপর রেখেছিল। তাদের নিঃশ্বাস ফেলারও সুযোগ দেয়া হয়নি। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে একশ’ থেকে পাঁচশ’ পর্যন্ত মামলা দেয়া হয়েছে। কোর্টকাচারিতে হাজিরা দিতে দিতেই তাদেরকে দিন গুজরান করতে হয়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করবে কখন? তাছাড়া কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করলেও পুলিশ ‘নাশকতা’র দোহাই দিয়ে অনুমতি দিত না। বিএনপির নেতাকর্মীদের শুধু মামলা-মোকদ্দমা দিয়েই ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার ক্ষান্ত হয়নি। বেছে বেছে গুরুত্বপূর্ণ নেতাকর্মীদের গুম ও হত্যা করেছে। বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বিভিন্ন মামলায় সাজা দিয়েছে। বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে নিয়ে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছিল। আজকে তাঁর যে শারিরীক অসুস্থতা, এর মূল কারণ তার প্রতি হাসিনার প্রতিহিংসা। তারেক রহমান যে দেশে আসতে পারেননি বা পারছেন না, তার কারণও মামলা ও সাজা। এতকিছুর পরও হাসিনা বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি। এমনকি, দেড় যুগে দলটির কোনো নেতা নিজেকে রক্ষা করতে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়নি। তারা মরেছে, মামলা খেয়েছে, জেলে গিয়েছে, বছরের পর বছর ধরে বাড়িঘরছাড়া হয়েছে, ঢাকায় এসে রিকশা চালিয়েছে, তবুও তারা আপস করেনি। দেড় যুগ ধরে বিএনপির নেতাকর্মীদের এই আপসহীন সংগ্রাম ও ত্যাগের কথা সকলেরই জানা। তারপরও বলার কারণ হচ্ছে, গণঅভ্যুত্থানে হাসিনার পতনের পর দলটির একশ্রেণীর নেতাকর্মী যেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছে। আত্মভোলা হয়ে মনে করছে, ক্ষমতায় চেলে গেছে। অথচ নির্বাচন এখনো হয়নি। আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন বানচাল করা নিয়ে যে পর্দার অন্তরালে এবং প্রকাশ্যে ষড়যন্ত্র হচ্ছে এবং প্রতিপক্ষরা বিএনপিকে মাইনাস করার অনবরত চক্রান্ত ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে, এ ব্যাপারে তাদের কোনো হুঁশ-খেয়াল আছে বলে মনে হয় না।

দুই.
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বারবার দলটির নেতাকর্মীদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, আগামী নির্বাচন ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিনতম নির্বাচন হবে। তার এ কথা বিএনপির নেতাকর্মীরা যে উপলব্ধি করতে পারছে না, তা তাদের উদাসীনতা দেখে বোঝা যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে, বিএনপির দেড় যুগের অসীম ত্যাগের সংগ্রাম কি বিফল হয়ে যাবে? ক্ষমতা কি তাদের কাছে মরিচিকা হয়ে থাকবে? এ প্রশ্ন করা হচ্ছে এ কারণে যে, বিএনপির নেতাকর্মীরা ক্ষমতায় যাওয়ার ঘোরের মধ্যে রয়েছে। তাদের ঘুম ভাঙছে না। অন্যদিকে, তার প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠা দল বছরের পর বছর তার সঙ্গে থেকে শক্তি অর্জন করে কিংবা জোঁকের মতো লেগে থেকে রক্ত শুঁষে ফুলেফেঁপে ওঠে এখন তারই চরম বিরোধী হয়ে উঠেছে। দলটি পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রগুলো দখল করে ক্ষমতা যেমন উপভোগ করে নিজেকে দ্রুত গুছিয়ে নিচ্ছে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার সমর্থক এবং পেইড এজেন্টরা বিএনপির পিন্ডি চটকে যাচ্ছে। বিএনপির নেতাকর্মী, সমর্থকÑকাউকেই এগুলোর জবাব বা মোকাবেলা করতে দেখা যাচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে দুয়েকজন ইউটিউবার বিএনপির হয়ে কথা বলেন, দেখা যায়, তাদের কমেন্ট বক্সে গিয়ে ঐ দলটির গুপ্ত বাহিনী অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে। এই গালিগালাজ পার্টিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘বটর বাহিনী’ বলা হয়। তারা এতটাই শক্তিশালী যে, এই মাধ্যমের সর্বত্র তারা বিচরণ করে কীভাবে বিএনপির এন্তার বদনাম করা যায় এবং যারা বিএনপির পক্ষে কথা বলে তাদেরকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে দমানো যায়, এই মিশন চালিয়ে যাচ্ছে। বিএনপির বিরুদ্ধে তাদের এই প্রপাগান্ডা সচেতন মানুষ বুঝতে পারলেও গ্রামে-গঞ্জে থাকা সাধারণ মানুষ (যাদের হাতে হাতে মোবাইল রয়েছে) বা এ প্রজন্মের শিক্ষিত তরুণ ভোটার শ্রেণী, যারা রাজনীতি সম্পর্কে খুব একটা খোঁজখবর রাখে না, তাদের কাছে সত্যি বলে মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এসব প্রপাগান্ডায় প্রভাবিত হয়ে তাদের বিএনপিবিরোধী হয়ে যাওয়াও বিচিত্র কিছু নয়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বিশ্ব যোগাযোগের এই মাধ্যমে বিএনপির তৎপরতা বলতে কিছু নেই। এমনকি, যেসব গুরুত্বপূর্ণ ইউটিউবার বিএনপির পক্ষে কথা বলেন, তাদের মন্তব্যের ঘরে গিয়েও তাদের সমর্থনে মন্তব্য করতে দেখা যায় না। কেবল ‘বটর বাহিনী’র অশ্রাব্য মন্তব্য দেখা যায়। অস্বীকার করার উপায় নেই, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিএনপিবিরোধী এই ক্যাম্পেইন তার যেমন ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ করছে, তেমনি তার ক্ষমতায় যাওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বাধা বিএনপি কীভাবে অতিক্রম করবে, তাই এখন দেখার বিষয়। শুধু এই বাধাই নয়, বিএনপির সবচেয়ে বড় বাধা তার নেতাকর্মীদের ‘রিলাক্ট্যান্ট’ এবং নির্বাচন হলেই ক্ষমতায় চলে যাব মনোভাব। অন্যদিকে, দলটির একশ্রেণীর নেতাকর্মীর চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপকর্ম এবং বিতর্কিত বক্তব্যও বদনাম ছড়াচ্ছে। কারণ হচ্ছে, কোনো একটি অঞ্চলে একজন বিএনপি নেতা যিনি দলের জন্য খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নন, তার অপকর্মের ভিডিও যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া হয়, তখন এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পুরো দলের ওপর পড়ে। অসংখ্য মানুষ তা দেখে বিএনপির ওপর বিরূপ হয়ে উঠে। তাদের মনে এই ধারণার জন্ম দেয়, এখনই এই অবস্থা, ক্ষমতায় গেলে না জানি কী করে! আগামী নির্বাচন নিয়ে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি জরিপ প্রকাশিত হয়েছে। এসব জরিপে দেখা গেছে, বিএনপি ও তার প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠা জামায়াতে ইসলামীর ভোট খুব কাছাকাছি। গত বছরের নভেম্বরে একটি প্রতিষ্ঠানের করা জরিপ ও তার সাম্প্রতিক জরিপের সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে, বিএনপি ও জামায়াতের ভোট কমেছে। তবে জামায়াত বিএনপির ব্যবধান খুব কম। দুই-আড়াই পার্সেন্ট। এসব জরিপ দেখে মনে হয়, জামায়াত আরেকটু ধাক্কা দিলেই বিএনপি পড়ে যাবে এবং সে ক্ষমতায় চলে যাবে। এটা মানুষকে প্রভাবিত করার একটা সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া এবং উদ্দেশ্যমূলক। এর লক্ষ্য হচ্ছে, মানুষের মনে বিএনপি সম্পর্কে এই মনোভাব ঢুকিয়ে দেয়া যে, দিন দিন বিএনপির জনপ্রিয়তা কমছে। নির্বাচনের আগে দলটির ভারডুবি হবে। যদি কোনো ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আগামী নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী না হয়, তখন বলে দেয়া যাবে, জরিপে এই ফলাফল আগেই তুলে ধরা হয়েছিল। জরিপের এই কৌশল যে, বিএনপিকে মাইনাস করার সুদূরপ্রসারি কৌশল, তা বোঝা যায়। তবে এই জরিপকে হালকাভাবে নেয়া ঠিক হবে না। এই জরিপ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিএনপি বিরোধী যে প্রপাগান্ডা চলছে, নির্বাচনের আগের দিনগুলোতে বিএনপির জনপ্রিয়তা ধরে রাখা এবং বৃদ্ধি করার উদ্যোগ দলটির পক্ষ থেকে নিতে হবে। এজন্য করণীয় নির্ধারণ করতে পারে। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, এ ব্যাপারে বিএনপির কোনো উদ্যোগই পরিলক্ষিত হচ্ছে না। উদাসীন থাকলে বিএনপির বিজয়ের পথে এগুলোই বাধা হয়ে উঠবে।

তিন.
আগামী নির্বাচনে বিএনপি কেমন ফলাফল করবে, তার একটি ইন্ডিকেটর হতে পারে ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিতব্য ঢাকসু নির্বাচন। এই ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে, তরুণ শিক্ষিত প্রজন্ম বিএনপিকে কীভাবে দেখে। যদিও এ নির্বাচন একেবারেই শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট, তারপরও এর প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে কিছুটা হলেও পড়বে। কারণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের একটি পকেট, যেখানে সব এলাকার শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে। এলাকায় তাদের কিছু না কিছু প্রভাব থাকে। এলাকার মানুষ তাদের সম্মানের চোখে দেখে এবং মতামতের মূল্যায়ণ করে। ফলে তাদের মতামতে তাদের পরিবার ও এলাকার ভোটাররা প্রভাবিত হতে পারে। অন্যদিকে, তারা প্রত্যেকেই কমবেশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয়। সেখানে তাদের মতামত প্রকাশিত হবে এবং তা ভোটারদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। ফলে ঢাকাসু নির্বাচনে ছাত্রদলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপির জন্য খুবই জরুরি। শুধু ঢাকসু নয়, জাকসু, চাকসু, রাকসুসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনগুলোতেও ছাত্রদলের ভাল ফলাফল করার বিকল্প নেই। এসব নির্বাচনের ফলাফল বিএনপির জন্য আগামী নির্বাচনের এক ধরনের সূচক হতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচন নিয়ে করা জরিপ কি সবসময় সঠিক ফলাফল দেয়? জরিপ কি মেনুপুলেট করা যায়? এসব প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, জরিপ সবসময় সঠিক চিত্র দেয় না। আবার পুরোপুরি সঠিক না হলেও নির্বাচনের ফলের কাছাকাছি পর্যন্ত যায়। উন্নত বিশ্বের জরিপের ফলাফলও যে সবসময় প্রতিফলিত হয় না। অনেক নির্বাচনেই তা দেখা গেছে। এবার আসি আমাদের দেশের বিগত সময়ের নির্বাচনের আগের জরিপ প্রসঙ্গে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর জরিপ ছাড়াই ধরে নেয়া হয়েছিল, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসছে। দলটি ক্ষমতায় যাওয়ার পুরো প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। অন্যদিকে, বিএনপি বিরোধীদলে বসবে এমন মানসিক প্রস্তুতি তার নেতাকর্মী ও সমর্থকরা নিয়ে রেখেছিল। দেখা গেল, সব ধারণা উল্টে আওয়ামী লীগের স্বপ্ন চুরমার করে বিএনপি বিজয়ী হয়েছে। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে দেশের গণমাধ্যমগুলোর জরিপে বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসবে। বিভিন্ন পত্রিকার জরিপে বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগ ১৭০ থেকে ২২০টি পর্যন্ত আসনে বিজয়ী হবে। পরবর্তীতে দেখা যায়, বিএনপি এককভাবে ১৯৩টি আসন পায় আর আওয়ামী লীগ পায় ৫৭টি। সর্বশেষ ২০১৮ সালের রাতের ভোটের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জরিপের ফলাফল উল্লেখ করে বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগ বিপুল জনসমর্থন নিয়ে আবার ক্ষমতায় আসবে। বাস্তবতা হচ্ছে, ওটা কোনো নির্বাচনই ছিল না। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসের নির্বাচনেও ৫ শতাংশ মানুষ ভোট পড়েনি। এমনকি আওয়ামী লীগের সমর্থকরাও ভোট দিতে যায়নি। ফলে জরিপগুলো যে ফরমায়েশি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল, তাতে সন্দেহ নেই। আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জরিপের ফলাফলেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে হাসিনার সময়ের ভুয়া জরিপের উদ্দেশ্য আর তার পতনের পরের জরিপের উদ্দেশ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকাশিত জরিপগুলো উদ্দেশ্যমূলক হলেও একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। বিগত একবছরে যে বিএনপির ভোটের হার কিছুটা কমেছে, তা বুঝতে জরিপ লাগে না। দলটির একশ্রেণীর নেতাকর্মীর অপকর্মের কারণে মানুষ তা বুঝতে পারে। তবে বিএনপির প্রকৃত ভোটের হার কত, তা বুঝতে হলে বিগত সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর ফলাফলের দিকে দৃষ্টি দিলে বোঝা যাবে। আমরা যদি, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির ভোটের হারের দিকে তাকাই তাহলে দেখব, ১৯৯১ সালে বিএনপি ৩০.৮১ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৪০টি আসন, ১৯৯৬ সালে ৩৩.৬২ শতাংশ ভোট পেয়ে ১১৬ আসন, ২০০১ সালে ৪০.৯১ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৯৩টি আসন এবং ২০০৮ সালে ৩২.৫০ শতাংশ ভোট পেয়ে ৩০টি আসন পেয়েছে। অর্থাৎ বিএনপি সবচেয়ে খারাপ ফলাফল করেও তার ভোটের হার কখনোই ৩০ শতাংশের নিচে নামেনি। বরং বেড়েছে। ২০০১ সালের নির্বাচনে দলটি সর্বোচ্চ ৪০.৯১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। বিএনপির ভোটের এই হার রাতারাতি ১০-১২ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কাও কম। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী যাকে আগামী নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ ভাবা হচ্ছে, সে ১৯৯১ সালে ১২.১৩ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৮টি আসন, ১৯৯৬ সালে ৮.৬২ শতাংশ ভোট পেয়ে ৩টি আসন, ২০০১ সালে ৪.২৮ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৭টি আসন এবং ২০০৮ সালে ৪.৭০ শতাংশ ভোট পেয়ে ২টি আসন পেয়েছে। অর্থাৎ জামায়াতে ইসলামী গড়ে সাড়ে ৭ শতাংশের বেশি ভোট কখনোই পায়নি। যদিও ভোটের হারের সাথে আসন সংখ্যা কমবেশি হওয়ার সম্পর্ক নেই (তা উপরের চিত্র দেখলে বোঝা যায়), তবুও আগামী নির্বাচনে জামায়াতের ভোট এবং আসন সরকার গঠন করার মতো হয়ে যাবে, এত ম্যাসিভ পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে যেসব জরিপ ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে এবং তাতে ভোটের হারে বিএনপি ও জামায়াত একেবারে কাছাকাছি রয়েছে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

চার.
ভোটের গড় হার যে, নির্বাচনে আসন পাওয়ার ক্ষেত্রে খুব বেশি প্রভাব ফেলে না, তা উপরের চিত্র থেকে বোঝা যায়। ভোটের হার বেশি হয়েও যেমন আসন সংখ্যা কমে, তেমনি একই হার বা তার সামান্য কিছু বেশি পেয়েও সরকার গঠন করার মতো আসন পাওয়া যায়। আগামী নির্বাচনে বিএনপির ক্ষেত্রে ভয়টি এখানেই। দেখা গেল নির্বাচনের গড় হার ঠিকই আছে, তবে সরকার গঠন করার মতো আসন পেল না। এর কারণ হচ্ছে, আসনভিত্তিক ভোটের হারের হেরফের হওয়া। কাজেই বিএনপিকে সরকার গঠন করার মতো বা তার বেশি আসন পেতে হলে তাকে আসনভিত্তিক ভোটের হারের ওপর নজর দিতে হবে। সেখানের ভোটারদের সন্তুষ্টি ও আস্থা অর্জনে অনেক বেশি কাজ করতে হবে। যদি দলটির নেতাকর্মীরা ‘আমরা ক্ষমতায় চলে গেছি’ এ মনোভাব নিয়ে থাকে, তাহলে গড় ভোটের হার বেশি হলেও তাদের স্বপ্নভঙ্গ হতে পারে। কাজেই, তাদেরকে নির্বাচনের আগেই হুঁশে ফিরতে হবে। আসনভিত্তিক ভোটের হার নিয়ন্ত্রণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একটি বড় হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এ মাধ্যমে যদি দলটি তার বিরুদ্ধে চলমান প্রপাগান্ডা মোকাবেলা এবং তার নিজস্ব প্রচারণা চালাতে কোনো সাইবার ফোর্স তৈরি না করে, তাহলে নির্বাচনী ফলাফলে এই মাধ্যম ব্যবধান গড়ে দিতে পারে। বিএনপির দীর্ঘ দেড় যুগের আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতীক্ষা ধুলোয় লুটিয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।
[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews