১৯৯০ সালের ১২ জানুয়ারি একটি লেখার মাধ্যমে দৈনিক ইনকিলাবে আমার এন্ট্রান্স হয়। লেখাটির শিরোনাম ছিলো, ‘সিরাজ শিকদারের সেই উক্তি: পিন্ডি ছেড়েছি, দিল্লী যাবো না’। তার পর ৩৬ বছর পার হয়ে গেলো। ওই লেখা ছাপা হওয়ার ৩৪ বছর পর মহানগরী ঢাকাসহ বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ওই আওয়াজটিই কিছুটা ভিন্ন রূপে ধ্বনিত ও প্রতিধ্বনিত হয়। জুলাই বিপ্লবে শোনা যায়, ঈষৎ পরিবর্তিত রূপে সেই একই স্লোগান, ‘দিল্লী না ঢাকা/ ঢাকা ঢাকা’। গত ৪ জুন দৈনিক ‘ইনকিলাবের’ ৪০ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই ৪০ বছর ধরে দৈনিক ইনকিলাব বিরতিহীনভাবে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর কলম চালিয়েছে। এজন্য ইনকিলাবকে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের রক্তচক্ষুর সামনে বহুবার পতিত হতে হয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাস লিখতে গেলে অনেকে প্রখ্যাত ভারতীয় নেতা গোপাল কৃষ্ণ গোখলের সেই কালজয়ী উক্তিটি স্মরণ করেন। মি. গোখলে বলেন, What Bengal thinks today, India thinks tomorrow. অর্থাৎ, ‘বাংলা আজ যা ভাবে, ভারত তা আগামীকাল ভাবে।’ ১৯০৫ সালে বেনারসে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের সন্মেলনে সভাপতির ভাষণে মি. গোখলে উপরোক্ত মন্তব্য করেন। তার এই বক্তব্যটি ছিলো বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে, অখ- বাংলার জন্য। হিন্দু সম্প্রদায়ের আন্দোলনের জন্য বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। কিন্তু সেই একই হিন্দু সম্প্রদায় ১৯৪৬ সালে সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, শরৎচন্দ্র বসু ও কিরণশঙ্কর রায়ের যুক্ত বাংলা আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করে। সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিমের যুক্ত বাংলার আন্দোলনকে দৃঢ়ভাবে সমর্তন জানান মুসলিম লীগ সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, মওলানা আকরাম খান, খাজা নাজিমুদ্দিন প্রমুখ। ব্রিটিশ রাজের সহায়তায় নেহরু ও সরদার প্যাটেল বাংলাকে ভাগ করেই ছাড়েন।
গোখলের ওই কথাটিরই সূত্র ধরে বলতে চাই, ‘ইনকিলাব আজ যা ভাবে সারা জাতি আগামীকাল তাই ভাবে।’ ইনকিলাব তার প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই বলে আসছে যে, ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীনতা দেওয়ার জন্য পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি। ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। ইন্দিরার এই যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার আসল কারণটি কী ছিলো? সেটি ফাঁস করে দিয়েছেন তার উচ্চ শিক্ষিত নাতনী লোকসভার সদস্য প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে আমেঠিতে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদি ইন্দিরা গান্ধীর জাতীয়তাবাদ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। অথচ, ইন্দিরা গান্ধীর প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ১৯৭১ সালে পাকিস্তান দুই ভাগ হয়েছিল। NDTV-র প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্যের সারাংশ এভাবেই দেওয়া হয়েছে।’
আরও স্পষ্ট ভাষায় ২০২৫ সালের দিল্লির এক নির্বাচনী সভায় প্রিয়াঙ্কা বলেন, ও am the grand daughter of Indira Gandhi, I have seen her break Pakistan into two parts. বাংলায়: ‘আমি ইন্দিরা গান্ধীর নাতনী। আমি দেখেছি, তিনি পাকিস্তানকে দুই ভাগ করে দিয়েছেন।’ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, ‘হাম হাজার সাল কা বদলা লিয়া’; অর্থাৎ, We have taken the revenge of a thousand years. তিনি আরো বলেছিলেন, We have drowned the two-nation theory in the Bay of Bengal. অর্থাৎ আমরা দ্বি জাতি তত্ত্বকে বঙ্গপোসাগরে নিক্ষেপ করেছি। সুতরাং বাংলাদেশিদের জন্য যেটি ছিলো মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতার সংগ্রাম, ভারতীয়দের জন্য সেটি ছিলো হাজার বছরের প্রতিশোধ নেওয়া এবং পাকিস্তান ভাঙা। পাকিস্তান ভাঙার জন্য তারা মরিয়া হয়ে উঠেছিলো কেনো? কারণ, পূর্ব বাংলা পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে গেলে ভারত প্রথমে আঞ্চলিক পরাশক্তি হবে এবং পরে আমেরিকা চীন ও রাশিয়ার মতো বিশ^শক্তি হবে। বিশ^শক্তি হওয়ার বাসনা সেই নেহরুর আমল থেকেই।
॥দুই॥
ভারত একদিন বিশ্ব শক্তি হবে, এই স্বপ্ন আজীবন লালন করেছেন পন্ডিত জওহর লাল নেহরু। শুধু বাংলাদেশ ও পাকিস্তান নিয়ে নয়, আফগানিস্তান মিলে বিগত ১০০ বছর ধরে অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন দেখছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস)। সেই একই স্বপ্ন নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ এবং যোগী আদিত্য নাথের। তারা একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র করার জন্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করেনি। বরং বাংলাদেশকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে তার পদানত একটি করদ রাজ্য হিসাবে রাখতে চেয়েছিলো। শেখ মুজিবুর রহমান তার সাড়ে ৩ বছরের রাজত্বে বাংলাদেশকে ভারতের সাথে ২৫ বছরের গোলামীর চুক্তিতে আবদ্ধ করেছিলেন।
যতোই বলা হোক না কেনো যে, শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন যে, ভারতীয় সৈন্য চলে যাক আর ওমনি ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশের মাটি থেকে চলে গেছে, ব্যাপারটি তেমন নয়। বরং শেখ মুজিব চেয়েছিলেন যে, বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্য আরো ৬ মাস থেকে ১ বছর থাক। ইন্দিরা গান্ধী ২৫ বছরের গোলামী চুক্তি চাননি। ইন্দিরা গান্ধীর ঢাকা সফরের সময় প্রমোদ তরী ‘মেরী এন্ডারসনে’ শেখ মুজিবুর রহমান বার বার ইন্দিরাকে অনুরোধ করে এই চুক্তিটি স্বাক্ষর করিয়েছিলেন। কেউ যদি আমাকে চ্যালেঞ্জ করেন তাহলে আমি উপযুক্ত ডকুমেন্ট দেওয়ার জন্য প্রস্তুত।
শেখ মুজিবের আমলে ভারতকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে ইন্দো-সোভিয়েট অক্ষ শক্তির লেজুড় বানানো হয়েছিলো। ১৯৭৫ সালের ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর থেকে শুরু করে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতা গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশ ভারতের গোলামীর জিঞ্জির থেকে বেরিয়ে আসে। কিন্তু ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণ করে পরবর্তী সাড়ে ১৫ বছর জুলাই বিপ্লবের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশ নামে মাত্র স্বাধীন ছিলো। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বলে কিছু ছিলো না। তাই দেশে-বিদেশে বলা হতো, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি হলো Indo-Centric, অর্থাৎ, ভারতকেন্দ্রিক।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব শুধুমাত্র বাংলাদেশের ক্ষমতা থেকে ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারকেই হটায়নি, বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির অভিমুখকে (Direction) সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। বলতে গেলে অনেকটা উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু। এই অভিমুখ পরিবর্তনের স্লোগান ছিলো, ‘দিল্লী না ঢাকা/ ঢাকা ঢাকা’। পররাষ্ট্র নীতির যে বাঁক বদল শুরু করেছিলেন ড. ইউনূস সেটি ধরে রেখেছেন, বরং বলা যায় শক্ত করে ধরে রেখেছে, বর্তমান সরকার। রোববার সন্ধ্যায় এই কলাম লেখার সময় পড়লাম পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ূন কবিরের একটি উক্তি।
একটি জাতীয় দৈনিকের অন লাইন সংস্করণে প্রধান সংবাদের শিরোনাম ছিলো নিম্নরূপ: ‘দিনরাত ভারত-ভারত না করে নিজের দেশের কথা চিন্তা করুন: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।’ রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে দেশের পররাষ্ট্র নীতি ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে কার্যকর ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর জোর দিলেও সারাক্ষণ ‘ভারত জিকির’ করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেছেন, দেশের মানুষের নিজের স্বার্থ ও দেশের কথা আগে ভাবা উচিত।” প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ভারত কেবল আরেকটি দেশ, যাদের সঙ্গে আমরা একটি কার্যকর ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখতে চাই। কিন্তু প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে সকালের নাশতা করতে ভারত, দুপুরের খাবার খেতে ভারত, রাতের খাবার খেতেও ভারত? তাহলে ভাই, আপনারা নিজের দেশের খাবার কখন খাবেন, সবসময় যদি শুধু ভারত-ভারতই করেন? নিজের দেশের কথা চিন্তা করুন।’
॥তিন॥
জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র নীতিতে এক নাটকীয় পরিবর্তন সূচিত করেছে। এই পরিবর্তন স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বকে সমুন্নত করেছে। এই পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। এটি একটি বিপ্লবী অথবা জাতীয় সরকার হওয়ার কথা ছিলো। কেনো হয় নাই সেটি একটি ভিন্ন আলোচনা। তবে জাতীয় বা বিপ্লবী সরকার হোক বা না হোক, জুলাই বিপ্লব গোলামীর দুর্গকে চূর্ণ করেছে।
প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র নীতির অভিমুখ অর্থাৎ ডাইরেকশন ১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন ঘটিয়েছে। চীনের সাথে বন্ধুত্ব সংহত হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন যে, আমেরিকার চক্রান্তে নাকি তার পতন হয়েছে। এই কথা মোটেই সত্য নয়। তবে সার্বভৌমত্বকে মজবুত করার পাশাপাশি চীনের সাথে সাথে আমেরিকার সাথেও সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগদান করবে কি না সেটির অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে চুক্তিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান ছিলো শেখ হাসিনার সরকারের কাছে একটি নিষিদ্ধ দেশ। সেই দেশের সাথে মৈত্রীর সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে, যেমন মৈত্রীর সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিলো দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলে।
সামরিক ক্ষেত্রে তুরস্ক সর্বাধুনিক প্রযুক্তি অর্জন করেছে। এই প্রযুক্তির একটি অংশ বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হবে (Transfer of Technology)। নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে দেশের প্রতিরক্ষা নীতিতে। সমরাস্ত্র সংগ্রহে নতুন ডাইমেনশন যুক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র নীতিতে এবং সমরাস্ত্র সংগ্রহে যে নতুন অভিমুখ বা ডাইরেকশন সৃষ্টি হয়েছে সেসম্পর্কে আগামী মঙ্গলবার বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছা রইলো। এর মধ্যে যদি বড় ধরনের নতুন কোনো পলিটিক্যাল ডেভেলপমেন্ট না হয় তাহলে আগামী মঙ্গলবার আমি ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সামরিক শক্তি এবং আগামী দিনে বাংলাদেশ তার সমর শক্তি বৃদ্ধির জন্য কী করতে যাচ্ছে সেসম্পর্কে আলোচনা করবো, ইনশাআল্লাহ।
Email:[email protected]