বাংলাদেশের প্রশাসন ও রাজনীতির বাস্তবতায় একটি শব্দ বহুদিন ধরে অস্বস্তিকরভাবে পরিচিত “তদবির”। চাকরি, বদলি, পদোন্নতি, সরকারি সুবিধা কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রেই এই তদবির যেন এক অঘোষিত কিন্তু কার্যকর প্রথায় পরিণত হয়েছে। ফলে মেধা, দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের চেয়ে ব্যক্তিগত প্রভাব বা রাজনৈতিক পরিচয় অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পেয়ে যায়। এই বাস্তবতার মধ্যেই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সতর্কবার্তা নতুন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “সকাল ৯টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত খালি তদবির পোস্টিং-টোস্টিং নিয়ে।” তাঁর এই মন্তব্যটি শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতির একটি গভীর সমস্যার প্রতিফলন। বহু বছর ধরে সরকারি দপ্তরগুলোর একাংশে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, যোগ্যতা বা নিয়মের চেয়ে সুপারিশ বা তদবিরই অনেক সময় সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে। ফলে কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সবখানেই এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

এ ধরনের সংস্কৃতি শুধু প্রশাসনকে দুর্বল করে না; এটি তরুণ সমাজের মধ্যেও হতাশা তৈরি করে। যখন একজন তরুণ দেখে যে মেধা ও পরিশ্রমের চেয়ে তদবির বেশি কার্যকর, তখন তার মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যায়। মির্জা ফখরুল যখন বলেন যে তরুণদের আত্মকর্মসংস্থান ও উদ্যোগের দিকে যেতে হবে, তখন সেটি অবশ্যই বাস্তবসম্মত একটি পরামর্শ। কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তরুণরা বিশ্বাস করতে পারে যোগ্যতার মূল্যায়ন হবে ন্যায্যভাবে।

অন্যদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের নির্দেশনাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। তিনি সরকারি দপ্তরগুলোকে সতর্ক করে দিয়েছেন যাতে তাঁর নাম ব্যবহার করে কেউ অনৈতিক সুবিধা নিতে না পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি মোটেও নতুন ঘটনা নয়। প্রায়শই দেখা যায়, মন্ত্রী বা এমপিদের নাম ভাঙিয়ে তাদের আশপাশের কিছু ব্যক্তি কিংবা প্রতারক চক্র নানা ধরনের সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে।

এই প্রবণতা দুইভাবে ক্ষতিকর। প্রথমত, এটি সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করে এবং প্রশাসনের প্রতি তাদের আস্থা নষ্ট করে। দ্বিতীয়ত, এটি সংশ্লিষ্ট রাজনীতিবিদদের সুনামকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। কারণ অনেক সময় সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না, কোনটি সত্যিকারের নির্দেশ আর কোনটি ভুয়া প্রভাব।

বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে “নাম ভাঙানো” একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। একজন মন্ত্রী বা এমপির নাম ব্যবহার করে ফোন দেওয়া, সুপারিশপত্র দেখানো বা দাপ্তরিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা—এসব ঘটনা বহুবার আলোচিত হয়েছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, রাজনৈতিক নেতার ঘনিষ্ঠ পরিচয় ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি নিজেদের প্রভাবশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন।

এই বাস্তবতায় শামা ওবায়েদ ইসলামের আগাম সতর্কতা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কারণ এটি একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়, কোনো রাজনীতিবিদের নাম ব্যবহার করে অনৈতিক সুবিধা নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও এ বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে, যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করতে পারে।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই ধরনের সতর্কতা কি স্থায়ী সমাধান দিতে পারে? বাস্তবে দেখা যায়, ব্যক্তিগত উদ্যোগ বা সতর্কবার্তা অনেক সময় সমস্যাকে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া সমস্যার মূল সমাধান সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে তদবির সংস্কৃতির একটি বড় কারণ হচ্ছে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার জটিলতা ও অস্বচ্ছতা। যখন কোনো কাজ করতে গিয়ে মানুষ বারবার জটিলতা ও দেরির মুখোমুখি হয়, তখন তারা বিকল্প পথ খোঁজার চেষ্টা করে। সেই বিকল্প পথই অনেক সময় তদবির বা প্রভাবের আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতা তৈরি করে।

অন্যদিকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যেও এই প্রবণতার কিছু শিকড় রয়েছে। অনেক সময় নির্বাচনী রাজনীতিতে নেতাদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়। ফলে জনগণের একটি অংশ মনে করে, রাজনীতিবিদদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলে প্রশাসনিক সুবিধা পাওয়া সহজ হবে।

এই প্রবণতা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম ও সমতা। যদি ব্যক্তিগত পরিচয় বা প্রভাব সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে, তাহলে রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ও সমতার ধারণা দুর্বল হয়ে পড়ে।

এখানে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক নেতাদের নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা। যেমনটি শামা ওবায়েদ ইসলাম করেছেন। যখন কোনো মন্ত্রী প্রকাশ্যে বলেন যে তাঁর নাম ব্যবহার করে কেউ সুবিধা নিতে পারবে না, তখন সেটি প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের কাছে একটি শক্ত বার্তা দেয়।

একই সঙ্গে তরুণ সমাজের জন্যও একটি বাস্তব শিক্ষা রয়েছে। শুধুমাত্র চাকরির পেছনে ঘুরে বেড়ানো নয়; উদ্যোগ, উদ্ভাবন ও আত্মকর্মসংস্থানের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। আধুনিক অর্থনীতিতে ছোট উদ্যোগ ও স্টার্টআপ অনেক সময় বড় কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা, কৃষি উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র শিল্প—এসব ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। যদি তরুণরা এই সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারে, তাহলে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত খুলতে পারে।

তবে এর জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও সহায়ক নীতি প্রয়োজন। সহজ ঋণ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বাজারের সুযোগ এসব নিশ্চিত করতে পারলে তরুণ উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বাড়বে। তখন চাকরির জন্য তদবিরের ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নৈতিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা। যেখানে স্পষ্টভাবে বোঝানো হবে, ব্যক্তিগত প্রভাব নয়; নিয়ম ও মেধাই হবে সিদ্ধান্তের প্রধান ভিত্তি।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মন্তব্য এবং শামা ওবায়েদ ইসলামের সতর্কবার্তা—এই দুইটি ঘটনাই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক নৈতিকতা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে একই সঙ্গে এগুলো পরিবর্তনের সম্ভাবনাও নির্দেশ করে।

রাষ্ট্র ও রাজনীতির শক্তি তখনই বাড়ে, যখন নাগরিকরা বিশ্বাস করতে পারে ব্যবস্থাটি ন্যায্য। সেই আস্থা তৈরি করতে হলে তদবির সংস্কৃতি ও নাম ভাঙানোর প্রবণতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার বিশিষ্ট রাষ্ট্রচিন্তক অমর্ত্য সেন একবার লিখেছিলেন, “একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যায়, যখন সেখানে সুযোগের দরজা ব্যক্তিগত প্রভাবের জন্য নয়, সবার মেধা ও যোগ্যতার জন্য সমানভাবে খোলা থাকে।”

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews