টেস্ট শুরুর আগে ‘তিন দিনেই বাংলাদেশকে হারিয়ে দেবে অস্ট্রেলিয়া’- বলা স্থানীয় সাংবাদিকদের মনের কী অবস্থা সেটি জানা না গেলেও সেই কথায় টিপ্পনী কাটা অজি অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের অভিব্যক্তিই বলে দিচ্ছিল সব। মাঠে নিজেদের অসহায় সব উইকেট বিলিয়ে দেয়া, বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের চোখে চোখ রেখে লড়াই, সবই দেখেছেন এবং হতাশা উগড়ে দিয়েছেন। সেই ‘তিন দিন’ শেষে যে অজিদের হারের কড়ে গোনা শুরু করেছে বাংলাদেশই! ডারউইনে গতকালসহ টানা তিন দিন ধরে দাপুটে পথচলার পর লক্ষ্য এখন দৃষ্টিসীমায়। যে ঠিকানার নাম, ইতিহাস! যদিও এখনও পাড়ি দিতে হবে বেশ কিছুটা পথ। অস্ট্রেলিয়ানরাও গড়তে চাইবে প্রতিরোধ। তবে এই মুহূর্তে শঙ্কার ভ্রুকুটির চেয়ে সম্ভাবনার তেজই বেশি। ডারউইনে জয়ের ছবি এখন আঁকতেই পারে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। ইনিংস পরাজয় এড়াতেই অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন আরও ৬৭ রান। উইকেট আছে ৬টি। দিন এখনও যে দুটি বাকি!
বাংলাদেশের তৃতীয় দিনের নায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। সাতে নেমে লোয়ার অর্ডারদের নিয়ে দারুণ লড়াইয়ে উপহার দিয়েছেন তিনি ৬৫ রানের ইনিংস। বাংলাদেশ পেয়েছে ২২৮ রানের লিড। মিরাজ পরে বল হাতে দলকে এনে দিয়েছেন সবচেয়ে কাক্সিক্ষত উইকেট। বিদায় করেছেন উইকেটে জমে বসা স্টিভেন স্মিথকে। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ রানের জবাবে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থামে ৪২৬ রানে। তৃতীয় দিন শেষে অস্ট্রেলিয়ার রান দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ উইকেটে ১৬১। অস্ট্রেলিয়ার টানা তৃতীয় হতাশাময় দিনের সান্ত¡না জশ হ্যাজলউডের একটি মাইফলক। ১৩ মাস পর টেস্ট খেলতে নেমে ৬ উইকেট নিয়েছেন অভিজ্ঞ পেসার। এর পঞ্চমটিতে অস্ট্রেলিয়ার নবম বোলার হিসেবে পূর্ণ করেছেন ৩০০ টেস্ট উইকেট। এই টেস্টের অস্ট্রেলিয়া এখন টেস্ট ক্রিকেটের দেড়শ বছরের ইতিহাসে একমাত্র দল, যাদের একাদশে আছে ৩০০ বা এর বেশি উইকেট নেওয়া চার বোলার। ইতিহাসের সেরা বোলিং চতুষ্টয়ের বিপক্ষে এমন ব্যাটিং পারফরম্যান্স বাংলাদেশের কৃতিত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে আরও।


সকালে ৬ উইকেটে ৩৫১ রান নিয়ে দিন শুরু করে বাংলাদেশ। আগের দিন চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায় ব্যাট করা হাসান মাহমুদ এ দিন বেশিক্ষণ টেকেননি। দিনের চতুর্থ ওভারে এলবিডব্লিউ হয়ে যান হ্যাজলউডের বলে। রান করেন তিনি ১৪। তবে বল খেলেছেন ৯২টি, ক্রিজে কাটিয়েছেন ১৬৩ মিনিট। রানসংখ্যার চেয়েও মূল্যবান এক ইনিংস। মিরাজের সঙ্গে তার জুটি থামে ১৭০ বলে ৪৬ রানে। তবে অস্ট্রেলিয়ানদের হতাশার প্রহর চলতেই থাকে। তাইজুল খেলেন ১৭ রানের ক্যামিও ইনিংস, যেখানে ছিল হ্যাজলউডের বলে ফ্লিক করে চোখধাঁধানো শটের এক ছক্কা। বিদায় নেন তিনি ওই ওভারেই। তবে অস্ট্রেলিয়ানদের যন্ত্রণায় ডুবিয়ে নবম উইকেটে ৪৬ রানের জুটি গড়েন মিরাজ ও তাসকিন আহমেদ।


লেজের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে স্ট্রাইক ধরে রেখে, প্রয়োজন বুঝে প্রান্ত বদল করে দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাটিং করেন মিরাজ। লেগ সাইডে ছাতার মতো ফিল্ডার সাজিয়ে বাউন্সারের কৌশল নেয় অস্ট্রেলিয়া। কাজে লাগেনি কিছুই। তাসকিনের সহজ ক্যাচ ছাড়েন স্মিথ। মিরাজের কঠিন ক্যাচ নিতে পারেননি ট্রাভিস হেড। লাঞ্চের আগে শেষ বলে দারুণ ছক্কায় মিরাজ বুঝিয়ে দেন বাংলাদেশের দাপট। লাঞ্চের পর প্রথম ওভারেই থামে মিরাজের লড়াই। ১৫৪ বলে ৬৫ রানের অমূল্য অবদান রাখা ক্রিকেটারকে ফিরিয়ে তিনশ উইকেটের সীমানায় পৌঁছে যান হেইজেলউড। শেষ ব্যাটসম্যান ইবাদত হোসেন চৌধুরি বিশাল এক ছক্কায় গ্যালারিতে আছড়ে ফেলেন ন্যাথান লায়নকে। তাকে বিদায় করেই ইনিংসের ইতি টানেন হেইজেলউড।


বিশাল লিডের পর বোলিংয়েও বাংলাদেশ সাফল্য পায় দ্রুত। ইনিংসের দ্বিতীয় ও হাসান মাহমুদের প্রথম ওভারেই শরীরের কাছের বল কাট করার চেষ্টায় স্টাম্পে টেনে আনেন জ্যাক ওয়েদেরল্ড। ডারউইনের ঘরের ছেলে পারেননি রানের খাতা খুলতে। প্রথম ইনিংসে ছয় উইকেট শিকারি হাসান এরপর বিদায় করেন বিপজ্জনক হেডকেও। সঙ্গীর মতো তিনিও কাট করার চেষ্টায় বল টেনে আনেন স্টাম্পে। রান খরায় প্রবল চাপে থাকা মার্নাস লাবুশেনকে অবশ্য অনেক দিন পর বেশ সাবলীল মনে হচ্ছিল। আরেকপ্রান্তে স্মিথ তো ফর্মেই আছেন। দুজনে মিলে ইঙ্গিত দেন জুটি গড়ে তোলার। তবে সেই চেষ্টা সফল হতে দেননি তাইজুল ইসলাম। গতি বৈচিত্র আর আক্রমাত্মক লেংথের মিশেলে লাবুশেনকে বোল্ড করে দেন তিনি ৩১ রানে।


স্মিথ এরপর আরেকটি জুটি গড়ার চেষ্টা করেন ক্যামেরন গ্রিনকে নিয়ে। উইকেট তৃতীয় দিনেও ব্যাটিংয়ের জন্য বেশ ভালো, এই জুটিও থিতু হয়ে যায় দ্রুত। তবে তাদের রানের রাশ টেনে ধরেন মিরাজ। স্মিথকে ক্রিজে আটকে রাখেন তিনি। তাতেই কাজ হয়। মনোযোগ হারিয়ে আলগা শট খেলে মিরাজকেই ফিরতি ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তিনি ৪৪ রানে। বাংলাদেশের উল্লাসই বলে দিচ্ছিল, বড় বাধা সরে গেছে তাদের। গ্রিন ও অ্যালেক্স ক্যারি এরপর প্রায় ১৬ ওভার নির্বিঘেœ পার করে দেন। তবে এখনও তাদের সামনে চ্যালেঞ্জের পাহাড়। বাংলাদেশ জানে, এই জুটির পর আছেন বাউ ওয়েস্টার। স্বীকৃতি ব্যাটসম্যানদের সেখানেই সমাপ্তি! দেশের মাঠে এত বড় লিড ঘুচিয়ে কখনও টেস্ট জিততে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। তাদেরকে তাই গড়তে হবে ইতিহাস। তবে ইতিহাসের সুবাস সত্যিকার অর্থে পাচ্ছে বাংলাদেশই।

সংক্ষিপ্ত স্কোর
অস্ট্রেলিয়া : ১৯৮ ও ২য় ইনিংস : ৫৩ ওভারে ১৬১/৪ (হেড ১৭, ওয়েদেরল্ড ০, লাবুশেন ৩১, স্মিথ ৪৪, গ্রিন ৪৩ ব্যাটিং, ক্যারি ২৩ ব্যাটিং; তাসকিন ০/৩৮, হাসান ২/৩৩, ইবাদত ০/৩৮, তাইজুল ১/২৮, মিরাজ ১/২০)।
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস : ১৩৮ ওভারে ৪২৬ (আগের দিন ৩৫১/৬) (মিরাজ ৬৫, হাসান ১৪, তাইজুল ১৭, তাসকিন ১৪*, ইবাদত ৭; স্টার্ক ২/৭৯, হ্যাজলউড ৬/৮৯, গ্রিন ০/৩৪, কামিন্স ১/৭৫, লায়ান ১/১০২, ওয়েবস্টার ০/২৮, হেড ০/৩, লাবুশেন ০/৪)।
তৃতীয় দিন শেষে



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews