বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা বহুমাত্রিক ভারতীয় আগ্রাসন বা হেজিমনি। হিন্দুত্ববাদী ভারতীয়রা মনে করে, যেহেতু বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারত সহযোগিতা করেছিল, সে কারণে বাংলাদেশকে ভারতের আধিপত্য মেনে তাদের করদরাজ্য হয়েই থাকতে হবে। বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক জনগণ ভারতের এই নীতি সম্পর্কে শুরু থেকেই সচেতন। ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে শাসক কি ধরণের ভূমিকা পালন করছে, তার উপর ভিত্তি করেই এদেশের মানুষ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনসহ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে জনমত গঠিত হয়। একাত্তরের পর দেশে প্রথম সরকার দায়িত্ব গ্রহণের আগেই প্রবাসী সরকার ভারতের সাথে সাত দফা গোলামী চুক্তিতে সই করেছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের উপর সে সময় লিখিত বিভিন্ন গ্রন্থে সে গোপন চুক্তি সম্পর্কে লেখা হয়েছে। ‘দুশো ছেষট্টি দিনে স্বাধীনতা’ শীর্ষক নূরুল কাদিরের বইয়ে উল্লেখিত ৭ দফা গোপন চুক্তির শর্তগুলো হচ্ছে:

১. স্বাধীন বাংলাদেশের নিজস্ব বা নিয়মিত স্থায়ী সামরিক বাহিনী থাকবে না। কেবল অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য একটি মিলিশিয়া বাহিনী রাখা যাবে।
২. বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক দায়িত্ব থাকবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে।
৩. দেশের কোনো কৌশলগত ও সামরিক প্রয়োজনে ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করতে পারবে।
৪. অস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে ভারতের অনুমতি নিতে হবে। তৃতীয় কোনো দেশের সহায়তা নেয়া যাবে না।
৫. প্রাকৃতিক সম্পদ ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারতের সাথে যৌথ বা সমন্বিত নীতি অনুসরণ করতে হবে।
৬. গোয়েন্দা ও বৈদেশিক নিরাপত্তা কার্যক্রম ভারতের সাথে একযোগে পরিচালনা করতে হবে।
৭. আন্তর্জাতিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনা বা পরামর্শক্রমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
৮. আত্মসমর্পণ ও অবমাননাকর শর্তযুক্ত এমন একটি চুক্তি কোনো স্বাধীনচেতা মুক্তিকামী মানুষের প্রতিনিধিরা কখনোই করবে না। করতে পারেন না। লাখো শহীদের রক্তের বিনিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ যা করেছে, তার নজির বিশ্বের আর কোথাও নেই। সম্ভবত শেখ মুজিবও এ ধরণের চুক্তির শর্ত মেনে নিতে প্রস্তুত বা রাজি ছিলেন না। এ কারণেই তিনি দেশে ফেরার দেড় মাসের মাথায় ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ কিছুটা কৌশলী ও পরিশীলিত শব্দবন্ধে নতুন রূপে একটি ২৫ বছর মেয়াদী কথিত মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী, সহযোগীতা ও শান্তিচুক্তি’ নামে ১২ দফা এই চুৃক্তির আওতায় বাংলাদেশকে ভারতের করদরাজ্যে পরিনত করার পরিকল্পনা পাকাপোক্ত করা হয়েছিল। এই চুক্তিতে আগের ৭ দফা গোলামী চুক্তির শর্তগুলোর উল্লেখ না থাকলেও শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার শাসনামলে ৭ দফা গোলামী চুক্তির বাস্তবায়নই দেখা গেছে। শুধুমাত্র জনগণের ক্ষোভ ও অসন্তোষ সামলাতে কিছু লোক দেখানো পদক্ষেপ দেখা গেছে। বিশেষত চীনা প্রভাবে বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তার খাতিরে সাবমেরিন সংগ্রহের মত যৌক্তিক পদক্ষেপসমুহ প্রত্যাখ্যান করতে পারেনি শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের লুটপাটতন্ত্রের অর্থনীতি কায়েমের মূল অনুঘটক ছিল ভারত। এর সুবিধাভোগীও ভারত। দেশের দেউলিয়া অবস্থায় শত শত বিলিয়ন ডলার ঋণের টাকা উন্নয়নের ঢোল বাজিয়ে ক্ষমতার মসনদ ধরে রাখার কৌশলও ভারতীয় নির্দেশনায় সাজানো হয়েছিল। সম্প্রতি ভারতে জাতীয় সংসদে কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার আসল উদ্দেশ্য ফাঁস করে দিয়েছেন।

শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, গণতন্ত্র নেই, সুশাসন নেই, মানবাধিকার নেই, রাজনৈতিক অধিকার নেই-এমন এক বাস্তবতার মধ্যেও গুম-খুনের ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দেশে এক ধরণের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ ছাড়া জাতীয় পার্টির সামরিক শাসন ও বিএনপির পুরো শাসনকালকে অস্থিতিশীল করে রাখা হয়েছিল, যাতে বাংলাদেশ তার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম না হয়। শুধুমাত্র ভারতের বশংবদ সরকার থাকলেই বাংলাদেশ স্থিতিশীল থাকবে, উন্নয়ন-অগ্রগতি অর্জিত হবে, এমন একটি বাহ্যিক ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে শেখ হাসিনার দেড় দশকে ভারতীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় একটি পরীক্ষামূলক সফ্ট পাওয়ারের ইনকিউবেটরে পরিনত করা হয়েছিল বাংলাদেশকে। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল দেশের অর্থনীতি দেউলিয়া, ব্যাংকিং সেক্টরসহ সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দিয়ে শেষ পর্যন্ত হায়দারাবাদ বা সিকিমের মতো যে কোনো উপায়ে বাংলাদেশকে ভারতের অঙ্গীভুত করা। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ভারতের সে অভিপ্রায় ও পরিকল্পনা নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছে। হাসিনার দু:শাসন থেকে মুক্তি ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পদার্পণের সম্ভাবনা সামনে রেখে পশ্চিমা বিশ্ব যখন বাংলাদেশের অর্ন্তবর্তী সরকারের পাশে এসে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল, তখন ভারতের বিজেপি নেতাদের মুখে শুধুই বাংলাদেশ বিরোধী হুমকি, খিস্তি-খেউর, উস্কানিমূলক হেইট স্পিচ ও প্রপাগান্ডা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল। বাংলাদেশে ভারতের পঞ্চম বাহিনীর প্রকাশ্য-গোপন যতগুলো সফ্ট পাওয়ার ফ্রন্ট ছিল অন্তর্বর্তী সরকারকে অস্থিতিশীল ও ব্যর্থ করে দিতে সবগুলোকেই ব্যবহার করেছে ভারত। জুলাই বিপ্লবের মূল স্পিরিটের সাথে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের স্পিরিটের কোনো পার্থক্য নেই। সেখানে একটি বিরোধ সৃষ্টির অপচেষ্টা এখনো চলছে। ভারত সরকার একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করলেও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জনকে ব্যহত ও ব্যর্থ করে দিতে সম্ভাব্য সবকিছুই করেছে। মিত্র বাহিনী হিসেবে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল ভারতীয় বাহিনী। গোলামি চুক্তিসহ পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে ভারতীয় বাহিনী প্রত্যাহারের সময় বাংলাদেশ থেকে শত শত ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান বোঝাই করে কোটি কোটি টাকার সম্পদ চুরি করে নিয়ে যায়। পাকিস্তানি সেনা ও বিমান বাহিনীর ট্যাংক, বিমান, সাজোয়া গাড়ী, অস্ত্রশস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম, ক্যান্টনমেন্টের যাবতীয় মূল্যবান জিনিসপত্র, কলকারখানার যন্ত্রপাতি, টাকা ও ধাতব মূদ্রা সবকিছু নিয়ে যায় তারা। মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডার মেজর এমএ জলিল ভারতীয় বাহিনীর বল্গাহীন লুটপাটের বাঁধা দিতে গিয়ে সরকারের রোষানলে পড়েছিলেন। একাত্তরের একত্রিশে ডিসেম্বর মেজর জলিল প্রথম গ্রেফতার হন। তিনিই সম্ভবত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম গ্রেফতার হওয়া মুক্তিযোদ্ধা ও রাজবন্দী। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এমএজি ওসমানী সাহেবকে ১৬ ডিসেম্বরের আত্মসমপর্ণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে না দেয়া, তার বদলে বাংলাদেশের সেক্টর কমান্ডার কিংবা রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাউকে সামনের সারিতে না রাখার পেছনে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নিয়ে ভারতীয় হেজিমনিক নীল নকশার ভূমিকা এখন অনেকটাই স্পষ্ট।

চব্বিশের জুলাই গণআন্দোলনে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী ও জনগণের বেশি ভূমিকা ছিল। এটি ছিল, শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের মুখোশ পড়া ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী বিপ্লব। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের অভিপ্রায়, আকাক্সক্ষা ভারতীয় শাসক শ্রেণীর অজানা নয়। তারা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও দেশের ১৮ কোটি মানুষের চেয়ে তাদের বশংবদ শেখ হাসিনাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে তাকে দিল্লিতে আশ্রয় দিয়েছে। শুধু আশ্রয়ই দেয়নি, সেখানে বসে পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্র, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করা ও রাজনৈতিক-সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-সংঘাত সৃষ্টি করতে সম্ভাব্য সবকিছু করার সুযোগ দিচ্ছে। সতেরো বছর ধরে বাংলাদেশে যে মৌরসিপাট্টা খুলে বসেছিল, তার মোহ তাদেরকে মাদকাসক্তের মতো বেপরোয়া করে তুলেছিল। বাংলাদেশের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখার শর্ত হিসেবে হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছিল বাংলাদেশের অর্ন্তবর্তী সরকার। এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠিসহ বারবার তাগাদা দেয়ার পরও দিল্লি বাংলাদেশের চিঠির জবাব না দিয়ে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে ভারতে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে নেপথ্যে ইন্ধন দিয়ে এসেছে। বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসা বন্ধ, বাংলাদেশ দূতবাস ও কনসুলেট অফিসে বিজেপি কর্মীদের হামলা। বাংলাদেশে বিভিন্ন পণ্য রফতানি বন্ধের মতো বেপরোয়া-অপরিনামদর্শি তৎপরতায় বাংলাদেশের চেয়ে ভারতের অর্থনৈতিক ক্ষতি অনেক বেশি হয়েছে। বাংলাদেশ বিকল্প উৎস খুঁজে নিতে পারলেও ভারতীয় ব্যবসাকেন্দ্রগুলোতে লাল বাত্তি জ্বলে গেছে। উপায়ান্তর না দেখে অবশেষে নিজেরাই বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা উন্মুক্ত করলেও আগের মত সেই গতি আর নেই। তবে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ কার্ড নিয়ে ভারতীয় ষড়যন্ত্র একদিনের জন্যও থামেনি। গত ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিনে দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে গণমাধ্যমের সামনে কথা বলার সুযোগ করে দেয় মোদি সরকার। তারা বদলে যাওয়া বাংলাদেশের অগ্রাধিকার বুঝতে পারেনি বা ইচ্ছাকৃতভাবে অগ্রাহ্য করে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে তৎপর রয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ইসকনের নেতৃত্বে হিন্দু সংখ্যালঘুদের মাঠে নামিয়ে পানি ঘোলা করতে চেয়েছিল। সাধারণ সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাদের ফাঁদে পা দেয়নি। জুলাই যোদ্ধা, সরকার ও সব রাজনৈতিক মহলের কঠোর অবস্থানের কারণে তা ব্যর্থ হয়। হাতে থাকা সব কার্ড একের পর এক ব্যর্থ হওয়ার পর তারা একদিকে বাংলাদেশের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক চায়, আবার শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে আশ্রয় দিয়ে তারেক রহমান ও বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে চায়। তারেক রহমানের চীন সফরের পর ভারতীয়দের হুমকি-ধামকি ও উস্কানির বেলুন কিছুটা চুপসে গেলেও আমেরিকানদের ডেকে এনে একটা মধ্যস্থতা করার চেষ্টাও দেখা গেছে। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগারদের উস্কানিমূলক রাজনৈতিক বক্তব্য ভারতীয় সফ্ট পাওয়ারের অংশ। সেখানে লাগাম না টেনে তারেক রহমানকে দিল্লিতে দাওয়াত দিয়ে সেখানে রাজকীয় সম্মাননার লোভ ও টোপ দেয়া হলেও শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়ার সুযোগ্য সন্তান তারেক রহমান অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ভারতের আধিপত্যবাদী নীতি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি আপাতত ভারতে যাচ্ছেন না। সাম্প্রতিক সময়ে নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপের নেতারাও ভারতের আধিপত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইরান যুদ্ধ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপালসহ পুরো অঞ্চলকে অখন্ড ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনার কথা বলেছেন। তিনি গাজার পর লেবানন ও ইরানে ইসরাইলের বিজয় দেখতে চেয়েছেন। এর ধারাবাহিকতায় ইসরাইলের সহযোগীতা নিয়ে তিনি সব প্রতিবেশি দেশ দখল করে অখন্ড ভারত প্রতিষ্ঠা করতে চান। বাহ্যিকভাবে তারেক রহমান সরকারের সাথে স্বাভাবিক বাংলাদেশের জেনজিদের অনুকরণে ভারতের জেনজি প্রজন্ম সেখানকার বৈষম্য নিরসনে গণআন্দোলন গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশের বৈষম্য বিরোধি আন্দোলনকারীরা যেভাবে শেখ হাসিনার রাজাকার তকমা নিজেদের গায়ে মেখে রাজপথের দখল নিয়েছিল, একইভাবে ভারতীয় তরুনদের দিল্লির প্রধান বিচারপতির ‘ককরোচ’ আখ্যা দেয়ার পর সেখানকার তরুন প্রজন্ম ‘ককরোচ জনতা’ পার্টির নামে রাজপথে নামার পর বিজেপি সরকার তাদের প্রাথমিক দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। নিজ দেশে তারা গণতান্ত্রিক সহনশীলতা দেখালেও তাদের বশংবদ হাসিনাকে দিয়ে গুম-খুন ও গণহত্যা চালিয়ে বাংলাদেশকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বোচ্চ পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিল। সে সব এখন ইতিহাস। জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের সরকার ও নতুন প্রজন্ম স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশকে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চায়। তাদের গেমপ্ল্যান নতুন নতুন নাটকীয় মোমেন্টাম সৃষ্টিতে তৎপর রয়েছে।

পাবর্ত্য চট্টগ্রাম নিয়ে তাদের পুরনো খেলা এখন নতুন মাত্রায় উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাহসী পদক্ষেপে সন্ত্রাসী গোষ্ঠিগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা সুবিধা করতে না পেরে এবার ভারতীয় এজেন্টদের চাকমা সাজিয়ে পাবর্ত্য চট্টগ্রামকে ভারতের সাথে একীভুত করার ঘোষণা খায়েশ প্রকাশ করিয়েছে। অন্যদিকে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে হিন্দুদের নিয়ে চারদশক আগের ‘বঙ্গভূমি’ প্রকল্প আবার চালুর উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ যখন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে খুব দুর্বল ছিল, কোনো আঞ্চলিক পরাশক্তির আনুকুল্য ছিল না, তখনই এসব প্রকল্প চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। এখন বাংলাদেশ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ঐক্যবদ্ধ, পাকিস্তান, চীন ও তুরস্তের মতো সামরিক পরাশক্তি দেশগুলো বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে, তখন ভারত তার পুরনো কার্ডগুলো খেলে নতুন বাংলাদেশের নেতৃত্বকে ভয় পাইয়ে দেয়ার যে পরিকল্পনা করছে, তা নিজেদের জন্য বুমেরাং হতে পারে। গত দুই বছরে দিল্লি বাংলাদেশকে শায়েস্তা করতে যে সব পদক্ষেপ নিয়েছে, তার প্রায় সবগুলোই ব্যাকফায়ার বা বুমেরাং হয়েছে। গোবর মস্তিষ্ক ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের ভাড়া করা চাকমাদের নেতা সাজিয়ে তাদের দিয়ে পাবর্ত্য চট্টগ্রামকে ভারতভুক্তির দাবীকে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার হাস্যকর দাবি তোলা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে ভারত-পাকিস্তানের বিপরীতমুখী দাবি ও বিতর্ক ১৯৪৭ সালেই সুরাহা হয়ে গেছে। আইনগত ব্যাখ্যা, সাধারণ জনগণের রায় ইত্যাদি বিষয়গুলো অতিক্রম করেই পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ অঞ্চলের জনগণ চাইলে দুই জার্মানী একীভুত হওয়ার মতো ত্রিপুরা, মেঘালয়, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ ভবিষ্যতে কখনো বাংলাদেশের সাথে মিশে গেলে যেতেও পারে। পার্বত্য চট্টগ্রাম কখনো ভারতভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও বিদ্যুত ও জ্বালানি সংকটে পড়েছে। তথাকথিত চাকমা নেতারা নাকি বাংলাদেশে ডিজেল ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে! এই দাবির সাথে পাবর্ত্য চট্টগ্রামের চাকমাদের কোনে সমর্থন আছে? সম্ভবত নেই। তাছাড়া তাদের ভারতভুক্তির দাবির সাথে এই দাবি কিভাবে সম্পর্কযুক্ত হতে পারে? এ দাবি থেকে সহজেই বুঝা যায়, এরা বাংলাদেশি নয়, এরা ভারতীয় এজেন্ট। তাদের এই দাবী থেকে আরো একটা বিষয় আবারো পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে ভারত নির্ভরতা পুরোপুরি পরিহার করতে হবে। হিন্দুত্ববাদী বিজেপি ভারতের ক্ষমতায় আসার পর সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলাদেশের মুসলমানদের শায়েস্তা করতে যে সব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, শেষ পর্যন্ত তা বাংলাদেশের জন্য শাপে বর হয়েছে। বাংলাদেশ কখনোই ভারতের সাথে খারাপ সম্পর্ক চায়নি। ভারতের অস্বাভাবিক বাণিজ্য বৈষম্য সত্বেও বাংলাদেশ ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ভারতের কাছে বন্ধক রাখতে হাসিনার মতো লেন্দুপ দর্জি বাংলাদেশে আর কখনো জন্ম নেবে না।

[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews