এলাহী নেওয়াজ খান

ভারতীয় সমাজ নতুন এক বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে; যা ধর্ম, বর্ণ ও জাতপাতের বিভাজন রেখা মুছে দেয়ার অঙ্গীকার ঘোষণা করছে। বলা যায়, আর্যাবর্তের ধ্বংসস্তূপের ওপর ঐক্যের নতুন এক বারতা শোনা যাচ্ছে। ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম তরুণসমাজ ধর্মীয় এবং জাতপাতের ভেদাভেদ ভুলে রাজপথে এককাতারে সমবেত হয়েছে। সেই সাথে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে। ভারতের ইতিহাসে অতীতে কখনো এমনটা দেখা যায়নি।

একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন অরাজনৈতিক আন্দোলন কিভাবে অপ্রতিরোধ্য হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দিতে পারে কিংবা ব্রাহ্মণ্য কৌলিন্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে, তা এখন বিশ্ববাসী দেখছে। যে সংগঠনটির ব্যানারে এ আন্দোলন শুরু হয়েছে তার নাম ‘ককরোজ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। এ বছর মে মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের এক বিরূপ মন্তব্যের প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ বেকার তরুণরা এটা গড়ে তুলেছিল। প্রধান বিচারপতি তার ওই মন্তব্যে ভারতের বেকার তরুণদের তেলাপোকা ও পরজীবীর সাথে তুলনা করেছিলেন। এই আপত্তিকর মন্তব্যের পর তরুণরা নিজেদের গর্বের সাথে তেলাপোকা বলে পরিচয় দিতে শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই আন্দোলন এখন গোটা ভারতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। আর এই প্লাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন, আম আদমি পার্টির সাবেক মিডিয়া কৌশলবিদ অভিজিৎ দীপক।

বহু জাতপাত এবং নানা ধর্ম, বর্ণের ভারতের রাজনীতিতে তরুণদের এ আন্দোলন একটি ব্যতিক্রমী ঐক্যের বার্তা বহন করছে। ভারতের ঐতিহ্যগত সামাজিক বিভাজনগুলো ছাপিয়ে একটি অভিন্ন নাগরিক পরিচয়ের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে। আর আন্দোলনটি জাতপাত বা ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বেকারত্ব, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অর্থনৈতিকসহ, প্রাসঙ্গিক সঙ্কটগুলো সামনে এনেছে। দলিত, অনগ্রসর, উচ্চবর্ণ কিংবা সংখ্যালঘুÑ সব ভেদাভেদ ভুলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের বঞ্চিত তরুণ বা চাকরিপ্রার্থী হিসেবে একক ও শক্তিশালী পরিচয় দাঁড় করিয়েছে।

সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এ আন্দোলন ভারতের উত্তর থেকে দক্ষিণ- সব অঞ্চলের তরুণদের একই প্লাটফর্মে যুক্ত করেছে, যা ভৌগোলিক ও ভাষাগত দূরত্ব কমিয়ে এনেছে। এক জাতের বা অঞ্চলের শিক্ষার্থীর সঙ্কটে অন্য জাতের তরুণরা পাশে দাঁড়াচ্ছে, যা ভারতের চিরাচরিত বিভাজনের রাজনীতিতে অতীতে কল্পনার বাইরে ছিল।

এখানে উল্লেখ করতে হয়, ভারতীয় সমাজ বহুকাল ধরে এক উত্তেজনাকর ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে আসছিল, যেখানে বহুমাত্রিক বৈচিত্র্যের পাশাপাশি সামগ্রিক বিভাজনের মাত্রা ও তীব্রতা তীব্রভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছিল। ধর্মীয় মেরুকরণ গভীর জাতিভেদ প্রথা ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে এ বিভাজন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের সময় আরো তীব্র আকার ধারণ করেছে। ভারতের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটেছে, অন্য দিকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বিশেষ করে মুসলিম সমাজ যারা দ্বিতীয় বৃহত্তর জনগোষ্ঠী তারা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে আন্দোলনটি তীব্র আকার ধারণ করেছে এবং সর্বভারতীয় রূপ নিয়েছে। দিল্লির যন্তর মন্তর ছড়া ভারতের প্রধান প্রধান শহর ও বড় বড় রাজ্যগুলোতে তীব্রভাবে এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে এবং নির্ণয়ক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভারতের গণমাধ্যমগুলোর খবরাখবর থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার এই আন্দোলনকে প্রথম দিকে খুব আমলে নেয়নি; কিন্তু এখন হিসাব-নিকাশ করছে। বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসসহ অন্যান্য বিরোধী দল এই আন্দোলনকে সমর্থন দেয়ার পর বিজেপি বাড়তি চাপে পড়েছে।

কারণ পরিস্থিতি সামাল দিতে নিজেকে অবতার হিসেবে ভাবা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িতদের কঠোর শাস্তির জন্য ফাস্ট ট্রাক কোর্ট গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশনা সত্ত্বেও পরিস্থিতির তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। ছাত্রছাত্রীরা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে এখনো অনড় অটল অবস্থায় আছে।

ভারতের অনেক রাজনৈতিক ভাষ্যকর মনে করেন, আন্দোলন তীব্র হওয়ার অন্যতম কারণ, নরেন্দ্র মোদির প্রতি বিজেপির নেতাকর্মীদের এই অন্ধবিশ্বাস। মোদির সমর্থকরা মনে করে, প্রধানমন্ত্রী মোদির হাতে ম্যাজিক আছে। তিনি যেকোনো সঙ্কট উত্তোলন করতে সক্ষম। কারণ তার সমর্থকরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, আসলেই নরেন্দ্র মোদি একজন অবতার। তার হাতে আছে সব সঙ্কটের সমাধান। আগামী দিনগুলো বলে দেবে বাস্তবতার মুখে কাল্পনিক পৌরাণিক কাহিনী কতটা অসাড়।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews